উপ সম্পাদকীয়

ভোগবাদী বিশ্বায়ন বনাম লোকসংস্কৃতি

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১১:২৫ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

সংকটাপন্ন শুধু লোকসংস্কৃতি নয়, আজকের সংকট সর্বগ্রাসী। প্রতিটি মুহূর্তেই আজ সংকট কুসংস্কারের সংকট, আত্মপরায়ণ মানুষের অসামাজিকতার সংকট, কুশ্রীতার বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের সংকট। এর বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরতে হবে। আমি মনে করি লোকসংস্কৃতি সেই ক্ষুরধার অস্ত্র যা ধুলো থেকে তুলে নিতে হবে।
এ-দেশে লোকসংস্কৃতি আজও যাদুঘরের সামগ্রী হয়নি। শুধুমাত্র বিদ্যাচর্চার বিষয়ও নয় লোকসংস্কৃতি। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে আজও এর অচ্ছেদ্য ও অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। গান যেমন একলা গায়কের নয়, যে শোনে তারও, তেমনি লোকসংস্কৃতিও একক-আয়ত্ত নয়, যূথবদ্ধ মানুষের মনের মুকূর। এতে প্রতিফলিত হয় গোটা সমাজ-জীবন যা এগিয়ে চলে লোকসাধারণের উত্তরোত্তর সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ওপর।
প্রসঙ্গত বলে নিই, লোকসংস্কৃতির আলোচনা এক সময় শুধু লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, লোকউৎসব ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ আমরা তার থেকে বেরিয়ে এসেছি। লোকসংস্কৃতির বিষয় নির্বাচনে এখন বিজ্ঞান-মনস্কতার পরিচয় দিচ্ছি আমরা। রাজনৈতিক সীমা ও কূটনৈতিক স্তর অতিক্রম করতে পেরেছে বলেই এ অঞ্চলে লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান আজ আর শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। এতদঞ্চলের লোকসংস্কৃতি শুধু হিন্দু অথবা শুধু মুসলমানের নয়, Identity-র অন্বেষণ করতে গিয়ে এখানে পেয়েছি নির্মাণের ক্রিয়াশীলতা, যাতে মিশ্রিত হয়েছে নানা ভাষা, নানা মত। বিশ্বের নানা স্থানে নানা সময়ে যে ফোকলোর কংগ্রেস হয়, বরাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতিকে সেখানে উপস্থাপিত করার দায়িত্ব নিতে হবে লোকসংস্কৃতি মঞ্চকেই। মনে রাখতে হবে, লোকসংস্কৃতির কোনো উপাদান-উপকরণ স্থিতিস্থাপক বা স্থান নয়, জঙ্গমতাই তার ধর্ম। লোকসংস্কৃতির যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা শুধু স্বপ্ন দেখেন না, স্বপ্নকে সঙ্গী করে সফর করেন নানা স্থানে, নানান সময়ে তাই লোকর্কিথবিদদের কাছে সকাল-দুপুর-সন্ধে বলে কিছু নেই, অনন্তকালই হল তার সময়। লোকজীবন-চারী যাঁরা তাঁদের কাছে শুধু সমতল ভূমি নয়, বারবার ঘুরে-ফিরে আসে দূরের পাহাড়, নদীর দু’পার।
বর্তমানে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় বিশ্বায়ন। একে কেবল উদার অর্থনীতি বা কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা সমীচীন নয়। বিশ্বায়ন লোকসংস্কৃতিকেও আজ স্পর্শ করেছে। এতে আমরা আদৌ তৃপ্ত নই। লোকসংস্কৃতির উপর বাজার অর্থনীতি বা বিশ্বায়ন যদি প্রভাব ফেলে তাহলে লোকসংস্কৃতি তার যোগ্য সম্মান হারায়। হ্যাঁ, বিশ্বায়ন-উদারীকরণ তথ্যপ্রযুক্তি বস্তুজীবনের ভালো-মন্দকে অতিক্রম করলেও সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-সভ্যতার মৌল উপাদানগুলোকে শুধু প্রভাবিত করেনি, আঘাতে আঘাতে দুমড়ে-মুচড়ে তার রূপা বিকৃতি ঘটিয়েছে। আসলে, বিশ্বায়নের মূল কথাই হল ভোগবাদী জীবনচর্চা। তাই সেখানে প্রেম-প্রীতি, ছবি-আলপনা, মান-হুঁশ নয়, ইনফোটেক, ফেসবুক, সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার মুখ্য, মহামানবিকতার নির্মল আকাশকে সে গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে আছে। এই ভোগবাদী বিশ্বায়নের সঙ্গে তাই লোকসংস্কৃতির অহি-নকুল সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বায়ন এবং লোকসংস্কৃতিতে ভোগ আছে কিন্তু লোকসংস্কৃতির অবস্থান ভোগবাদী জীবন থেকে হাজার যোজন দূরে। বিশ্বায়ন যন্ত্রশক্তিকে হাতিয়ার করতে পারে, প্রযুক্তিকে আরও বলবান করে তুলতে পারে, কিন্তু একটুখানি ঘাসের মধ্যে যে প্রাণশক্তি রয়েছে তাকে কোনোদিনই আপন করে নিতে পারবে না। বিশ্বায়ন Hollow man বানাচ্ছে, পরিপূর্ণ মানুষ বানাতে পারছে না। তাই আমরা বিশ্বায়নের বিপ্রতীপে লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলোকে বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই।
গ্লোবালাইজেশন ব্যক্তিমালিকানাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রকৃতিতে চরে বেড়ানো জীবনানন্দের স্বাধীন ঘোড়াগুলো যেমন আজ মহিনের ঘোড়া হয়েছে ঠিক তেমনি গ্লোবালাইজেশন যূথবদ্ধ জীবন-চর্যার আনন্দ থেকে মানুষকে দূরে, আরও অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে। তাই গোটা বিশ্বে এখন ‘আমরা’ নয়, ‘আমি’র ছড়াছড়ি। এই আমি -কে তো কোথাও বড় আমি হতে দেখছি না, সর্বত্র-প্রায় ছোট আমির ছড়াছড়ি। এই সমস্যা থেকে লোকসংস্কৃতির অবস্থান অনেক দূরে। বিশ্বায়ন আমাদের লোক ভাষাকে প্রভাবিত করছে দিনের পর দিন। পশ্চিম থেকে নানা তাত্ত্বিক শব্দ আমদানি হওয়ার ফলে আমাদের মাটির গন্ধভরা কথ্যভাষা ক্রমশ বিকৃত হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। এ পরিবর্তন বৈপ্লবিক হলে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু এই ভাষিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে বিপ্লব বা সংগ্রাম ছাড়াই।
লোকসংস্কৃতি উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রসার ঘটায়। বিশ্বায়ন এই প্রসারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে তালিবানি মৌলবাদের বর্বরতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যখন লোক জীবনে মনন ও সৃষ্টি টালমাটাল হয়ে উঠবে। সেটা এখনই আমরা প্রত্যক্ষ করছি। বিশ্বায়নে আমাদের আপত্তি ছিল না, যদি না তার দাপট সর্বগ্রাসী হয়ে উঠত। এই বিশ্বায়ন আর কিছুই নয়, কলোনিয়ালিজম উপনিবেশবাদ। ঔপনিবেশিক শক্তি এসেছে নতুন আঙ্গিকে। তাই এর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ আমাদের গড়ে তুলতে হবে, আর সেটা শুরু করতে হবে লোকসংস্কৃতির পরিকাঠামোয় চর্চা-চেষ্টার মধ্যে দিয়ে।
ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখব, তুর্কি আক্রমণে একদিকে যেমন পৌরাণিক ও অপৌরাণিক সংস্কৃতির সংঘাত-দূরত্ব কমে আসছিল, তেমনি অন্যদিকে দুই ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্বও প্রবল হচ্ছিল। ইংরেজ বিজয়ের পরও বাংলা তথা ভারতে এই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে আমরা শুধু পেলাম চূড়ান্ত স্বার্থপরতা। এর থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটা সম্ভব লোকসংস্কৃতির কবচ-কুন্ডল ধারণের মধ্য দিয়ে। লোকসংস্কৃতির চর্চাই আমাদের নিয়ে যাবে আত্মসর্বস্ব ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ থেকে অনেক দূরে। আমাদের অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে সেই যূথবদ্ধ জীবনকে যেখানে আমরা অবশ্যই তৈরি করব না রাজনৈতিক শ্রেণিস্বার্থ, মগ্ন রাখব না কনজিউমারিজম বা ক্যারিয়ারিজামের স্বপ্নে। আসুন আমরা তৈরি করি লোকায়ত কারুশিল্পের কিপণ কেন্দ্র যেটা জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। এভাবেই হবে অ্যাপ্লয়েড ফোকলোরের বিশ্ব বলতে পারব, দূর হটো বিশ্বায়ন।
তবে এর জন্যে সবার আগে দরকার স্বদেশবোধ বা আপন মাটির প্রতি অন্তরের টান, শ্রমবিমুখ না-হওয়ার মানসিকতা, মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ এবং ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। অবশ্যই আমরা মদত দেব না সেই স্বদেশবোধকে যা আয়কেই শুধু বাড়িয়ে দেবে। হ্যাঁ, বিশ্বায়নের সপক্ষে বৈদ্যুতিক মাধ্যমগুলোর প্রচার এখন তুঙ্গে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রচার চলছে ভোগ্যপণ্যকে ঘিরে। এই ফাঁদে পা দিয়ে আমরা এখন আর পারব না সমাজতন্ত্রেও বাঁধ বেঁধে বিশ্বায়ন বা বাজারি অর্থনীতির ¯্রােত ঠেকাতে। এক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা অ্যাপ্লায়েড ফোকালোর।
আমেরিকাকে আমরা বলি সিলিকন ভ্যালি। এই ভ্যালির চূড়ান্ত বিকাশের মূলে রয়েছে এশিয়ানরা। হ্যাঁ, সেই এশিয়া যা ইউরোপের মানদন্ডে বা বিচারের মাপকাঠিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে। অথবা আমাদের ভোগ-পিপাসা অনন্ত এই পিপাসাকে যত জিইয়ে রাখা যায় বিশ্বায়নের দ্বারা ভ্রষ্টাচার ততই বাড়বে, নৈতিক সংযম চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। প্রশ্নহীন এই ভাঙনের অনিবার্যতায় এগিয়ে আসতে হবে লোকচর্যায় অভ্যস্ত যূথবদ্ধ মানুষকে। আমরা যদি বিশ্বায়নকে ভাঙনের অনিবার্য পরিণাম বলি তাহলে প্রতিরোধ তো আমরাই গড়ে তুলব। অবশ্যই আমরা বিশ্বায়নের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করব না। কারণ বিশ্বায়ন আমাদের কাছে বিদেশি শত্রু। তাকে তো যে-কোনো মূল্যেই তাড়াতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার
  • বৈশাখের বিচিত্র রূপ
  • বিচার নয় অভিশাপ
  • আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব
  • সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব
  • ঐতিহ্যময় উৎসব পহেলা বৈশাখ
  • Developed by: Sparkle IT