ইতিহাস ও ঐতিহ্য

যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৩-২০১৯ ইং ০০:১৯:৩৫ | সংবাদটি ২১৭ বার পঠিত

ইস্ট কোম্পানি ভারত নিজেদের হাতের মুঠোয় নেবার পর শাদা চামড়ার মানুষগুলো সমুদ্র পেরিয়ে ভিড় জমায় কলকাতায়। এদের সবাই-ই ছিলো ব্যবসায়ী, মুনাফা অর্জনের জন্যে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসে ওরা। এইসব ব্যবসায়ীর মতো অগস্টাস হিকি নামের একজন ব্যবসায়ী ছুটে এসেছিলেন কলকাতার পানে। কিন্তু বেচারার কপাল খারাপ, তার জাহাজটি ডুবে যায়। সবকিছু হারিয়ে ফেলা মানুষটা দেনার দায়ে জেল খাটেন। জেল থেকে বেরিয়ে হিকি সাব একটি ছাপার মেশিন কেনেন। তিনি মেশিন কেনার কিছু আগে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সরকারিভাবে ছাপার মেশিন বসানো হয়েছে। ছাপার মেশিন কিনে হিকির মাথায় চাপলো, একটি সংবাদপত্র বের করলে কি হয়। পাঠকের তো আর অভাব হবে না। শাদা চামড়ার মানুষজন আছেন। ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি হিকি প্রকাশ করেন ‘বেঙ্গল গেজেট’ বা ‘ক্যালকাটা জেনারেল এডভারটাইজার’। অনেকে একে বলতো ‘হিকির গেজেট’।
হিকি সাহেব পত্রিকা বের করে ধীরে ধীরে সেই সময়ের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বউয়ের সমালোচনা করতে লাগলেন। শাদা চামড়ার মানুষ হলেও হিকির স্বাধীনতা আর থাকলো না। পত্রিকা বের করার দু’বছরের মাথায় গভর্নর জেনারেলের স্ত্রী আর কয়েকজন উঁচু দরজার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় অপরাধী সাব্যস্থ করে হিকিকে জেল দেয়া হলো, জরিমানা করা হলো, পত্রিকাটাও বন্ধ করে দেয়া হলো।
সাদা চামড়ার মানুষের হাতে যেমন নির্যাতিত হয়েছেন সাদা চামড়ার মানুষ, তেমনি নেটিভদের হাতেও নির্যাতিত হয়েছেন নেটিভ সাংবাদিক। মুল কথা হচ্ছে স্বার্থে যখনই আঘাত পড়েছে, স্বার্থান্বেষী মহল ঝাপিয়ে পড়েছে সাংবাদিকের উপর। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার ইটা পাঁচগাঁর গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য (তর্কবাগীশ) সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, বাংলার সংবাদপত্র জগতের অন্যতম পথিকৃৎ। গৌরীশঙ্করের কর্মক্ষেত্র ছিলো কলকাতা। প্রথমে তিনি কলকাতায় ‘জ্ঞানান্বেষণ’ নামের পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। গৌরীশঙ্কর উদার মতাবলম্বী ছিলেন, গোড়াপন্থীরা তাকে পছন্দ করতো না। এজন্যে তাকে ও জ্ঞানান্বেষণকে কটাক্ষ করে সমসাময়িক ‘সম্বাদ তিমিরনাশক (প্রথম প্রকাশ ১৮২৩) সম্পাদক কৃষ্ণমোহন দাস এক প্রবন্ধে লেখেনÑ‘দক্ষিণানন্দন ঠাকুর...একজন মদ্যপায়িকে পন্ডিত জানিয়া চাকর রাখিয়াছেন। সে নাস্তিক হিন্দুদ্বেষী কাগজ আরম্ভাবধি কেবল ধার্মিকবর শ্রীযুক্ত চন্দ্রিকাকর মহাশয়কে কটু কহে আর হিন্দুশাস্ত্র ভাল নহে তাহারি দোষ আপন বুদ্ধিতে যাহা আইসে তাহাই লিখে। এজন্য ভদ্রলোক মাত্র কেহ ঐ কাগজ পাঠ করেন না। (সমাচার দর্পণ ২১ জানুয়ারি ১৮৩২)’
গৌরীশঙ্কর ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকাটি ছেড়ে দেন। নিজে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। একবার একজন বৈষ্ণবের সাথে ব্রাহ্মণ কন্যার বিয়েকে কেন্দ্র করে আন্দুলের রাজা দুই ব্রাহ্মণকে ধর্মসভা থেকে বের করে দেন। এনিয়ে রাজপরিবারের কর্মকান্ড বিষয়ে একটি চিঠি ভাস্কর অফিসে আসে। গৌরীশঙ্কর সেই চিঠিটি না ছেপে রাজার কাজের সমালোচনা করে একটি চিঠি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এতে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জানুয়ারি পটলডাঙ্গার চৌমাথা থেকে আন্দুলের রাজার পাঠানো ২০/২৫ জনের একটি গুন্ডাবাহিনি ভাস্কর পত্রিকার সম্পাদক শ্রীনাথ রায়কে অপহরণ করে এবং একটি ঘরে আটকে মারধর করে। এতে শ্রীনাথ রায়ের পায়ের হাড় ভেঙ্গে যায়। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে রাজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হয়। প্রথমে রাজা আত্মগোপন করলেও পরে তিনি কোর্টে আত্মসমর্পণ করেন। বিচারে রাজাকে অর্থদন্ড দিতে হয়। রাজার অত্যাচারের ফলেই ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে শ্রীনাথ রায়ের অকাল মৃত্যু হয়। এরপর থেকে পত্রিকার সব দায়িত্ব পড়ে গৌরীশঙ্করের উপর। ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন,‘১৮৪০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত শ্রীনাথ রায় ‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। অবশ্য পত্রিকার যাবতীয় সম্পাদনা গৌরীশঙ্করই করতেন। গৌরীশঙ্করের নির্ভীক লেখনীর দায়ভাগ হিসাবে শ্রীনাথ রায়কে নিদারুণ দৈহিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে ঘটনাটি অভিনব।’
‘এমনকি একটি ‘মানহানিকর’ লেখা প্রকাশের জন্য আদালত সম্বাদ ভাস্কর সম্পাদক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যকে জরিমানা ও কারাদন্ড প্রদান করে।’ পরে জমিদার জগন্নাথপ্রসাদ মল্লিক এবং তার কর্মচারী ঈশ^রচন্দ্র ঘোষাল জামিন হয়ে গৌরীশঙ্করকে যথাসময়ে কারাগার থেকে মুক্ত করেন।
গৌরীশঙ্কর ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ নভেম্বর সম্বাদ রসরাজ নামের পত্রিকাটি বের করেন। সম্বাদরসরাজ পত্রিকায় কাশিমবাজারের রাজা কৃষ্ণনাথের কুৎসা প্রকাশিত হওয়ায় তার বিরুদেধ রাজা মানহানির মোকদ্দমা করেন। এত গৌরীশঙ্করের বিনাশ্রমে ছয় মাসের জেল, পাঁচশত টাকা জরিমানা এবং এক হাজার টাকার দুজন জামিন দেয়ার আদেশ হয়। ‘১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্বাদরসরাজ পত্রে লালা ঈশ^রীপ্রসাদের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার করায় গৌরীশঙ্কর আবার ছয়মাস কারাবাস করেন। ‘একবার রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুরের বিরুদ্ধাচরণ করে পত্রিকায় এমন কিছু লেখা হয়, যা পরিবারকে আহত করে। এ ব্যাপারে মহারাণী সুপ্রিম কোর্টে মানহানির মামলা দায়েরের আবেদন করলে গৌরীশঙ্কর রসরাজ বন্ধ করে দেন। গৌরীশঙ্করের মৃত্যুর পর ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে তার ছেলে ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য আবার সম্বাদ রসরাজ প্রকাশ করেন। ক্ষেত্রমোহনও কাগজের চরিত্র বদলাননি। ফলে তাকে পাঁচশত টাকা জরিমানা ও ৩ মাসের কারাদন্ড ভোগ করতে হয়।
সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র পরিদর্শক’র সম্পাদক হচ্ছেন বাগ্মী বিপিন পাল। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইংরেজি ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকার সম্পাদক। সেই একটি প্রবন্ধ বের হয়। সরকার বললো প্রবন্ধটি রাজদ্রোহমুলক এবং এর লেখক অরবিন্দ। এ নিয়ে বিপিন পালের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তাকে আদালতে যেতে হয়। আদালত তাকে জিগ্যেস করেÑ‘অরবিন্দ ঐ প্রবন্ধটি লিখেছেন কি না?’ বিপিন পাল আদালতের এ প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন তিনি আদালতের অপমান করেছেনÑএই অজুহাতে আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয়।
মহেন্দ্রনাথ দে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৌলভীবাজার জেলার জগৎসী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার সম্পাদনায় হবিগঞ্জ থেকে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘মাসিক মৈত্রী’ এবং ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে সাপ্তাহিক ‘প্রজাশক্তি’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মৌলভীবাজারের অন্তঃপাতি জগৎসী গ্রামে ঠাকুর দয়ানন্দের একটি আশ্রম ছিল। গুপ্ত বিপ্লবী সন্দেহে সিলেটের ইংরেজ সুপারের পরিচালনায় ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুলাই পুলিশ এই আশ্রমে হানা দেয়। আশ্রমে অবস্থানকারী ভক্ত সাধুরা বুট জুতা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে ইংরেজ সৈন্যদের ত্রিশূল হাতে বাধা দেয়। ফলে পুলিশ সুপারের গুলিতে মহেন্দ্র নাথ আহত হন। দুদিন পর সিলেট হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
ফজলুল হক সেলবর্র্সী সিলেট বিভাগের প্রথম মুসলমান সাংবাদিক, একই সাথে তিনি সিলেটের সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি দেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে হিজরত করেছিলেন প্রিয় জন্মভূমি থেকে, আবার জাতির মুক্তির জন্যে নিজের জীবনের কথা না ভেবে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র, বার বার তার ঠিকানা হয়েছিলো ব্রিটিশের কারাগার। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি জোড়হাট জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা চলে যান কলকাতা। সেখানে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই পত্রিকায় সরকার বিরোধী সম্পাদকীয় লেখার দায়ে তার ছয় মাসের জেল এবং পাঁচশত টাকা জরিমানা করা হয়।
আবদুল মতিন চৌধুরী একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ। তিনি সিলেট থেকে নবনী কুমার গুপ্তের সম্পাদনায় ‘উইকলি সিলেট ক্রনিকল’ নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক বের হতো। আবদুল মতিন চৌধুরী সেই পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখলেন। সরকার সেই প্রবন্ধকে রাজদ্রোহমুলক প্রবন্ধ হিসেবে বিবেচনা করে। এজন্যে তাকে তার গ্রামের বাড়ি গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর থেকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদপত্রে রাজদ্রোহমুলক লেখার দায়ে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। এক বছর জেল খেটে তিনি ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট জেল থেকে ছাড়া পান। কারাগারে তিনি একজন সাধারণ কয়েদীর জীবন যাপন করেন।
প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী তার ABDUL MATIN CHAUDHURY:Trusted lieutenant of Mohammad Ali Jinnah গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবদুল মতিন চৌধুরীর এই কারাবাসের কথা বিভিন্ন ডকুমেন্টে পাওয়া গেলেও, যে প্রবন্ধের জন্যে তাকে জেল খাটতে হয়েছে, সেই প্রবন্ধটি পাওয়া যায়নি। গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়, সেই সময়টায় সিলেটের অনেক সাংবাদিককে আসাম সরকার বিভিন্ন ধরনের লঘু শাস্তি দিয়েছে। তবে লঘু হোক আর গুরু হোক শাস্তি তো শাস্তিই, নির্যাতন। আসামের জোড়হাট থেকে বের হওয়া ‘আসাম বিলাসীনী’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষন্ত ভট্টাচার্য্য ছিলেন সরকারি পেনশনভোগী। সরকার তাকে কোন ধরনের ‘আপত্তিকর’ রাজনীতিতে জড়াতে নিষেধ করে। এতে তিনি সম্মত না হওয়ায় ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে তার পেনশন ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। সরকার তাকে দু হাজাার রুপি নিরাপত্তা জামানত হিসেবে পরিশোধ করতে বলে, যা তিনি পরিশোধ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে টাকার অভাবে তিনি পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারেননি। সেই সময়ে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে সাপ্তাহিক জনশক্তি সম্পাদক সতীশ চন্দ্র দেবকে ৫০ রুপি জরিমানা করা হয় এবং একদিনের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। সাপ্তাহিক সুরমার সম্পাদক দুর্গা মোহন চক্রবর্তীকে ২৫০ রুপি এবং সুরমা পত্রিকার মুদ্রাকরকে ২৫ রুপি জরিমানা করা হয়।
‘মাইজভাগের ছিন্ন কোরআন’ ঘটনাটি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল ঘটেছিলো। সিলেটের জনশক্তি পত্রিকায় ছেড়া কোরআন শরীফের ছবিও ছাপা হয়। এইসব সংবাদ ও একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করায় সম্পাদক সতীশ চন্দ্র দেব ও মুদ্রাকর অনাথ বন্ধু দাস ১৫৩ (ক) ধারায় অভিযুক্ত হন। এ ঘটনায় মামলা হয়। সিলেট জেলা কোর্টে চার বছর মামলা চলে। সৈয়দ মুর্তাজা আলী লিখেছেন, ‘এই খবর প্রকাশের অপরাধে ‘জনশক্তি’ পত্রিকার সম্পাদক ও মুদ্রাকর রাজদ্রোহের অপরাধে দন্ডিত হন। এই মোকদ্দমার আপীল হয় জেলা জজ বি. এন. রাওয়ের আদালতে। জজ একদিন বিনা খবরে মগফুর মিয়ার বাড়িতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা অনুধাবনের চেষ্টা করেন। আপিলে বিবাদীরা খালাস হলে বি.এন. রাও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।’
মকবুল হোসেন চৌধুরী (১৮৯৮-১৯৫৭) আসাম-বাংলার কৃতী সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, ভাষাসৈনিক, সমাজসেবী। গ্রন্থাগার আন্দোলনের পথিকৃৎ মুহম্মদ নূরুল হক তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, ‘সম্পাদক হিসেবে তিনি (মকবুল হোসেন চৌধুরী) ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও নির্ভীক। যুগভেরীর সম্পাদক থাকাকালে এক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা গুন্ডা লেলিয়ে দেয়। কিন্তু তা সত্বেও তিনি নিজ মতবাদে অটল এবং অনড়।’
মুহম্মদ নূরুল হক ছিলেন সাহিত্য সাময়িকী আল ইসলাহ’র প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন সম্পাদক, সিলেটে গ্রন্থাগার আন্দোলনের পথিকৃৎ, ভাষাসৈনিক। তিনিও কম নির্যাতনের শিকার হননি। প্রফেসর নন্দলাল শর্মার রচনাসমগ্র-২-এ উল্লেখ করেছেন ‘পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ায় অখন্ড ভারতের সমর্থক কতিপয় মাওলানা ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত নূরুল হককে বিভিন্ন সময়ে ১১ বার কাফের বলে ফতোয়া দেন।’
সৈয়দ ইসলাহ উদ্দিন ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ. পাশ করার পর সাপ্তাহিক ‘ইস্টার্ন হেরাল্ড’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলি বর্ষণের পর ‘ইস্টার্ন হেরাল্ড’ পত্রিকায় তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে একটি উপ সম্পাদকীয় লেখেন। উপসম্পাদকীয়টি বের হবার পর কর্তৃপক্ষ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ ইসলাহ উদ্দিনকে চাকুরিচ্যুত করেন।
প্রজেশ কুমার রায় একজন বিখ্যাত কবি ও সাংবাদিক ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ শহরে একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন এবং ‘সাদেক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ‘সাদেক’ বন্ধ হয়ে গেলে সিলেট থেকে প্রকাশিত নয়া নিশানার কয়েকটি সংখ্যা সম্পাদনার পর চলে যান ঢাকা। ঢাকায় তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ এবং ভবেশ কুমার নন্দীর অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় ছয় বছরের মতো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী লিখেছেন,-‘১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিক। ঢাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কিছু আলামত দেখা দেয়। ত্রিশ এপ্রিলের বিকেলে প্রজেশ কুমার রায় গিয়েছিলেন নূরুর রহমান সাহেবের বাসায়। সন্ধ্যেয় ফিরে যেতে উদ্যত হলে ওরা তাকে বাধা দেন, শহরের অবস্থা ভালো না, এ সময় রাস্তায় না বেরিয়ে এখানেই থেকে যান। প্রজেশ রায় জানান, আমার দেশ-এ তার কিছু কাজ রয়ে গেছে। যেতে তাই হবেই। সে সঙ্গে হাসতে হাসতে যোগ করেছিলেন, তাছাড়া আমাকে মারবে কে?
কেউ তাকে মারতে পারে এ কথা বিশ্বাস না করলেও ওয়ারি থেকে মদন মোহন বসাক রোডে ফেরার পথে এক আততায়ী মানবতার উপর কবির আস্থা মিথ্যা প্রমাণিত করে। নির্বিরোধ নি:সঙ্গ মানুষটি ছুরিকাঘাতে নিহত হন।’
খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে কানাইঘাট মাদ্রাসার বার্ষিক জলসায় পুলিশের গুলি, একই সময়ে মাইজভাগের ছিন্ন কোরআনের ঘটনা, ভানুবিলের প্রজা আন্দোলন, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলন প্রতিটি আন্দোলনে জনশক্তি পত্রিকাটি জনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৩ বছর পত্রিকাটি বন্ধ ছিলো। ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে জনশক্তি পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ আরম্ভ হয়। পরবর্তীতে ইসকান্দার মির্জার শাসনের পর ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ূব খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে জনশক্তি পত্রিকার উপর সেন্সরশিপ আরোপিত হয়। নীরেন্দ্রনাথ দেব সেন্সরকৃত পত্রিকা সম্পাদনা করতে অস্বীকৃতি জানালে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে পত্রিকাখানি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। নিকুঞ্জ গোস্বামী উল্লেখ করেন, ‘১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ বাঁধে। ৮ সেপ্টেম্বর রাত্রিতেই আমাদের চালিবন্দর ছাত্রাবাস ঘেরাও করে আমাকে বন্দী করা হয়।---আমার গ্র্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গেই জনশক্তি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় এবং এই পরিস্থিতিতে কারামুক্ত হয়েও পত্রিকার পুনঃপ্রকাশে অসমর্থ হই। ১৯৬৮ ইং পর্যন্তই ছাত্রাবাসে বাস করে অন্তরীণাবদ্ধভাবেই কাটাই।’
মুক্তিযুদ্ধশেষে দেশে ফিরে নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী আবার গীতা প্রেস ও জনশক্তি পত্রিকা চালু করেন। কিন্তু পত্রিকাটি খুব বেশীদিন টেকেনি। শ্রী নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের এক কালো আদেশে অন্যান্য পত্র-পত্রিকার সঙ্গে জনশক্তি পত্রিকার প্রকাশনও বন্ধ হয়ে যায়। তাতে পত্রিকার মাধ্যমে সদনের মেয়েদের কর্মশিক্ষা ও আর্থিক যে সুবিধা ছিল তা নষ্ট হয়ে যায় এবং সদনটি (চালিবন্দর ছাত্রাবাসে অসহায় নারীদের জন্যে স্থাপিত ‘শ্রীকৃষ্ণ সেবাসদন’) আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। প্রেস পত্রিকার মাধ্যমে মাসিক প্রায় হাজার টাকা এই সদনের কাজে পাওয়া যেতো।’
সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরী ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বের হয়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মকবুল হোসেইন চৌধুরীর পর বিভিন্নজন যুগভেরীর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে আমিনূর রশীদ চৌধুরী যুগভেরী সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT