উপ সম্পাদকীয়

পাসপোর্ট ভোগান্তি

প্রবোধ দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৬:১৬ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

পাসপোর্ট অফিস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে একটি। এদেশের সব মানুষেরই কিন্তু পাসপোর্ট নেই। এমন বহু মানুষ আছে যারা পাসপোর্ট ছাড়াই তাদের জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তাদের কখনো পাসপোর্টের কোন প্রয়োজনই পড়েনি। আবার কারো জন্য পাসপোর্ট এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে না করলেই তার জীবনের মূল কাজই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কাউকে দেশের বাইরে যেতে হলেই পাসপোর্টের প্রয়োজন হয়। এছাড়া কারো পাসপোর্ট থাকলে সেই দেশের নাগরিকত্বের খাঁটি প্রমাণ জাহির করা যায়। তবে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয় কেবলমাত্র জাতীয় পরিচয় পত্রের মাধ্যমে। জাতীয় পরিচয় পত্র থাকলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সকল কাজই করা সম্ভব হয়। শুধুমাত্র কোন ব্যক্তির বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলেই পাসপোর্টের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
সরকার পাসপোর্ট অফিসের মাধ্যমে প্রয়োজন সাপেক্ষে জনগণের পাসপোর্ট প্রদান করে থাকে। যে ব্যক্তির পাসপোর্টের প্রয়োজন পড়ে তাকে অবশ্যই পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। একটি পাসপোর্ট তৈরী করা কিন্তু সহজ একটি কাজ। এটি তৈরী করতে হলে সেখান থেকে একটি ফরম সংগ্রহ করতে হবে। পাসপোর্ট অফিসের হেল্প ডেস্ক থেকে ফরমটি সংগ্রহ করা যায়। সেখানে আবার বেশি বোঝা যাবেনা। হেল্প ডেস্কে কাজ করেন একজন। বোঝার জন্য তাকে ঘিরে থাকেন বহুজন। তবুও একটু চেষ্টা করলেই ফরম পূরণ করার বিষয়ে কিছুটা বোঝা যায়। নতুন পাসপোর্ট তৈরী করতে হলে ঝামেলা একটু বেশি পোহাতে হয়। রিনিউ করতে হলে এর জন্য আলাদা ফরম আছে তাকে সেটিও পূরণ করতে হবে। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই সেখানে যান না। তারা দালালের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। কমসংখ্যক মানুষই কিন্তু এই কাজটি নিজে নিজে সম্পন্ন করে থাকেন। দালালের মাধ্যমে গেলে হয়রানি নেই, ভোগান্তি আছে। এই কাজটি নিজে করতে গেলে হয়রানি আর ভোগান্তি এই দুটির সম্মুখীন হতে হবে। প্রধানতঃ বাংলাদেশ সরকার জনগণের মধ্যে যে পাসপোর্ট প্রদান করে থাকে তাঁর মেয়াদ হচ্ছে পাঁচ বছর। জরুরি হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট দেয়া হয় দ্বিগুণ ফি দিয়ে। সাধারণ পাসপোর্টের ফি তিন হাজার টাকা ভ্যাট চারশো পঞ্চাশ টাকা মোট তিন হাজার চারশো পঞ্চাশ টাকা। নবায়নের জন্য মূল ফি তিন হাজার চারশো পঞ্চাশ টাকার সাথে জরিমানা ভ্যাট সহ তিনশ’ পঁয়তাল্লিশ টাকা প্রদান করতে হবে প্রতি বছর মেয়াদ অতিক্রান্তের পর।
দেশে তিন রকমের পাসপোর্টের প্রচলন রয়েছে। সাধারণ, অফিসিয়েল ও ভিআইপি পাসপোর্ট। সাধারণ পাসপোর্ট সাধারণ মানুষদের জন্য, অফিসিয়েল পাসপোর্ট পূর্বে দেয়া হতো সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। কিন্তু বর্তমানে এই প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে কিছু সংখ্যক অসাধু দালাল ও প্রতারক চক্রের কারণে। নকল অফিসিয়েল পাসপোর্ট ধরা পড়ায় সরকার তা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধুমাত্র সরকার যে কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বিদেশে পাঠাবে তারাই অফিসিয়েল পাসপোর্ট পাবে কোন প্রকার ফি ছাড়া। অপরাধ করল কে আর শাস্তি পেল কে? এর নামই উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে। জালিয়াতির কারণে শাস্তি পাওয়ার কথা প্রতারক চক্রটির। কিন্তু বাস্তবে তা হল না। পরিণাম ভোগ করতে হলো নিরাপরাধ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে পুনরায় অফিসিয়েল পাসপোর্ট চালু হোক এই দাবি সংশ্লিষ্ট সকল মানুষের। যেহেতু কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী জালিয়াতি বা প্রতারণার সাথে সংশ্লিষ্ট নন তাই তারা অফিসিয়েল পাসপোর্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে রাজী নন। আর যেহেতু সরকারি কর্মচারীদের পাসপোর্ট করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে অর্থাৎ অনাপত্তি পত্র লাগে তবে তাদের ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত হবে কেন? একমাত্র পাসপোর্ট অফিসের কেউ জড়িত থাকলে পাসপোর্ট জালিয়াতি করা সম্ভব বলে বিজ্ঞজনদের অভিমত। সেই সাথে অফিসিয়েল পাসপোর্ট সকল সরকারি কর্মচারীদের জন্য পুনর্বার চালু করা হোক এই দাবী মোটেই অযৌক্তিক নয়।
একটি পাসপোর্ট তৈরীতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। সরকারি কর্মচারীদের জন্য এর প্রয়োজন নেই। টাকা ছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়না। এ নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক৷ তাই সকলের জন্য সহজ উপায়ে পাসপোর্ট তৈরি করা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কাজ। পূর্বে হাতে লেখা পাসপোর্ট দেয়া হতো। বর্তমানে দেয়া হয় মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট। আগামী বছর থেকে চালু হচ্ছে ই-পাসপোর্ট। এ দেশের মানুষের জন্য পাসপোর্ট উন্নত হচ্ছে কিন্তু তৈরী প্রক্রিয়া সহজ হচ্ছে না বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। সরকার জনগণের সেবা করতে চায়। অথচ পাসপোর্ট করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ দালালের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। দালালমুক্ত পাসপোর্ট অফিস যেন ভাবাই যায় না। প্রতিটি পাসপোর্ট তৈরীর জন্য দ্বিগুণ বা এর চেয়ে অধিক হারে দালালরা সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকে। দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করা সহজ কাজ নয়। অথচ নিজে নিজে পাসপোর্ট করা কঠিন কাজও নয়। যদি পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আগত মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তা না করে এমন এক নিয়ম চালু রেখেছে যা মানুষের জন্য কেবল হয়রানি আর ভোগান্তিই বাড়ায়।
নতুন/রিনিউ যে পাসপোর্টই করা হোক না কেন তা করতে গিয়ে যে কয়টা ধাপ পেরুতে হয় এর মধ্যে অন্যতম কঠিন ও সর্বশেষ প্রক্রিয়া হচ্ছে পাসপোর্ট গ্রহণ। যার জন্য এত দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা তৈরী করতে কি কি প্রয়োজন হয় এ বিষয়ে দেশের সকল মানুষের অবগত থাকাতো কোন ক্ষতি নেই। দালাল ছাড়া নতুন/রিনিউ যে পাসপোর্টই করা হোক না কেন যেতে হবে পাসপোর্ট অফিসে। সেখানে গেইটের সামনে পুলিশ ও দারোয়ান বসা থাকে। দারোয়ানের কাছে আগমনের কারণ বলতে হবে। দারোয়ান কারণ জেনে হেল্প ডেস্কের দিকে পাঠিয়ে দিবে। হেল্প ডেস্কে একজন মাত্র লোক বসা থাকে। তাকে ঘিরে অনেকজন। একবার না বুঝলে দ্বিতীয় বার বুঝার কোন সুযোগ নেই। নতুন পাসপোর্ট হলে একটি ফরম, রিনিউ হলে দু’রকম দুটি ফরম এবং সরকারি কর্মচারী হলে তিন রকম তিনটি ফরম দিবে হেল্প ডেস্ক থেকে। ফরম তিনটি পূরণ করে পাসপোর্টের নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে পুরণকৃত ফরম জমা দিতে হবে। যদি নতুন হয় তবে স্লীপ গ্রহণের জন্য কিউ ধরে স্লীপ গ্রহণ করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি তোলার জন্য অন্য আরেকটি কিউ ধরতে হবে। এক কথায় ফরম জমা দেয়া থেকে শুরু করে ছবি তোলা পর্যন্ত একজন আবেদনকারীর একদিন শেষ হয়ে যায়।
দালালের মাধ্যমে না আসলে হয়রানী হবে আরো কয়েকদিন। সামান্য ত্রুটি হলেই রেহাই নেই হয়রানি থেকে। দালালদের সাথে পাসপোর্ট অফিসের সম্পর্ক থাকে। সেটি কারো চোখে সহজে ধরা পড়ার মতো নয়। বাইরে বাইরে সততার লেবাস ভিতরে দুর্নীতির গোপন আবাস। সবার কাজ হয় একসাথে কিউ ধরে কিন্তু রহস্যজনক কারণে অজানা ভাষায় দালাল প্রেরিত জমাকৃত ফরমের মালিকের নেই কোন হয়রানি নেই কোন ভোগান্তি। উদাহরণস্বরূপ সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের কথাই উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে প্রতিটি কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ কিউ থাকে। বিশেষ করে রেডি পাসপোর্ট উত্তোলনের সময় হয়রানী আর ভোগান্তির শেষ নেই। একটি দীর্ঘ কিউতে দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে হবে। মনে হবে যেন ইচ্ছে করেই মানুষকে কষ্ট দিবার জন্যই একটি জটিল প্রক্রিয়ার অবতারণা করে থাকে। সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে কেউ কাজ করে বলে মনে হবে না! মহিলাদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকলেও শিশু,রোগী কিংবা বয়স্ক মানুষের জন্য কোন সুবিধা নেই। অথচ ইচ্ছে করলেই কিন্তু সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে সহজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাহিদা মাফিক লোকবল দিয়ে কাজ করালেই কোন মানুষেরই হয়রানি আর ভোগান্তি থাকতো না। একটি পাসপোর্ট অফিসে লোকবলের অভাব থাকার কথা নয়। কারণ দেশের জনগণ সরকারের নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে এই অফিসে আসেন। এটি একটি সরকারের লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর মতো বি আর টিএ, ইনকামট্যাক্স, ভ্যাট ও ভূমি অফিস সহ আরো বিভিন্ন সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো থেকে সরকার দেশের অধিকাংশ রাজস্ব আয় পেয়ে থাকে। অথচ সেখান থেকেই সেবা গ্রহীতা জনগণ দুর্নীতি, ভোগান্তি আর হয়রানীর শিকার হয়ে থাকে বেশি। কেবল জনগণেরই সরাসরি কারো কাছে অভিযোগ জানাবার কোন সুযোগ নেই। সকল প্রকার অন্যায় কাজ একমাত্র জনগণই মুখ বুজে নিরবে সহ্য করে থাকেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি দ্বিগুণ করার পরও তাদের কাছ থেকে দুর্নীতি চিরতরে নির্মূল হয়ে গেছে একথা কি ঘোষণা দেয়া সম্ভব হবে? সরকারি কর্মচারীদের মতে, বেতন ভাতাদি দ্বিগুণ হওয়ার সাথে সাথে জীবন যাত্রার ব্যয়ভারও দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাই সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা সহজ কাজ নয়। দুর্নীতি নির্মূলে বিকল্প চিন্তার সন্ধান করা উচিত বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। তবেই পাসপোর্ট অফিসের মতো দেশের সকল সেবামূলক সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে আপামর জনগণ হয়রানি আর ভোগান্তি থেকে অব্যাহতি পাবেন, এই ধারণা পোষণ করা অমূলক হবে না।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT