শিশু মেলা

হলদে পাখি ও লাল পিঁপড়া

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১২:৩১ | সংবাদটি ২৭৮ বার পঠিত

বসন্তের শুরু। হলদে পাখিগুলো আনন্দে মাতোয়ারা। তামাস হলদে পাখিদের মিলন মেলা দেখতে অপূর্ব। তবে ওদের একটা দুর্বল জায়গা আছে। দু’ঠ্যাং এর মাঝখানে খানিকটা জায়গা কালো। আজ এই উৎসবের দিনে সেই কুৎসিত অংশটা তো আর প্রদর্শন করা যায় না। তাই সবাই একটা করে হলুদ ন্যাপী পরেছে। আর মাথায় দিয়েছে হলুদ-লাল টোপর। কপালে একটা টকটকে লাল। টপও দিয়েছে। ব্যস। মিলন মেলাটায় আর কোন খুঁত নেই। নিখুঁত ভঙ্গিতে মিলল সব হলদে পাখি। ছেলে, বুড়ো, নাতি-নাতনি, যুবক-যুবতী সব বয়সী হলদে পাখি আপন আপন মহিমায় উদ্ভাসিত। কাউকেই আর অসুন্দর লাগছে না। সবাই অপূর্ব-অসাধারণ.......।
মিলন মেলার পাশেই ছিল একটা আমগাছ। ডালপালা খুব একটা নেই। অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে যে ক’টা ডাল ছিল- বেশির ভাগই ভেঙ্গে পড়েছে। দু’একটা আধভাঙ্গা ডালে রয়েছে পাতার ঝোপ। সেই ঝোপে একটা বাসা বেঁধে থাকতো লাল পিঁপড়ারা। কি জানি কখন এ আধমরা গাছটি লোকেরা কেটে ফেলে এই ভয়ে তটস্থ ছিল ওরা। পিঁপড়াদের প্রধান সভা ডেকে বলল ‘হে পিপিলিকার দল বৃষ্টি পড়ার আগেই আমরা যার যার আশ্রয় খোঁজা দরকার।’ সবাই সমস্বরে বলল-জ্বী হুজুর। -তবে আমরা চিন্তা করে কোন কূল কিনারা পাচ্ছি না। হুজুর মা-বাপ, আপনিই বলে দেন আমরা কি করব? কি উপায়ে আমরা আমাদের নিরাপদে রাখতে পারি।
পিঁপড়াদের প্রধান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল-‘এক কাজ কর-আমাদের পাশের মাঠে হলদে পাখির মেলা বসবে- এটাতো সবাই জানো?
-জ্বী হুজুর।
-তাহলে এখানেই একটা সুযোগ আছে।
একটা বিজ্ঞ পিঁপড়া দাঁড়িয়ে বলল-‘একটু খোলাসা করে বলুন হুজুর। আমরা যাতে সে সুযোগটি নিতে পারি।
-উম্। শোন-আসন্ন হলদে পাখির মেলায় হাজার হাজার পাখি সমবেত হবে। বড় পাখি, ছোট পাখি, মাঝারি পাখি ইত্যাদি। আমরা যদি পছন্দমত এক একটা পাখির পালকের মাঝখানে ঢুকে যেতে পারি- তাহলে...... একটু থামল পিঁপড়া প্রধান। অধৈর্য্য হয়ে অন্যান্য বিজ্ঞ পিঁপড়ারা সমস্বরে বলল- তাহলে কী হুজুর তাড়াতাড়ি বলুন। আমরা যে উদগ্রীব হয়ে আছি।
-উম্। এত উতলা হয়ো না বাছারা। শোন- তাহলে আমরা আমাদের জীবন রক্ষা করতে পারি।
-কীভাবে হুজুর।
পিঁপড়া প্রধান বিরক্ত হয়ে বলল- এই কারণেই তো বলি- ছোট মাথা পিঁপড়া। তোমাদের মাথায় কিছুই নেই- শুধু পানি ছাড়া।
-ক্ষমা করবেন হুজুর’- বিজ্ঞ এক পিঁপড়া উঠে বলল। আমাদের বদনাম করবেন না। আমরাতো আপনারই জাতের....।
ধমক দিয়ে পিঁপড়া প্রধান বলল- ‘আরে রাখো তোমার যুক্তি। প্রয়োজনে একটা বুদ্ধি বের করতে পারো না। অসভ্য কোথাকার। অন্য একটি বিজ্ঞ পিঁপড়া বলল- হুজুর এখন আসল কথাটি বলুন।
-শোন। মেলা শেষে হলদে পাখির দল যার যার বনে চলে যাবে। আর আমরা সে সকল জায়গায় গিয়েই বসবাস শুরু করব। ব্যস। আমরা বেঁচে গেলাম। তবে দুঃখ একটাই থাকবে যে আমরা আর একসাথে থাকতে পারব না। তবে সেটা আর ভেবে লাভ নেই। এখন জান বাঁচানোই বড় কর্তব্য।
পিঁপড়া প্রধানের বক্তব্য শেষ হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবাই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। সত্যিই চমৎকার বুদ্ধি।
সেদিন বিকেলে হলদে পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে মিলন মেলায় হাজির হলো। অজ¯্র অগণিত হলদে পাখির সমাহার নয়নকাড়া। যারা মাঠের পরে মাঠ সরষে ফুলের সমারোহ দেখেছে-কেবল তারাই আন্দাজ করতে পারবে, এই মেলা কত্ত নয়নাভিরাম; কত সৌন্দর্যমন্ডিত। মেলায় সুখী দম্পতিরা এসেছে। আনন্দে গদগদ এরা। এ সুখ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে হয়। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই উপস্থিত। হেসে খেলে আনন্দ প্রকাশ করছে। নাচ, গান, হৈ হুল্লোড় সবই চলছে। সৌন্দর্য প্রদর্শনিরও কমতি নেই। কে কার থেকে বেশি সুন্দর তারও একটা হিসাব নিকাশ চলছে মনে মনে। ছন্দের তালে তালে নাচছে সবাই। ঠিক সেই ফাঁকে জোড়ায় জোড়ায় পিঁপড়া প্রতিটি সুখী দম্পতির পালকের ভিতরে ঢুকে গেল। পুরুষ পিঁপড়া লুকালো স্ত্রী হলদে পাখির গায়ে আর নারী পিঁপড়া লুকালো পুরুষটির গায়ে।
নেচে গেয়ে আনন্দ ফূর্তি করে হলদে পাখিরা যার যার বনে ফিরে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেল অনেক সুখ স্মৃতি। ফের মিলন মেলা কবে হবে সেরকম একটা হিসাবনিকাশও মনে মনে কষে নিদ্রায় গেল ওরা।
কিন্তু গভীর রাতে হলদে পাখিরা হার্টের কাছে পিনছিং অনুভব করল। কী যেন একটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। প্রতিটি হলদে পাখির অন্তর জ্বালা শুরু হলো। একী হলো। এতদিনের সুখের সংসারে কোন অসুখ ছিল না। আজ কেন অশান্তি বিরাজ করছে। কী যেন একটা দুর্বোধ্য অশান্তি কাজ করছে মনে। জ্বালাটি এতই প্রবল যে-কেউ কাউকে শেয়ার করতে পারছে না। প্রতিটি সুখী দম্পতির সংসারে উল্টো পাঁচ অবস্থা। কেউ জানলো না লাল পিঁপড়াদের অবস্থানের কথা। ওরা যে লুকিয়ে লুকিয়ে খাদ্যের খোঁজে হলদে পাখিদের হার্টের কাছে প্রবেশ করেছে-জানতে পারলো না ওরা। ওরা জানতে পারল না কী রোগ দেহে বহন করছে ......।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT