সম্পাদকীয়

জাতির পিতার জন্মদিন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৩:১৪ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত


আজ ১৭ই মার্চ, আমাদের জাতীয় জীবনে একটি স্মরণীয় দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন আজ। দিনটি জাতীয় শিশুদিবস হিসেবেও পালিত হচ্ছে। যার জন্ম না হলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হতো না, তৈরি হতো না সবুজের বুকে লাল রক্তখচিত পতাকা। তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। ১৯২০ সালের আজকের এইদিনে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার নিভৃত পল্লী মধুমতি নদী তীরবর্তী টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অকুতোভয় এই বাঙালির নেতৃত্বে আমাদের গৌরবের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়। তারই নেতৃত্বে সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। তারই নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অস্থায়ী মুজিব নগর সরকার গঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারও গঠিত হয় তারই নেতৃত্বে। আর এই স্বাধীন বাংলাদেশেই স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে খুন করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী চক্র; যারা চায় নি বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াক, যারা চায় নি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বিশ্বমানের নেতার উত্থান ঘটুক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শৈশব থেকেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দিতে থাকেন। সততা, বলিষ্ঠতা, সাহস, ন্যায়-অন্যায় বোধ এবং গভীর দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, মানুষের জন্য ভালোবাসা, ঝুঁকি গ্রহণ, নেতৃত্ব ইত্যাদি গুণাবলির অধিকারী ছিলেন তিনি। বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই এইসব গুণ ভালো ভাবে ছিলো তাঁর মধ্যে। তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পূর্বে কলকাতায়। এর আগেই ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪৭ সালে তিনি আইন বিষয়ে পড়ালেখা করার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন বিশ্ব বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্বদানে এগিয়ে আসেন তিনি। ফলে ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। সে সময় তিনি মুচলেকা ও জরিমানা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি এইজন্য যে, সেটা হবে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা। ফলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তার অধ্যয়নের এখানেই সমাপ্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকেন। ১৯৪৯ সালে পারিকস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের কার্যকর বিরোধী দল পূর্বপাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অথচ তখন তিনি কারাগারে বন্দি। এর আগে ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক মাতৃভাষা আন্দোলনেও নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। এজন্য তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দি। তিনিই ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি দিয়ে বাঙালি জাতীয় চেতনার বিস্ফোরণ ঘটান এবং সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে ছয় দফার সঙ্গে ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি যুক্ত হলে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের সেই ঘোষণা- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...’। বঙ্গবন্ধুর সেই উদাত্ত আহ্বানে চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালীরা যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পশ্চিমা হানাদারদের ওপর। এভাবেই নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অযুত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় হাজার বছরের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধু সারাজীবনই যে আদর্শ লালন করেছেন, সেটাই মেনে চলেছেন। তিনি বাঙালির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন নিরলসভাবে আজীবন। বাঙালি যাতে মাথা উঁচু করে বিশ্বের বুকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে দাঁড়াতে পারে, সেই সংগ্রামেই কেটে যায় তার জীবনের স্বর্ণালী সময়। তিনি কখনও তাঁর নীতি থেকে পিছপা হননি একদ-, আপস করেন নি অন্যায়-অবিচারের সঙ্গে। ব্যক্তিস্বার্থ বলতে কোনো কিছু কখনও ছিলো না তাঁর জীবনে। আর এ জন্যই বঙ্গবন্ধু আর দশজন রাজনৈতিক নেতার চেয়ে পৃথক অবস্থানে রয়েছেন। আজ আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে মহান জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ করে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া। আজ জাতির পিতার জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হচ্ছে। তাই প্রত্যাশা থাকবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে সুনাগরিক হিসেব গড়ে উঠবে। সুস্থ রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুবাতাস বইয়ে দিতে জাতির জনককে অগ্রপথিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই হবে অগ্রসর চিন্তার পরিচায়ক। সময়ের ধারাবাহিকতায় এই সত্যই দিন দিন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ ধরে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT