সাহিত্য

কবিতার উন্মুক্ত দুয়ার

নাসিম আহমদ লস্কর প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৫৩ | সংবাদটি ২০৩ বার পঠিত



‘জীবন যেখানে যেমন/ মন সেখানে হয়তো তেমন; নয়তো তেমন।’ প্রবাস জীবন ব্যস্ততায় ভরপুর। দেশের মাটি থেকে দূরে গিয়ে বসবাস, সেই সাথে জীবনের কৃত্রিমতা মানুষের মনকে আন্দোলিত করে তুলে। নিজ মাটির জন্য মানুষের মন আকুল হয়ে উঠে। স্মৃতিতে ভরিয়ে তুলে জীবনের সুখময় ঘটনাগুলো। ভাবনার আবেশে হারিয়ে যায় মানুষ। কেউবা রচনা করে কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাস। কেউবা গুনগুনিয়ে সুর তুলে নিজের ভায়োলিনে। প্রবাসী কবিদের কবিতায় ফুটে উঠে দেশকথন, দুঃখকথন, সুখকথন, স্মৃতিকথন ইত্যাদি নানা বিষয়।
কবি ফাহমিদা ইয়াসমীন বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার এক কৃতি সন্তান। বর্তমানে তিনি লন্ডনে প্রবাস জীবন পার করছেন। দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর রয়েছে প্রচ- নাড়ির টান। প্রিয় স্বদেশ, গ্রাম্য পরিবেশ, জ্যোৎস্না মাখা রাতের রূপালী পর্দা, প্রিয়মুখ সবই এখন তাঁর চোখের অন্তরালে; মনকে হাতছানি দেয় নানারূপে; ব্যাকুল করে তুলে তাঁর মন। বাঙালি, বাংলাদেশ, বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর রয়েছে প্রচ- ভালোবাসা। তাইতো তিনি ইংরেজ ভূখন্ডে গিয়েও ভুলতে পারেননি বাংলাকে। নিজের ভাষায় অবিরত রচনা করে যাচ্ছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস। এ পর্যন্ত তাঁর দুটি একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই সাথে কয়েকটা যৌথ গ্রন্থও আলোর মুখ দেখেছে। অমর ২১শে বইমেলা ২০১৮ তে সিলেটের প্রাকৃত প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নীলিমার প্রেম’। বইটিতে মোট ৭২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রতিটি কবিতাই গভীর অর্থ বহন করে।
মানবজীবনের সাথে আধ্যাত্মিকতা বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিটি মানুষ পার্থিব জীবনে পুণ্য কাজ করে পরজীবনে স্বর্গ লাভের আশায়। দিদার লাভ করতে চায় প্রিয় রবের। কবিও তাঁর প্রিয় রবের দিদার লাভ করতে চান। ‘রিক্ত হস্ত চাইনা যেতে / ওগো দয়াময় তুমি দয়া করো।/ সেই পথের দিশা দাও যে পথ পূর্ণতায় ভরা’।/ ‘তোমার প্রেমে মগ্ন রাখো।
একাকি জীবন বড়ই একঘেয়ে। মানুষ যখন তার প্রিয়জন থেকে দূরে চলে গিয়ে একাকিত্ব জীবনের ফাঁদে পা দেয় তখন সে সমগ্র জগতকে টুকরো টুকরো করে কষ্টের কষ্টি পাথরে ঘষে ঘষে বিশ্লেষণ করে। অগোছালো ভাবনাগুলোকে কালের দর্পণে দৃশ্যমান করতে রচনা করে কবিতা। কবিও তাঁর প্রবাসজীবনে ভাবনার বালুকরাশিকে সাজান কবিতার পিরামিডে। ‘আজকাল হৃদয়টা বডড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে/ রাত গভীর হয়ে এলে এক অজানা উন্মাদনায়/ মগ্ন হয়ে থাকি।/ ...... জানিনা এসব ভাবনায় কতকাল মগ্ন থাকবো/ হয়তো আজীবন আড়ষ্ট মনে ভেবে ভেবে/ কাতর হয়ে সাজাবো কবিতার কোলাহল।/ কবিতার কোলাহল’।
আপন মাটি, যে মাটিতে মানুষ তাঁর শৈশব, কৈশোর কাটায় সে মাটির প্রতি তার থাকে নাড়ির টান। এ মাটির প্রতি কখনো বিচ্ছেদ ঘটেনা। কবি প্রবাস জীবনে আপন মাটির প্রতি তাড়িত হয়েছেন। সেই তাড়নার পরিচয় মিলে তাঁর কাব্যিক ভাবনায়। ‘যত দূরে থাকি বারবার কাছে টানে মাটির ঘ্রাণ/----- বারবার ফিরে পেতে চাই/ অমলিন স্মৃতিময় বাংলা মাটির সবুজাভ সুন্দর।/ মাটির ঘাণ’।
প্রকৃতির সাথে বাঙালি মনের রয়েছে গভীর সখ্য। বর্ষার মায়ামাখা আশীর্বাদে প্রকৃতি নবরূপে সজ্জিত হয়। প্রকৃতির এমন রমণীয় রূপ দেখে কবি হৃদয়ও আনন্দে নেচে উঠে। তাইতো বর্ষার সৌন্দর্য তিনি বন্দি করেন কবিতার ফ্রেমে। ‘এসেছে আষা কদম ফুটেছে ডালে/ বিমুগ্ধ মনে শুনছি বৃষ্টির গান / ...... প্রকৃতির নবসাজ দেখে মনে বাজে আনন্দসুর’।/ ‘আষাঢ়ের অনুভূতি’।
দুঃসময়ে মানুষ সান্নিধ্য চায় প্রিয়জনের। দুর্ভাগা এ সময়টাতে মানুষ তার আপনজনের ছায়া পেতে চায়। নিকষ কালো অমানিশা যখন মানুষের জীবনে নেমে আসে তখন সে প্রিয়জনের একটুখানি সাহায্যের প্রত্যাশায় থাকে। কবিও তাঁর জীবনের প্রতিকূল সময়টুকু কাটিয়ে দিতে চান প্রিয়জনের হাত ধরে। একান্ত আপনভাবে পেতে চান প্রিয়জনকে দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ‘ঘোর অমাবস্যায় তোমার চোখের আলোয় খুঁজে নেবো পথ/......দূরের দিগন্তে লীন হবো প্রেম আয়োজনে।/ ........ মধুচন্দ্রিমায় কেটে যাবে জগতের যাবতীয় জঞ্জাল’।/ ‘অমাবস্যায় দেখা হবে চাঁদের আলো’ ।
‘নীলিমার নীল’ গ্রন্থটির নাম কবিতা। ভালোবাসা যখন মানুষের সুতোয় ধরা দেয় তখন সে জগতের যাবতীয় জঞ্জাল ভুলে যায়। প্রিয় মানুষটির সাথে কাটিয়ে দিতে চায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর। পৃথিবী হয়ে উঠে স্বর্গময়। ‘নীলিমা বলে ডাকলে আমায়, মন চলে যায় নীলাচলে/ .... তোমার চোখে দেখি আকাশবাতাস চিরসবুজ হবে/ সারাবিশ্ব যেন সুখের নীলাকাশ’।/ ‘নীলিমার প্রেম’। প্রবাস জীবনের একাকিত্ব কবির ভাবনাকে করে তুলেছে শৈল্পিক। তাঁর এসব ভাবনার সুগন্ধ কাব্যিকরূপে স্থান পেয়েছে বইয়ের পৃষ্ঠায়। বইটির প্রতিটি কবিতার শব্দচয়ন বেশ ভালো। আমি বইটির পাঠক প্রিয়তা কামনা করছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT