স্বাস্থ্য কুশল

অতিরিক্ত ওজন ও স্থুলদেহী প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩১:৫৮ | সংবাদটি ২০৭ বার পঠিত

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশে বিবাহিত প্রতি পাঁচ জনে একজন মহিলা অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলদেহী। গ্রামের চেয়ে শহরে এর সংখ্যা অধিক। সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও টেলিভিশনের পেছনে সময় ব্যয় এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে। নারী পুরুষের উচ্চতা অনুসারে দেহের ওজনের মাপকাঠি রয়েছে। ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার নারীর আদর্শ ওজন ৫৫ কিলোগ্রাম। আবার ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার পুরুষের ওজন ৫৭.৫০ কিলোগ্রাম থাকতে হয়। অতিরিক্ত ওজন কিংবা স্থূলদেহীদের বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপ, বৃক্ষ ও হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
৭ এপ্রিল বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ভালো থাকুন, ডায়াবেটিসকে পরাজিত করুন’। মানুষের অনেক অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। এবারের স্বাস্থ্য দিবসে বহুমূত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বহুমূত্র পৃথিবীময় মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুমূত্রকে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ রোগে প্রতি সেকেন্ডে বিশ্বে একজন রোগী মারা যাচ্ছেন। বছরে ৫০ লক্ষ রোগী মারা যান। এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এশিয়া ও আফ্রিকার গরিব দেশে বেশি। আমাদের দেশে বর্তমানে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে গুরুতর অসুখের মধ্যে বহুমূত্র অন্যতম। তাই ইহাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মানুষের মৃত্যুর ৭ম কারণ হবে বহুমূত্র রোগ। উপরোক্ত গবেষণার ফলাফলের আলোকে বলা যায় বহুমূত্র রোগে মহিলারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
আরাম আয়েশের জীবন যাপন করতে গিয়ে স্বচ্ছল মহিলারা শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। আধুনিক যুগে গৃহস্থালীর কাজ কর্মে মহিলাদেরকে যথেষ্ট শ্রম দিতে হয় না। বহু ধনী মহিলা গৃহকর্মী দিয়ে সাংসারিক কাজ কর্ম করান। তারা কাজে হাত দিতে চান না। তাদের আভিজাত্য ক্ষুন্ন হয়ে যাবে। নিজের কাজ নিজে করা উত্তম। অন্যকে দিয়ে করালে তৃপ্তি মেলে না। স্বচ্ছল স্বামীর স্ত্রীরা গৃহস্থালীর কাজ কর্মের জন্য বোয়া নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এখানে শ্রম বাজার সস্তা। দরিদ্র ও নিরক্ষর কিংবা কিঞ্চিত শিক্ষিত মহিলার অভাব নেই। তাদেরকে স্বল্প বেতনে গৃহপরিচারিকার কাজে নিযুক্ত করা যায়। ওদেরকে দিয়ে কাজ করানো যায় বলে স্বচ্ছল স্ত্রীরা বিনা শ্রমে স্থূল দেহী হচ্ছেন। তারা পরিশ্রম না করে সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে পরিণামে কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছেন। ঘূর্ণমান চাকায় জং ধরে না। শরীর সদা সচল রাখতে হয়। একটি যন্ত্র ব্যবহার না করে ফেলে রাখলে জং ধরে। এক সময় নষ্ট বা বিকল হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা মানবদেহ উত্তম রূপে সৃজন করেছেন। পদদ্বয় দিয়েছেন হাঁটার জন্য। কেবল গাড়িতে বসে চলতে নেই। করদ্বয় দিয়েছেন কাজ কর্মের জন্য। কেবল অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে নেই। শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরে জং ধরে। অর্থাৎ রোগ ব্যাধি হয়। এটা সবার জানা। বলার অপেক্ষা রাখে না। যুক্তরাজ্য ও যুক্ত রাষ্ট্রে অনেক বাঙালি পরিবার রয়েছেন। বিশেষ করে সিলেটিদের অবস্থান বেশি। সেখানে গৃহ পরিচারিকা নেই। পাওয়া দুষ্কর। গৃহস্থালির কাজ কর্ম নিজেদেরকে করতে হয়। আমার দু’বার যুক্তরাজ্য গমনের সুযোগ হয়েছিল। অনেক বাঙালি ও কতিপয় ব্রিটিশ পরিবারে গিয়েছি। কোথাও গৃহপরিচারিকার বা কাজের মেয়ের দেখা মেলেনি।
এক সময় ধান ভাঙ্গানোর মিল ছিলো না। মহিলারা ধান বানতেন। এখনকার ছেলেমেয়েরা ‘গাইল’ ও ‘ছিয়ার’ কথা হয়তো শুনে নাই কিংবা দেখেন নাই। গাইলে ধান রেখে ছিয়া দ্বারা বারবার আঘাত করা হয়। মহিলারা এ কাজটি করেন। একজন কিংবা একই সাথে দু’জন মহিলা এ কাজটি করতে পারেন। বড় গৃহস্থ বাড়ি হলে ঢেঁকি থাকে। ঢেঁকিও ধান ভাঙ্গাবার কাজে ব্যবহৃত হয়। একজন কিংবা একই সাথে দু’জন মহিলা ঢেঁকি চালাতে পারেন। ধান বানানোর কাজ বেশ পরিশ্রমের। শরীর থেকে ঘাম ঝরে। ইহা উত্তম ব্যায়াম। ছিয়া ও ঢেঁকি ব্যবহারে শরীরের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সচল থাকে। দ্রুত রক্ত সঞ্চালন হয়। হৃদপিন্ড বেশি রক্ত পাম্প করে। তাতে রক্তনালী ব্লক হয় না। ব্লক হওয়ার উপক্রম হলে দ্রুত রক্ত সঞ্চালনে তা খসে পড়ে।
গ্রামের নববধূ মানে লাজুক লতা। কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। মাঠে কাজে যেতে স্বামীকে সহায়তা করেন। ঘর দোর ও বাড়ির আঙিনা ঝাড় দেন। কলস কাখে নিয়ে পুকুর হতে পানি আনেন। সময় গড়ার সাথে সাথে সাংসারিক কাজের পালা বদল হয়। কুঠার দিয়ে জ্বালানী কাঠ প্রস্তুত করেন। ধান, চাল, এটা সেটা হাত ও মাথা দিয়ে বহন করেন। রান্নার সময় এলো। চাউল চুলায় বসিয়ে ‘পাটা-পুতাইল’ দ্বারা শুকনো লাল মরিচ, হলুদ, ধনিয়া ইত্যাদি পিষে তরকারিতে দেন। সেই মশলাতে কোন ভেজাল নেই। হাতে পিষা মরিচের তরকারি বড় সুস্বাদু। তার ঘ্রাণ উত্তম। পুকুর ঘাটে এক রাশ কাপড় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মহিলারা ধৌত করেন। ইহা বেশ পরিশ্রমের কাজ। ভালো ব্যায়ামও বটে।
এ সব আজ কালের কথা নয়। পুরানো দিনের কথা। গ্রামে এ ধরণের কাজ কর্মের রেওয়াজ এখনো কিছুটা থাকলেও শহরে একেবারে নেই। গ্রামের নববধূরা বোধ হয় এখন আর লাজুক লতা নন। সমাজ পরিবর্তন হয়েছে। এ ধরণের কাজকর্ম যে মহিলারা করেন তাদের শরীরে বাড়তি ওজন থাকেন। কিংবা তারা স্থুলদেহী হন না। হলেও তাদের শরীর ফিট থাকে। রাতে বালিশে মাথা রাখার সাথে সাথে তাদের ঘুম পায়। বহুমূত্র, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ইত্যাদি তাদের কম হয়।
বর্তমান যুগে হাত দ্বারা ধান ভাঙতে হয় না। মেশিনের সাহায্যে মুহূর্তে অনেক ধান ভাঙ্গা যায়। কাপড় কাচার মেশিন রয়েছে। বিনা পরিশ্রমে কাপড় খাচা যায়। হুপার দিয়ে ঘরের মেঝে, বিছানাপত্র ইত্যাদি ঝাড় দেওয়া যায়। কলসি কাখে নিয়ে পানি আনতে হয় না। টেপ ছাড়লে গৃহে পানি বের হয়। এগুলো বিজ্ঞানের আশির্বাদ। আধুনিক যুগে কল কবজা ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে মহিলাদের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন সহজতর হয়েছে। তবে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় শরীর নামক যন্ত্রটি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শরীর সচল রাখার বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন। যতোটুকু পারা যায় মহিলাদেরকে গৃহস্থালীর কাজ কর্মে ঘাম ঝরানো জরুরি। হাঁটাচলা ও নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত। তাতে শরীর ফিট থাকবে। শরীর ফিট তো মন ঠিক। আর মন ঠিক থাকলে সবই ঠিক। মহিলারা একটু সচেতন হলে নিজেরাই গৃহস্থালির কাজকর্ম সম্পাদন করতে পারেন। কায়িক শ্রম বহুমূত্র উচ্চ রক্ত চাপ ও হৃদরোগ হতে রক্ষা করতে পারে।
বর্তমান যুগে বেশির ভাগ মহিলার প্রথম ইস্যুতে সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন পড়ে। মহিলারা শারীরিক পরিশ্রম হতে দূরে সরে যাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সিজারিয়ান অপারেশনে ভূমিষ্ট আর স্বাভাবিকভাবে ভূমিষ্ট বাচ্চার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপায়ে ভূমিষ্ট বাচ্চা অনেক চাপ সহ্য করে পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে। এতে তার শারীরিক অনেক উপকার হতে পারে যা হয়তো মানুষের অজানা। শ্রমজীবী মহিলাদের প্রসবকালে সিজারিয়ান অপারেশন প্রয়োজন কম পড়ে। সুতরাং মহিলাদেরকে শারীরিক পরিশ্রমের দিকে আগ্রহী হতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT