ধর্ম ও জীবন

  ওয়াজ করবেন কারা

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০১৯ ইং ০১:২৬:৫০ | সংবাদটি ২৩৩ বার পঠিত

ওয়াজ আরবি শব্দ। এর মানে উপদেশ, ধর্ম ব্যাখ্যা, নসিহত, অন্তর নরম হয় এরূপ উপদেশবাণী। যিনি ওয়াজ করেন তাকে ওয়াইজ বলে। ওয়াইজ মানে ধর্মীয় উপদেশদাতা, ধর্ম সম্বন্ধনীয় বক্তা। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মীয় উপদেশ দেয়াকে ওয়াজ বলে এবং ইসলাম ধর্মীয় উপদেশদাতা বা ব্যাখ্যাদাতাকে ওয়াইজ বলে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে যে কেউ ওয়াজ করতে পারবেন না। ওয়াজ করতে হলে তাকে অবশ্যই কুরআন হাদিস ও ইলমে ফিক্হ সম্পর্কে পা-িত্য অর্জন করতে হবে। প্রথমে কুরআন হাদিসের ওয়াজ মানুষকে জানাতে হবে। আর কুরআন হাদিসের ওয়াজ বা ব্যাখ্যা সঠিকভাবে মানুষ জানতে হলে ইলমে ফিক্হ সম্পর্কে পান্ডিত্য অর্জন করতে হবে। কারণ ইলমে ফিক্হ ছাড়া কুরআন হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা দেয়া যাবে না। কুরআন হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে ইলমে ফিক্হ। সুতরাং ওয়াইজ হতে হলে তার মধ্যে কুরআন হাদিসের তো জ্ঞান অবশ্যই থাকতে হবে সেই সাথে তার ইলমে ফিকহ সম্পর্কে অগাধ পান্ডিত্য থাকতে হবে। প্রথমে কুরআন বুঝতে হবে এবং কুরআন দ্বারা মানুষকে ওয়াজ করতে হবে।
ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এসেছে উপদেশ (কুরআন) ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তার প্রতিকার এবং মুমিনদের জন্য হেদায়ত ও রহমত’ (সূরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৭)।
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট একজন রাসুল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে; তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে (যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞান দ্বারা জানাকে হিকমত বলে) এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১২৯)।
পবিত্র কুরআনের প্রতিটি কথাই এক একটি ওয়াজ, প্রতিটি কথাই মানুষের জন্য সঠিক পথে চলার পাথেয়, মানুষের শান্তি ও মুক্তির পাথেয়। কুরআনের কথা শুনলে মানুষের অন্তর নরম হয়, মানুষের ঈমান বৃদ্ধি পায়। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তার আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন ইহা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে’ (সূরা : আনফাল, আয়াত : ২)।
দ্বিতীয়ত : হাদিস দ্বারা ওয়াজ করতে হবে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনÑ ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা জানিয়ে দাও’ (সূরা : দুহা, আয়াত : ১১)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কাজ ও অনুমোদনকে ‘হাদিস’ বলে। উক্ত আয়াতে হাদিসকে ‘নিয়ামত’ বলা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিটি কথা এবং কাজ মানুষের জন্য সঠিক পথে চলার পাথেয়, মানুষের শান্তি ও মুক্তির পাথেয়। তাই হাদিস জানতে হবে, হাদিসের মাধ্যমে ওয়াজ করতে হবে।
তৃতীয়ত : কুরআন হাদিসের ব্যাখ্যা ইলমে ফিক্হর আলোকে করতে হবে। এজন্য যিনি ওয়াজ করবেন তার জন্য ইলমে ফিক্হ অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা ইলমে দ্বীন (ইলমে ফিক্হ) অর্জন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে যাতে তারা সতর্ক হয়’ (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১২২)।
উক্ত আয়াত দ্বারা একথাটি দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার হয়ে গেয়েছ যে, যিনি ওয়াজ করবেন তার মধ্যে ইলমে ফিক্হ থাকা অপরিহার্য। ওয়াজ করার আগে তাকে ইলমে ফিক্হ সম্পর্কে অবশ্যই পান্ডিত্য অর্জন করতে হবে।
যারা ওয়াজ করেন তাদের মর্যাদা অতি উর্ধ্বে। এরা তো মূলতঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথেই মানুষকে আহবান করেন। এদের সুমহান মর্যাদার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘কথায় কে উত্তম ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত’ (সূরা : হামীম আস সেজদাহ, আয়াত : ৩৩-৩৪)।
আমাদের সমাজে অনেকে ওয়াজ করেন বটে; কিন্তু তাদের ওয়াজ শ্রুতার কোনো কাজে আসে না বা তাদের ওয়াজের মাধ্যমে শ্রুতার অন্তরে কোনো প্রভাব পড়ে না, এসব ওয়াজ দ্বারা জনগণ হেদায়ত লাভ করেন না। এর কারণ খুঁজে দেখা গেছে, যিনি ওয়াজ করেন তার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিম নেই, সেই সাথে তিনি যে পরিমাণ ওয়াজ করেন তার মধ্যে সে পরিমাণ আমল নেই। সুতরাং যার মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিম নেই, আমল নেই তার ওয়াজ শুনে মানুষের কী লাভ হবে? আমার প্রশ্ন হলোÑ যার ইলিম নেই, আমল নেই সে আবার ওয়াজ করবে কেন? যারা সৎ কাজের আদেশ দেন অথচ নিজেরা সেই সৎ কাজ করেন না তাদের ব্যাপারে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা কি মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ৪৪)।
মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে ওয়াজ। এই ওয়াজ করার পূর্বে কুরআন, হাদিস ও ইলমে ফিকাহর জ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে হবে। ইলিম ব্যতিত ওয়াজ করলে সেই ওয়াজ মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT