সাহিত্য গ্রন্থালোচনা

পাখির ঠোঁটে বসতি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৪:০৩ | সংবাদটি ৫৪ বার পঠিত

চারদশক থেকে পুলিন রায় নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ। তিনি একাধারে সৃজনশীল কবি, সংগঠক এবং সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘ভাস্করের’ সফল সম্পাদক। ‘ভাস্কর’ দীর্ঘ ২৯ বছর যাবৎ তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে। এপার বাংলা-ওপার বাংলা দুই বাংলায় কবিতার ভুবনে কবি পুলিন রায়ের রয়েছে দীপ্ত পদচারণা।
ইতিমধ্যেই কবির তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও দুটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘স্বপ্ন যাবে সমুদ্র ¯œানে’ (২০০১), ‘কালের পালকে আঁকা’ (২০০৬), ‘সুঘ্রাণ ছড়ানো মৌনতা’ (২০১৭) এবং গল্প গ্রন্থ দু’টি হলো ‘কষ্টের নোনা জলে যাপিত জীবন (২০০৪), ‘ওরা সবুজ ওরা জীবন যোদ্ধা’ (২০০৮) তারই ধারাবাহিকতায় এবার অমর একুশে বই মেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ পাখির ঠোঁটে বসতি’ বইটির নামকরণেও রয়েছে কবির সৃজনশীলতার স্বাক্ষর।
পুলিন রায়ের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তার কবিতায় একবার যখন প্রবেশ করবেন তখন পাঠক তার বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবেন এখানেই কবির মননশীলতার পরিচয় ফুটে উঠে। তার কবিতার ভাষা ঝরঝরে, সাবলিল, সহজ-সরল, নির্মেদ এবং শ্রুতিমধুর ও মাধুর্যপূর্ণ যা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করবে। তার এই গ্রন্থে কবি অনেক গ্রামীণ লোকজন শব্দ ব্যবহার করেছেন যেমন-‘দইয়ল’ ‘কুড়া’, ‘ডানকিনি’, ‘বিন্নাপাতা’ ইত্যাদি। কবি আধুনিক মননে শিকড় সন্ধানী। তাই তার কবিতায় পাওয়া যায় তার শৈশব-কৈশোরের ফেলে আসা গ্রামের দিনগুলি কবি সাগর সেচে একেকটি মণিমুক্তা তুলে এনে কবিতার অক্ষরে সাজিয়েছেন। তার কবিতা পড়লেই পাঠক খুঁজে পাবে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের কবিতার আস্বাদন। এখানে ‘পাখির ঠোঁটে বসতি’ থেকে কিছু কবিতার অংশ পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি- ‘হেমন্তের পদাবলি কবিতায়’ কবি বলছেন- হেমন্তের উদাস দুপুরে একটানা ঘুঘু ডাক/ছায়া সুনিবিড় বাঁশ বাগান পাতা ঝরার শব্দ আমাকে উত্তাল করে। কবি হেমন্তের রূপ বর্ণনা হেমন্তের গভীর অনুভূতির আনন্দ যেমন কবিকে সুখ-দুঃখের মিলন বিরহের অতীন্দ্রীয় আনন্দলোকে উত্তীর্ণ করে। কবি তার মনের মাধুরি মিশিয়ে হেমন্তের মাঠ ভরা সোনালী ধান, কৃষাণ-কৃষাণীর নবান্নের ব্যস্ততা অত্যন্ত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন হেমন্তের পদাবলি কবিতায়। তার পরের কবিতা ‘আমার গ্রাম আমার শেকড়’ কবিতায় কবির লোকায়ত গ্রামীণ মানব প্রবণতার প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়। কবি এক তীক্ষè স্মৃতি বিধুর আচ্ছন্নতার ভেতর গ্রামীণ সৌহার্দ্যপূর্ণ মৃত্তিকার কাছে গিয়ে লোকজীবনের স্বতঃস্ফুর্ততাকে ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন এই কবিতায়। কবি বলছেন ‘আমার মা, মাটি নিয়ে মধুরতর স্মৃতির ভান্ডার/আমি অনন্তকাল ঘুমিয়ে রবো নদীর শিয়রে পুকুরের ঘাট আর পাখি ডাকা শান্ত ¯িœগ্ধ বনবিথীকার ছায়ায়’ অসম্ভব সুন্দর এই কবিতা পড়ে মন আনন্দে দোলে উঠবে।
এমন একটি দিন আসুক কবিতায় কবি একটি সুন্দর আলোভরা দিনের কথা বলছেন। যেখানে কোকিল সারাদিন গান গাইবে। বকুলের গন্ধ বাতাস মনকে করবে মাত। কবি মনের আকুতি প্রকাশ করেছেন এমন একটি দিন আসুক মানুষ শুধু হাসবে। সুন্দর একটি দিনের জন্য কবির অনুভূতি চমৎকারভাবে ফুটেছে এই কবিতায়। শরৎকাল এলেই বাঙালি মনে কাশফুলের ছোঁয়া আর মায়ের আগমনীতে ঘরে ঘরে বেজে উঠে শঙ্খ, ঘন্টা, আর উলুধ্বনি। কবি শরৎকে তুলে এনেছেন তার কবিতায় এইভাবে যেমন কবি বলছেন-‘উন্মুল আনন্দে নাচে বাউন্ডেলে শরৎ/উৎসবে ভরে বেলতলা রাজপথ/আলোয় ভরে ভুবন/বাংলার প্রকৃতিতে শরৎ স্বমহিমায় উজ্জ্বল। কবি শরৎকে বাউন্ডেলের সাথে তার আচরণকে তুলনা করেছেন সুনিপুণভাবে। তার পরের কবিতা ‘তুমি বহুবীর’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি ওসমানীকে শতজন্ম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে লিখেছেন-‘ইতিহাস কথা বলে/তোমার কীর্তির কথা/তোমার সাহসের ইতিবৃত্ত জানে পুরো বিশ্ব।’ মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয়মাস বঙ্গবীর ওসমানীর যুদ্ধ কৌশল, সাহস, বুদ্ধিমত্তা মুক্তিবাহিনীকে সামনে থেকে পরিচালনা করা সারা বিশ্ববাসীর প্রশংসা লাভ করে এই কবিতার মাঝে বঙ্গবীর ওসমানীকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মা এক মধুর শব্দ। যে কোনো সন্তানের কাছে তার প্রিয়জন তার মা। কবি ‘মায়ের হাসি’ কবিতায় মাকে হারিয়ে দিশেহারা। যেমন তিনি লিখেন- মা হারিয়ে দুঃখি আমি চোখের জলে ভাসি/তারায় তারায় খুঁজে ফিরি মায়ের মুখের হাসি। মাকে নিয়ে চমৎকার তাল-লয়-ছন্দের এই কবিতা পাঠককে মুগ্ধ করবে। সবশেষে যে কবিতার শিরোনাম দিয়ে গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে ‘পাখির ঠোঁটে বসতি’ তার দুটি পঙক্তি এই রকম-‘মুঠো মুঠো আলো দেবো, আলো নেবো, আলোয় ভাসবো, আলো জ্বালাবো, আলোয় নাচবো। কবির একান্ত ইচ্ছে এই আলোর পৃথিবীতে পাখি হয়ে, পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে উড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে যাওয়া। পৃথিবীর মানুষের সাথে ভিন দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, সভ্যতার সাথে ভাবের আদান প্রদান করা। তার এই আকুতি ফুটে উঠেছে। পাখি যেমন ঠোঁটে করে তৃণলতা দিয়ে একেক দেশে গিয়ে তার বসতি স্থাপন করে কবিও ঠিক সেভাবেই পাসপোর্ট বিহীন মুক্ত পাখির মতো একটি উন্মুক্ত বিশ্বে বসবাস করতে চান। যেখানে যুদ্ধ-হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানি রক্তপাত থাকবে না। থাকবে শুধু আলোয় ভরা পৃথিবীতে আলোময় মানুষ।
কবির কাজ হলো স্বদেশ-মা-মাটি-মানুষের জন্য কবিতার মাধ্যমে আগামী শতাব্দীর জন্য কবিতার অক্ষরে দলিল রেখে যাওয়া। কবি পুলিন রায় আজীবন কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের জন্য, আমাদের প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছেন কবিতার দৃশ্যকাব্য। কবির বিশ্বাস ও একাগ্রতাই তার কবিতাগুলিকে করবে কালোত্তীর্ণ। তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিনি গভীরভাবে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে ঢুকে যান। তাই তার কবিতা পড়তে পাঠককে করে তুলে আগ্রহী। আমি আশাবাদী তার এই কবিতার বইটি তুমুল পাঠক জনপ্রিয়তা পাবে।
ঝকঝকে ও নির্ভুল ছাপা সেই সাথে দেশসেরা প্রচ্ছদ শিল্পী রাজিব দত্তের নান্দনিক প্রচ্ছদে গ্রন্থটিকে করেছে আরো বেশি আকর্ষণীয়। গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন প্রিয় মানুষ মমতাময়ী মাকে। প্রকাশক রঞ্জু রানী রায়। ভাস্কর প্রকাশন, টিলাগড়, সিলেট। ছেপেছেন ছাপাখানা, মাছুদিঘির পার, তালতলা, সিলেট। মূল্য ১২৫ টাকা মাত্র। বইটি পাওয়া যাচ্ছে সিলেটের অভিজাত লাইব্রেরী বইপত্র রাজাম্যানশন, জিন্দাবাজার, সিলেট। বাতিঘর-চট্টগ্রাম এবং উৎস প্রকাশন পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। কবি পুলিন রায় ব্যক্তিগত জীবনে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং স্ত্রী, এক কন্যা এক ছেলে সন্তানের জনক। তিনি একজন সজ্জন, বন্ধুবৎসল, অমায়িক, মিষ্টভাষী কবি হিসেবে সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। আমি তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল, সুস্থ-সুন্দর কল্যাণময় জীবন প্রার্থনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT