উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

রঞ্জিত কুমার দে প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১১:৫৯ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

মানবসৃষ্ট নয় এমন দুর্ঘটনা যা মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তা-ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা বেশি। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ঝড়, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচলে পড়ে অসহায় মানুষ। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমূহকে প্রধান তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এগুলো হলো ১. বায়ুমন্ডলে সংঘটিত দুর্যোগ-এর মধ্যে পড়ে কালবৈশাখী, ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, হ্যারিকেন, টর্নোডো, খরা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি। ২. ভূপৃষ্টে সৃষ্ট দুর্যোগ যেমন বন্যা, ভূমিধস, নদীভাঙন, ভূ-অভ্যন্তরে পানি দূষণ প্রভৃতি। ৩. ভূ-গর্ভস্থ দুর্যোগ-ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে প্রধান হরো ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হাজার বছর ধরে আমাদের এ জনপদকে বিধ্বস্ত করে আসছে। ১৯৭০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বহুবার এ মহাদুর্যোগ আঘাত হেনেছে এ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে তার নাম সিডর। সিডর অর্থ চোখ। ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর তারিখে ২২০ থেকে ২৮০ কিলোমিটার গতির এ ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে আঘাত হানে। গত ১৫০ বছরের ইতিহাসে এটি ছিল সর্বোচ্চ গতির ঘূর্ণিঝড়। এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে ২০-২৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড় দেশের ২৩টি জেলার উপর আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণাঞ্চলের ১২টি জেলা। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও উদ্ধার অভিযান সত্ত্বেও এ ঝড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে ও নিখোঁজ হয়েছে। প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ক্ষেতের শস্য, গবাদি পশু এবং যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।
বন্যার মতোই খরা বা অনাবৃষ্টিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের কৃষি ব্যবস্থা এখনও প্রকৃতি নির্ভর। কিন্তু প্রতি বছরই দেখা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টির অভাবে কৃষি ফসলের ক্ষতি সাধিত হয়। প্রচন্ড খরায় মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়; ফলে এ খরার প্রকোপে ফসলাদি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অনাবৃষ্টি জনিত কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তাছাড়া অতিরিক্ত তাপদাহে মানবজীবনে নেমে আসে নানা রোগ-বালাই। বাংলাদেশকে নদী মাতৃক দেশ বলা হয়। নদীর ধর্মই হচ্ছে এপার ভেঙ্গে ওপার গড়া। এ নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছরই বাংলাদেশের প্রচুর সম্পদ ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষত নদী ভাঙনের কবলে পতিত হয়ে এদেশের গ্রামীণ মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি সাজানো সংসার হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপনে বাধ্য হয়।
সবধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগই মানবজীবনে নিয়ে আসে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরেক ভয়াল রূপ হচ্ছে ভূমিকম্প। এ পর্যন্ত যদিও বাংলাদেশে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানেনি তারপরও কিছু ছোটখাট বা মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি শহরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষত মাঝারি কিংবা বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প যদি আমাদের রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে সেক্ষেত্রে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা শহর এ ধরনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে নি¤œরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
১. দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকা এবং এ জন্যে বিশেষ ধরনের কর্মীবাহিনী সৃষ্টি করা; যারা সাধারণ জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত করে তুলবে।
২. জাতীয় ভিত্তিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় নীতিমালা, পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করা।
৩. জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা।
৪. পরীক্ষিত পদ্ধতির ভিত্তিতে যথাসময়ে সতর্কতা সৃষ্টির ব্যবস্থা করা।
৫. দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি ও চাহিদা নিরূপনের সরকারি ব্যবস্থা করা।
৬. তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা উন্নত করা।
৭. সামরিক বাহিনীকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাজের সঙ্গে সমন্বিত করে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় সহায়তা করা।
৮. থানা জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটির মাধ্যমে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা।
৯. দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীবাহিনীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
১০. সর্বোপরি দুর্যোগের সম্ভাবনা ও সেগুলোর মোকাবিলা করার পদ্ধতি সম্বন্ধে গণমাধ্যমের সহায়তায় ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
এক সময় মানুষের ধারণা ছিল প্রকৃতির ওপর যে কোনো উপায়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে জরুরি। আজ সে ধারনার পরিবর্তন ঘটেছে। বন ধ্বংস করে, নদীর প্রবাহ বন্ধ করে, পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে মানুষ নিজের জন্য সমূহ বিপদ ডেকে এনেছে। তাই আজ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য নয়, মানুষ গড়ে তুলতে চাইছে প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীর সম্বন্ধ। আর চেষ্টা করছে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে প্রকৃতির সহায়তায় তার নিজের জীবনধারাকে আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT