উপ সম্পাদকীয়

শিশুশিক্ষায় শাস্তি পরিহার বাঞ্ছনীয়

লায়ন মো. শামীম সিকদার প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৩-২০১৯ ইং ০১:১৩:৪৯ | সংবাদটি ৫৪ বার পঠিত

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পড়া আদায় কিংবা নানা কারণে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি প্রদানের সংবাদ আজকাল বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখা য়ায়, যা মোটেও কাম্য নয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার শাস্তি প্রদান করা যাবে না মর্মে আমাদের দেশে আইন বিদ্যমান আছে। তারপরও কি শ্রেণিকক্ষে শাস্তি বন্ধ হয়েছে? উত্তর হলো হয়নি। বর্তমান যুগেও শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক নেতিবাচক বিষয়য়ের মতো ভয়ভীতি ও শাস্তির বিষয়টি সামনে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষার গ-ি পার করেছেন অথচ শিক্ষকের শাস্তি কপালে জোটেনি এমন অভিজ্ঞতা কদাচিৎ দেখা যাবে।
এমনকি আজকে যিনি নিজে শিক্ষক ও পেশাজীবী কিংবা নীতি নির্ধারক কমবেশি সবাই শাস্তির স্বাদ পেয়েছিলেন, সেটা শারীরিক বা মানসিক; লঘু কিংবা গুরু দ-ই হোক।
সেই প্রাচীন পাঠশালা থেকে আজকের আধুনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কিন্ডারগার্টেন সর্বত্র শাস্তি ও ভয়ভীতির বিধান অলিখিতভাবে আজও বিদ্যামান। তবে অবস্থাভেদে এর ধরন ও প্রকৃতি অনেকটাই পাল্টেছে।
এখনো আমাদের কোমলমতি শিশুরা ভয়ভীতি ও শাস্তি পাচ্ছে, সেটা যতটা না শারীরিক তার থেকে বেশি মানসিক। অবশ্য এর মধ্যে দেশের কতিপয় বিদ্যালয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম এবং ভালো অবস্থা বিরাজ করছে তা বলতেই হবে।
যুগে যুগে শিশুর শিক্ষা ও শাস্তি নিয়ে অনেক রকম ধারণা সমাজে প্রচলিত ছিল। যারা শাস্তি পেয়ে পেয়ে টিকবে তারাই শিক্ষা লাভ করবে, বাকিরা আজীবনের জন্য লেখাপড়া থেকে ঝরে যাবে অনেকটা এরকম ধারণাই ছিল অতীতে।
শিশুর মধ্যে শয়তানের প্রভাব রয়েছে তাই তাকে শাস্তি দিয়ে পরিশুদ্ধ করা শিক্ষকদের কাজ, এরকম ধারণাও এক সময় প্রচলিত ছিল। শিশু হলো খালি কলসির মতো, তাকে শাসন করে, শাস্তি দিয়ে তার জীবনকে ভালো শিক্ষায় পূর্ণ করতে হবে- এমন প্রচলন দেখা যায় নিকট অতীতে।
এসব ধারণা বর্জন করে আধুনিককালে শিশুদের দেখা হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনাময় মানবসত্তা হিসেবে। শিশুর শিক্ষার জন্য প্রয়োজন সহায়ক পরিবেশ, আদর-ভালোবাসা ও খেলার মাধ্যমেই শেখার উপযোগী আনন্দময় বিদ্যালয়, যেখানে শিশু ভয়ভীতিমুক্ত আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ পাবে।
যেখানে শাস্তির কোনো স্থান থাকবে না। একথা মনে রাখা জরুরি, সঠিক পদ্ধতি ও কৌশল সম্পর্কে অদক্ষ ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারণা সম্পর্কে যারা অসচেতন তারাই প্রাথমিক শিক্ষায় শাস্তি প্রয়োগ করেন। যারা আধুনিক পদ্ধতি ব্যতিরেকে গতানুগতিক ধারায় কোনো রকম দায়িত্ব পালন করেন না তারাই শিশুর বিকাশের দর্শন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রাখেন।
শিশুদের সম্পর্কে কম জানা ও প্রয়োজনীয় প্রেষণার অভাবে শিক্ষকরা শাস্তি প্রয়োগ করেন, যা কোনোভাবে কাম্য নয়। এছাড়া, প্রচলিত ও পুরনো ধারণা, অঙ্গীকার ও জ্ঞানের অভাবে অনেকে শাস্তির আশ্রয় নেন। শিক্ষা হলো পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে একটি আনন্দময় পদ্ধতিতে তা অনুশীলন করে থাকে। এখানে শিশুরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাবে। আর এ জন্য ভীতিমুক্ত, আদর-ভালোবাসা ও খেলার মাধ্যমেই শিশুর আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টিতে সঠিক সহায়তা করা অনস্বীকার্য।
আজকের বিশ্বে সবাই একমত যে, দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়নে শিক্ষায় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। শিক্ষাই দেশের সার্বিক উন্নয়নের ভিত মজবুত করে। আর এক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা সর্বাপেক্ষা বেশি সে কথাও আজ ঢালাও করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
অথচ এ গুরুত্বপূর্ণ স্তরের শিক্ষায় জেঁকে বসে আছে শাস্তি। গ্রাম-শহর সর্বত্র শ্রেণিকক্ষে নানা রকম শাস্তির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ শাস্তির প্রয়োগ আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে শিশুর প্রতি যে কোনো ধরনের শাস্তি পরিহার করা, শিশুর সমান অধিকার, অংশগ্রহণ, মতামত প্রদান, খেলাধুলা ও আনন্দময় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে সেই ১৯৯০ সালে।
আশার কথা, দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সরকার শ্রেণিকক্ষে যে কোনো ধরনের শাস্তির প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমাজে শিশু শিক্ষায় শাস্তি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এখনো দৃশ্যমান।
সাধারণত নির্দিষ্ট কাজ বা পড়া না পারা, কথা না বোঝা, কথা না শোনা বা অমান্য করা, বেয়াদবি করা, ইচ্ছেমতো হইচই করা, বেশি খেলাধুলা করা, প্রাইভেট না পড়া, বিশেষ কোনো কথা বা প্রস্তাব না শোনা ইত্যাদি কারণে শাস্তি পেতে দেখা যায় শিশুদের। শাস্তির ধরন হিসেবে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, নাকে খত দেওয়া, চর মারা, দাঁড় করিয়ে রাখা, বেত্রাঘাত করা, গালি দেওয়া, হাতের আঙ্গুলের মধ্যে পেন্সিল বা কলম ঢুকানো, পেন্সিল দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করা, ধমক দেওয়া, রেগে কথা বলা, চোখ রাঙানো, অপমানসূচক কথা বলা এমনকি ছেলে শিশুকে দিয়ে মেয়ে শিশুকে এবং মেয়ে শিশুকে দিয়ে ছেলে শিশুকে শাস্তি বা অপমান করা ইত্যাদি দেখা যায়। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে শিশুর খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকার (ধারা-৩১) প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন দেশ ও শিশু সংস্থা শিশুর খেলাধুলা ও বিনোদন পাওয়ার অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা শিশুর ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ, খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকারের প্রতি জোর দিয়ে সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি কর্মসূচি ও সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে।
বর্তমানে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় খেলার মাধ্যমে শেখা ধারণাটি বিভিন্ন গবেষণার দ্বারা জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিজ্ঞানী লেভ ভাইগোস্কি খেলাকে শিশুর সামাজিক, আবেগিক শারীরিক ও ভাষাভিত্তিক বিকাশের প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী ডেভিড এলকিন্ড বলেছেন, খেলা শুধু সৃজনশীল শক্তি না, এটা শেখার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
শিশুরা যখন খেলা করে, তখন তারা বিভিন্ন বিষয় আবিষ্কার, অনুসন্ধান, নতুন চিন্তার উন্নয়ন ও তাদের শিক্ষার বিভিন্ন দিক প্রসারিত করার সুযোগ পায়।
শিশুরা খেলার মাধ্যমে, পারস্পরিক মতবিনিময়, পরিকল্পনা করা, সমস্যা সমাধান, নতুন কিছু সৃষ্টি করা ও বাস্তব জীবনের অনেক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়। বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফ্রেজার মাস্টার্ডের মতে, খেলা শিশুর জ্ঞান বৃদ্ধি করে, কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে, সৃজনশীল চিন্তাকে প্রসারিত করে, সমস্যা সমাধান, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরিতে সহায়তা করে।
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভয়ভীতি বা শাস্তি তা যেভাবেই হোক না কেন- তা শিশুর ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবই ফেলে থাকে। ধরা যাক, একজন শিশু পড়া পারল না। শিক্ষক বা অভিভাবক শাস্তি হিসেবে তাকে ৫ মিনিট শ্রেণিকক্ষে বা বাইরে নীরবে দাঁড় করিয়ে রাখলো। এক্ষেত্রে দেখা যায়, তার ওপর শাস্তির প্রভাবটা যতটা না শারীরিক তার থেকে অনেকগুণ বেশি মানসিক, যা শিশুর ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
লেখক : কলেজ শিক্ষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার
  • বৈশাখের বিচিত্র রূপ
  • বিচার নয় অভিশাপ
  • আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব
  • সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব
  • ঐতিহ্যময় উৎসব পহেলা বৈশাখ
  • Developed by: Sparkle IT