ধর্ম ও জীবন

তওবা কখন কবুল হয়

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০১৯ ইং ০১:২৬:০৯ | সংবাদটি ৩৩২ বার পঠিত

 তাওবা হল আল্লাহর কাছে কৃত পাপ কার্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া, মাফ চাওয়া। জগতে চলার পথে আমাদের নানা ভুলভ্রান্তি হয় সাথে সাথে গুনাহও হয়ে যায়। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষ বুঝে, না বুঝেই পাপাচারে লিপ্ত হয়। সর্বক্ষণ শয়তান মানুষের সাথে লেগেই থাকে। শয়তানের কারণেই ভাল কাজে বাঁধা আসে বেশি। ভাল কাজ বা নেক কাজে শয়তানের ওসওয়াছে পড়ে মানুষ কখনও জেনে কখনও না জেনে নিজের অজান্তেই নাফরমানি করে ফেলে ।
মুমিন বান্দাদের চরিত্রে কালিমা লেপনে শয়তান অতিসূক্ষভাবে মানুষের অন্তর সমূহকে বাঁকা পথে পরিচালিত করে। জেনে না জেনে গুনাহে লিপ্ত হয়ে গেলে পরক্ষণেই যদি মস্তিষ্ক স্থির হয়, অনুভব হয় যে, হে আল্লাহ আমি অপরাধ করেছি, পাপ করেছি আর তখনই কালক্ষেপণ না করে মহান প্রভূর কাছে খাঁটি দিলে তাওবা করতে হবে। মাফ চাইতে হবে কৃত পাপ কার্য মোচনের জন্য।
আল্লাহর রহমতের ভান্ডার বিরাট। তার যাকে ইচ্ছে মাফ করে দিতে পারেন । আল্লাহ এক দিকে মহা ক্ষমাশীল, অন্য দিকে তিনি মহাপ্রতাপশালী, মহাশক্তিশালী এবং প্রতিশোধ গ্রহণকারীও বটে ! তিনি ক্ষমা বা মাফ না করলে কারো কোন কিছু করার শক্তি বা ক্ষমতা আছে কি? এই বিষয়গুলি আমাদের সবার গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত এবং গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকাও উচিত।
আল্লাহ বলেন, যে সব খারাপ কাজ গুলি করতে তোমাদেরকে বারণ করা হয়েছে এবং বড় বড় গুনাহের কাজ যদি তোমরা বর্জন করে চল- তাহলে আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিব, তোমাদের আমলনামা থেকে সব পাপ মুছে ফেলবো। আর আমি তোমাদের প্রসংশিত এবং সম্মানিত স্থানে অধিষ্টি’ত করব (সুরা : নিসা, আয়াত-৫)।
আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন মজিদের এক সুরায় তাওবা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন : ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে খাঁটিভাবে তাওবা কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের গুনাহ সমূহকে মাফ করে দিবেন বলে আশা করা যায়। আর তোমাদের মনমোহিনী জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ থেকে নদী-নালা প্রবাহিত। রোজ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালা স্বীয় নবীকে এবং তাঁর সাথী মুমিনদেরকে অপমানিত করবেন না’ (সুরা : তাহরীম, আয়াত-৮)। কোরআন মজিদে আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন তাওবাকারী ও পুণ্যবান লোকদেরকে: যারা খাটি মনে তাওবা করে ও ঈমান আনে এবং পুণ্যময় ও সৎকর্ম করে, ইহকাল ও পরকালে আশা করা যায় যে, তারাই সাফল্য লাভ করবে (সুরা : কাসাস- রুকু ১৭) ।
শয়তান মানুষের দ্বারা গুনাহের কাজ করায়ে তা স্বীকার করতে না দেয়া এবং নানান ওজর আপত্তি পেশ করে তাওবা থেকে ফিরিয়ে রাখাটা শয়তানের জন্য বিরাট এক সাফল্য। বিনা তাওবায় যখন কাহারো মৃত্যু হয় তখন শয়তানের আনন্দের সীমা থাকে না । মানুষ জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে নিপতিত হওয়াটা শয়তানের জন্য খুবই আনন্দের ব্যাপার হয়।
বান্দাদের থেকে গুনাহের কাজ প্রকাশ হয়ে যাওয়া কোন বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। কিন্তু অসতর্কতার দরুন যদি কোন গুনাহ হয়ে যায়ই তাহলে মনে মনে লজ্জিত ও ব্যথিত হওয়া জরুরি। খাঁটি মনে লজ্জিত হওয়া আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দের বিষয় এবং এটা তাওবার জন্য বিরাট অঙ্গবিশেষ। আমার সৃষ্টি’কর্তা ও মালিক হলেন আল্লাহ। আল্লাহই আমাকে মানব দেহের অস্তিত্ব দান করে নানা প্রকার নিয়ামত দান করেছেন। মহান আল্লাহই আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ধন-দৌলতের মালিক। তাহলে আমি কি তার এবাদত বন্দেগী না করে গুনাহের কাজ করতে পারি ? এটা হচ্ছে আমার দ্বারা আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা ও তার অনুদানকে ভুলে যাওয়া।
তাওবার মূল বিষয় হল তিনটি :
(১) আন্তরিকভাবে লজ্জিত ও অনুশোচিত হওয়া ।
(২) গুনাহ না করার দৃঢ় প্রত্যয় করা ।
(৩) আল্লাহ তা’য়ালা এবং বান্দাদের যে সব হক নষ্ট’ করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা ।
এ ভাবে তাওবা করলে সে তাওবা আল্লাহর নিকট কবুল না হয়ে পারে না।
অধিক মাত্রায় নেক কাজ বা সওয়াবের কাজ করলে আল্লাহ তা’য়ালার নিকট দ্রুত কবুল হতে পারে। হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে যে, এক ব্যক্তি নবী কারীম (সা.) এর দরবারে হাজির হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! আমি বিরাট গুনাহের কাজ করেছি, আমার তাওবা কি কবুল হবে? তিনি বললেন তোমার মা কি জিবিত আছেন ? লোকটি বললো না জীবিত নেই। নবী কারীম (সা.) বললেন তোমার খালা কি জীবিত আছেন? লোকটি বললো হ্যাঁ, খালা বেঁচে আছেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন- তাহলে তুমি তোমার খালার খেদমত কর (তিরমিযী)। এ হাদিস দ্বারা ইহাই বুঝানো হয়েছে যে, তাওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে মা ও খালার সাথে সদ্বব্যবহার করা এবং তাদের খেদমত করায় অনেকটা সুফল পাওয়া যায়। নামাজ পড়ে তাওবা করার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা এ জন্য যে, নামাজ হচ্ছে বিরাট পুণ্যময় কাজ। দু’চার রাকাত নামাজ পড়ে যদি তাওবা করা হয় তা হলে সে তাওবা আল্লাহর কাছে যথার্থ তাওবা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে ।
হযরত আবু হুরায়রা (রা,) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের তিন অংশের শেষ অংশ যখন হয় তখন পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে নেমে এসে স্বীয় নূরের বিচ্ছুরণ ঘটান আর ডেকে বলেন যারা আমার নিকট এখন প্রার্থনা করবে আমি তার প্রার্থনা কবুল করে নেব। আমার নিকট খাস দীলে কেহ কিছু চাইলে আমি দিয়ে দিব। কেহ এ সময় আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। (বুখারী, মুসলিম)
অপর এক হাদিসে অতিরিক্ত এ কথা গুলো পাওয়া যায় যে, আল্লাহ তা’য়ালা তার স্বীয় কুদরতী হাত প্রসারিত করেন আর বলেন এমন কে আছে যে, এমন সত্তাকে ঋণ দিবে, যার নিকট সব কিছু আছে কোন কিছুর অভাব নেই। ফজরের ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত তিনি এমনিভাবে বলতে থাকেন’। (মুসলিম) এভাবেই রাতের শেষ ভাগে দোআ করা, ক্ষমা প্রার্থনা করার গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। আরেক হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, দোআ কবুল হওয়ার সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে ফজরের নামাজ আদায়ের পর এবং রাতের শেষ ভাগের মধ্যম সময়। (তিরমিযী)
সুবহে সাদেক অবধি দোআ কবুল হওয়ার কথা বারবার বলা হয়েছে। যারা তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন, তারা প্রতিদিনই দোআ করা, নিজেদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে চাওয়ার এবং তাওবা, ইস্তেগফার করার সুবর্ণ সুযোগ পান । যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠে না, তারাও মাঝে মাঝে এ সময় ওঠলে তাহাদের জন্য কতইনা ভাল হয়। দোআ ও তাওবা যে কোন সময় কবুল হতে পারে তবে এ সময়টা দোআ কবুল হওয়ার বিশেষ সময়। কাহারো ঘুমের মধ্যে যদি হঠাৎই ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখনই যদি আল্লাহপাকের কাছে কিছু যিকির আযকার করা হয় এবং তাওবা ইস্তেগফার করা হয়, তাতেও তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT