স্বাস্থ্য কুশল

আপনিই সুস্থ রাখতে পারেন আপনার কিডনি

সীতাব আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০১৯ ইং ০০:২৯:০২ | সংবাদটি ২২৯ বার পঠিত

কোমর বরাবর পেছন দিকে দুই পাশে রয়েছে মানুষের দুই কিডনি। তার রয়েছে ২০ থেকে ২৪ লক্ষ ছাঁকনি, যাকে বলা হয় নেফ্রন। প্রতি আধা ঘন্টায় কিডনিগুলো দেহের সমস্ত রক্ত ছেঁকে দেয়। রক্তের বর্জ্যগুলো ছেঁকে দুই ইউরেটারের মাধ্যমে মুত্রথলিতে ফেলে দেয়। ইউরেটারকে একটা টিউব বা নল বলা যেতে পারে, যা কিডনি ও মুত্রথলির সাথে যুক্ত। আর মুত্রথলি থেকে মুত্রনালি হয়ে বর্জ্য দেহ থেকে বের হয়ে যায়। দেহের এই বর্জ্য বেরকরণ প্রক্রিয়া বিপর্যস্থ হলে অনেক ধরণের রোগ হতে পারে, কিডনি নিজেও বিপর্যয়ে পড়তে পারে; এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
কিডনি কাজ না করলে ডায়ালিসিসের মাধ্যমে অর্থাৎ যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত ছাঁকা যায়, তবে এ প্রক্রিয়া কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। সাধারণত এ প্রক্রিয়া কয়েক বছর পর্যন্ত চলে, তারপর সব শেষ। ইউরেনারি সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। আর কিডনি রোগের কারণ অনেকগুলো। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, খাবারে প্রাণিজাত প্রোটিনের আধিক্য (প্রাণিজাত প্রোটিন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ, আর ঐ রোগগুলো কিডনি রোগেরও কারণ), সফ্ট ড্রিংক্স (কোকা কোলা, এনার্জি ড্রিংক্স ইত্যাদি ডজন খানেক কোম্পানীর), ফাস্ট ফুড (বার্গার, হটডগ, নুডলস, পিজ্জা, শরমা, গ্রীল্ড, বিভিন্ন ধরণের রোল, সামুসা, পেডিস ইত্যাদি), সিরাপ (রুহ আফজা বা বিভিন্ন স্বাদের শরবত-পাউডার ইত্যাদি)।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, দৈনিক কালের কণ্ঠ এক ভয়ানক নিবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, ‘বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বাজার থেকে বিভিন্ন ব্রান্ডের ফ্রুট সিরাপ, বিশেষ করে রুহ আফজা, সিনা রোজ ও বায়োরোজের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। বেনজয়িক এসিডের মাত্রা থাকার কথা প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিগ্রাম। অথচ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নমুনা পরীক্ষায় তা পাওয়া যায় ৫৩৪ মিলিগ্রাম/কেজি। বিডিএস মান অনুযায়ী পণ্যগুলোতে স্যাকারিন মেশানোর সুযোগ নেই। অথচ পরীক্ষায় দেখা গেছে প্রতি কেজিতে ২৬৪ মিলিগ্রাম বা তারও বেশী হারে স্যাকারিন মিশিয়েছে কোম্পানীগুলো। এটা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ পরিপন্থী।’ সরলমনা মুসলমানরা আরবী নাম দেখে ইফতারের সময় ‘রুহ আফজা’ পান করে, কোম্পানীগুলো কী অমানুষিক প্রতারণা করে যাচ্ছে টাকার লোভে, মানুষ আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়ছে!
ক্ষতির তালিকায় আরো আছে পরিশোধিত কার্বহাইড্রেট (ময়দা ও সাদা চিনি ইত্যাদি), প্রক্রিয়াজাত উচ্চ লবণ মিশ্রিত খাবার (পটেটো চিপ্স, সল্টি বিস্কুট, নিমকি, আচার ইত্যাদি), গুঁেড়া দুধ, কৃত্রিম রঙিন খাবার (কালোজাম, রঙিন মিষ্টি ইত্যাদি), চিকিৎসকের নির্দেশনা বিহীন ব্যথা নিরোধক যেমন প্যারাসিটামল, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম ঔষধ ইত্যাদি, অতিরিক্ত কফি ও চা, সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য ও অপরিশোধিত পানি। এ ছাড়া প্রশ্রাব ধরে রাখাও কিডনি রোগের বড় কারণ।
কিডনির একটা বড় ধরণের রোগ হচ্ছে পাথর। আমেরিকার উত্তর মায়ামি বীচের একজন স্বনামধন্য ইউরোলজিষ্ট হচ্ছেন ডা. ওয়াইন এ ষ্টেইন্সনাইডার। তিনি বলেন, ‘আপনার কিডনিতে পাথর হলে বা রোগ হলে আপনি আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন যে এর কোন প্রাকৃতিক নিরাময় ব্যবস্থা আছে কি না। যদি ডাক্তার ‘না’ বলেন, তবে অন্য ডাক্তারের কাছে যান। প্রাকৃতিক নিরাময় আপনার জন্যে অবশ্যই আছে। তবে আপনার প্রশ্রাব আটকে আটকে গেলে, ব্যথা হলে বা প্রশ্রাবের সাথে রক্ত গেলে অবশ্যই দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হউন।’
হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এক যুগের অধিক সময় ধরে সহ¯্রাধিক মহিলার কিডনির কার্যকারিতা নীরিক্ষা করেন। তারা বলেন,“সুস্থ কিডনি প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি ধরে রাখার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে। কিন্তু মুত্রের সাথে প্রোটিন যদি যেতে থাকে অর্থাৎ কিডনি যদি প্রোটিন লীক করে তবে নিশ্চিতভাবে সে অকার্যকারিতার দিকে এগিয়ে যায়। কিডনি অকার্যকর করার জন্যে তিনটি উপাদান দায়ী আর এই তিনটি উপাদান একই জায়গায় পাওয়া যায়। এগুলো হল: প্রাণিজাত প্রোটিন (মাংস, দুধ ও ডিম), প্রাণিজাত চর্বি (ঘি, মাখন, পনীর ইত্যাদি) এবং কোলেষ্টেরল। উদ্ভিদজাত প্রোটিন বা উদ্ভিদজাত চর্বি গ্রহণে ক্ষতির কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।’
গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, বিগত ২০১০ সালের পর এ পর্যন্ত কিডনি রোগে মৃত্যুর হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আর এর মূলে রয়েছে মাংস ও মিষ্টিজাত খাবারের আধিক্য (যেমন-ভুনা মাংস, কাবাব, টিক্কা, রোষ্ট, গ্রীল ইত্যাদি খাবারের পর আবার ডের্জাট হিসেবে মিষ্টি খাওয়া)। আর এখন মিষ্টিতে ব্যবহার হয় ঐরময ঋৎঁপঃড়ংব ঈড়ৎহ ঝুৎঁঢ় সংক্ষেপে ঐঋঈঝ. এটা উচ্চ রক্তচাপ ও ইউরিক এসিড বাড়ায়। এগুলো আবার কিডনির ‘কার্যভার’ বাড়িয়ে দেয়। ক্রমাগত এই কার্যভার ও মাংস থেকে আগত এসিড আক্রমণের ফলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। আপনি একটু টুনা (সামুদ্রিক মাছ) খান, তিন ঘন্টার মধ্যে কিডনির কার্যভার ৩৬% বেড়ে যাবে। আপনি উদ্ভিদজাত যে কোন খাবার অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন, তাতে কিডনির স্বাভাবিক কাজে কোন হেরফের হয় না। ফল ও সবজি এসিড আক্রমণ থেকে কিডনিকে সুরক্ষিত করে এবং কিডনির কার্যভার লাঘব করে।
গত ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, দৈনিক ইত্তেফাক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অনেক গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে উৎপাদিত হাঁস, মুরগী ও মাছের শরীরে মিলেছে হেভিমেটাল (এক ধরণের বিষাক্ত পদার্থ), যা খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করে। এ ধরণের মাছ ও মাংস গ্রহণ করলে তা মানবদেহে প্রবেশ করে।
“রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, ট্যানারির বর্জ্য থেকে উৎপাদিত পোলট্রি ফিডে হেভিমেটাল ক্যাডমিয়াম, সিসা, মার্কারি মানে পারদ ও ক্রোমিয়ামসহ বেশ কিছু বিষাক্ত পদার্থ মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব ধাতু ও রাসায়নিক থেকে ক্যান্সার, হৃদরোগ, আলসার ও কিডনি অসুখ হতে পারে। মানবদেহে অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম প্রবেশ করলে পুরুষের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস, নারীদের অকাল বার্ধক্য, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, এজমা, শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগ হয়ে থাকে।’
২০১২ সালে প্রকাশিত গবেষণা মূলক ইতালিয়ান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, গরুর মাংস, টুনা, অন্যান্য মাছ, মাখন ইত্যাদি যত না ক্ষতিকর, তার চেয়ে বেশী ক্ষতিকর হচ্ছে ডিম। কারণ ডিম হচ্ছে এগুলো থেকে অধিক এসিড উৎপাদনকারী আর মানুষ এক সাথে আস্ত একটির কম তো খায় না! আবার ময়দার তৈরী ব্রেড ও সাদা ভাত কিছুটা এসিড উৎপাদন করে। বীচি, ফল ও শাক-সবজি হচ্ছে পাথর ধ্বংসকারী খাবার। এর সাথে থাকতে হবে প্রচুর পানির সরবরাহ। এগুলো ঔষধের চেয়েও ভাল কাজ করে। কিডনি রোগ হলে ডাবের পানি পান করা ও ফুলকপি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। খাবারে একটুখানি পরিবর্তন কিডনিতে পাথর তৈরীর প্রক্রিয়া আটকে দিতে পারে এমন কি কিডনির পাথর গলিয়েও ফেলতে পারে।
মুরগী মোটাতাজা করণে ও মাংসের রং উজ্জল করার জন্যে মুরগীকে ফসফেট ইনজেকশন দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যখন থেকে ওজন দরে মুরগী বিক্রি শুরু হয়েছে। কোলা ড্রিংক্সে এই ফসফেট ব্যবহার না করলে কোকা কোলা বিশ্রি ধরণের কড়া কালো রঙের হয়ে যেত। সুপার মার্কেটগুলো ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাদের ৯০% ভাগ মুরগীর মাংসে ও মুরগী দ্বারা তৈরী খাবারে ফসফেট আছে। কিডনি রোগীর জন্যে এগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। আর যারা সুস্থ, তারাও ক্ষতি থেকে রক্ষা পান না।
মার্কিন গবেষক ড. মাইক্যাল গ্রীগার বলেন, ‘কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করার ফলে যে সমস্যাগুলো হয়, তা বুঝার আগেই অনেকের কিডনি নষ্ট হতে থাকে। তাই কিডনি সুস্থ রাখার দিকে অত্যধিক নজর দেওয়া উচিত। সুখবর হচ্ছে, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তথা অপরিশোধিত উদ্ভিদজাত খাবার কিডনিকে রোগমুক্ত রাখতে সক্ষম।’
কিডনি সুস্থতার জন্যে প্রচুর পানি পান প্রয়োজন, ইউরিক এসিড এর কারণে যে পাথর হয়, তা রোধ হবে। খাবেন কলা, ডাব, লেবু, তরমুজ, টমাটো, গাজর, ক্ষিরা, কমলা, আঙ্গুর, পুদিনা ও ধনিয়াগুড়োর সাথে মধু। এগুলোর জুসও খুব উপকারী। আমাদের সচেতনতার অভাবে ছোটখাটো পাথর হয়ে গেলেও একা ডাবই তা ঠেলে বের করে দিতে পারে। আপনার সকাল শুরু হতে পারে লেবুপানির সাথে কালোজিরা ও মধু দিয়ে। আর বাদ দিন মাংস, মুরগী, সর্ডিনস (মাছ), মগজ, কলিজা, কিডনি ও ভাজাপোড়া খাবার। সুস্থতার অন্যতম অনুসঙ্গ মেডিটেশন। মনছবির মেডিটেশনে মানসচক্ষে দেখতে হবে যে, কিডনি সুন্দরভাবে কাজ করছে। তাতে অবচেতন মন ব্রেনকে দিয়ে পুরো দেহ টিউন করবে, আর সুস্থতার জন্যে যা দরকার তা করার জন্যে দেহে কাজ করবে। মেডিটেশনের ফলে ইম্মিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়, আর নিরাময় প্রক্রিয়া শুরু হয়। অসুস্থ না হলে, সুস্থ থাকার জন্যে ও প্রশান্তি প্রাপ্তির জন্যে নিয়মিত দুইবেলা মেডিটেশনের কোন বিকল্প নাই। এই সাথে গুরুত্ব দিতে হবে শারীরিক পরিশ্রম ও ইয়োগায়। কিডনি সুস্থতার জন্যে ইয়োগা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেহটাকে সচল রাখতে এ এক অনন্য ব্যবস্থা।
আমাদের সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝে না।’ কিডনি সুরক্ষার ব্যাপারে আমরা এ প্রবাদকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাই। তাই কিডনি অসুস্থ হওয়ার আগেই জীবনাভ্যাসে একটু সচেতন হলেই আমরা কিডনিকে সুস্থ রাখতে পারি, আর এ সক্ষমতা আমাদের আছে।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার
  • ঘাড় ব্যথায় বালিশ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
  • ডায়াবেটিস নিয়ে যে তথ্য জানা প্রয়োজন
  • রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা
  • রোগ প্রতিরোধে ছোলা
  •   গরম মশলার গুণাগুণ
  • ফুড সাপ্লিমেন্টের অবিশ্বাস্য কাহিনী
  • রমযানে সুস্থ থাকুন
  • রোগ নিরাময়ে লিচু
  • আগরের যত গুণ
  • উচ্চ রক্তচাপ মুক্তির উচ্চতর গবেষণা
  • নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবনে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
  • ব্যথানাশক ওষুধ নাকি ফিজিওথেরাপি
  • রোগ প্রতিরোধে তরমুজ
  • কণ্ঠনালির সমস্যা ও প্রতিকার
  • পিত্তথলীর ভেষজ চিকিৎসা
  • ফুটপাতের শরবত আর চাটনি : সংকটে জনস্বাস্থ্য
  • স্মৃতিশক্তি সমস্যা : করণীয়
  • যক্ষ্মা নির্মূলের এই তো সময়
  • মলদ্বারের রোগে পেটের সমস্যা
  • Developed by: Sparkle IT