ধর্ম ও জীবন

 ওলিদের দুনিয়া বিমুখ জীবন

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৩-২০১৯ ইং ০১:০৪:৫৯ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

আল্লাহ তায়ালার প্রিয়জন দুনিয়াতে ছেড়েছেন আখেরাতকে আকড়ে ধরেছেন। দুনিয়ার আরাম আয়োজনকে তারা ঘৃণার চোখে দেখতেন। দুনিয়ার আরামকে ফিতনা মনে করতেন। দুনিয়াকে তাদের সামনে পেশ করা হলে দূরে ঠেলে দিতেন। দরিদ্রতাকে তারা ভালবাসতেন একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করতেন। অর্থ ও বিত্তের মোহ থেকে তারা দূরে থেকেছেন।
হযরত আব্দুস সামাদ ইবনে ওমর রাহঃ নির্মোহ মানুষ ছিলেন কারো নিকট কোন কিছু চাইতেন না। কেউ কোন কিছু দান করলে গ্রহণ করতেন না। এরপরও কেউ ঝোর করে কোন কিছু দিলে সাথে সাথে দান করে দিতেন। একদিন তিনি সাথীদের নিয়ে বসে দুনিয়ার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় এক লোক এসে তাকে ১০০ দিনার হাদিয়া নিয়ে এল এবং তাকে দিতে চাইল। তিনি বললেন, আমার এগুলোর প্রয়োজন নেই। লোকটি বলল, আপনার সাথীদের দিয়ে দিন। তিনি বললেন ঠিক আছে নিচে রেখে দাও। লোকটি সকলের মাঝখানে দিনারগুলো রেখে দিল। আব্দুস সামাদ ইবনে ওমর রাহঃ সাথীদের বললেন, যার যা প্রয়োজন এখান থেকে নিয়ে যাও। সাথীরা যার যার প্রয়োজন মত দিনারগুলো নিচ্ছেন। এমন সময় তার ছেলে এসে তার নিকট খেজুর কিনার জন্য অর্থ চাইল। তখন তার নিকট কোন অর্থ ছিল না। তিনি ছেলেকে আদর করে বললেন যাও, দোকান থেকে এক পোয়া খেজুর বাকি নিয়ে যাও। আমি দোকানীকে পরিশোধ করব। তিনি দোকান থেকে বাকিতে খেজুর কিনেছেন। কিন্তু হাদিয়ার এক দিনারও গ্রহণ করেন নি। দেখতে দেখতে এক ঈদ এসে গেল আব্দুস সামাদ ইবনে ওমর রাহঃ ঘরে কোন খাবার ছিল না। একলোক কিছু দিনার নিয়ে হাজির হল। তাকে হাদিয়া দেওয়ার জন্য বলল জনাব এগুলো গ্রহণ করুন। তিনি হাসিমুখে জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ আজ আমাকে দরিদ্রতার স্বাদ অনুভব করতে দাও। যেমনি ভাবে আজ ধনীরা তাদের সম্পদের স্বাদ অনুভব করে। তিনি সাথীদের বলতেন, তোমরা দুনিয়া হারিয়েছ। আখেরাতকে দুনিয়ার মত হারিয়ে বসনা।
হযরত আস সারী সাকতী রাহঃ তিনি বাগদাদের ইমাম ও শাইখ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালার ভয়ে সদা কম্পমান থাকতেন। নির্জনতা পছন্দ করতেন। জুনাইদ রাহঃ বলেন, আস সারী সাকতী রাহঃ বলতে শুনেছি যে ৩০ বৎসর যাবৎ মন চায় খেজুর ভিজানো পানিতে গাজর ভিজিয়ে খেতে । কিন্তু তা খাওয়াতো উচিত হবে না। এক ব্যক্তি নিজ ছেলেকে দিয়ে হযরত আস সারী সাকতী রাহঃ এর নিকট হাদিয়া পাঠাল। আস সারী সাকতী রাহঃ ছেলেটিকে বললেন তোমার বাবা কি এর দাম বলেছে। ছেলেটি জবাব দিল, না বাবা দাম বলেননি। তিনি হাদিয়া ফেরত দিলেন। আর ছেলেটিকে বললেন, তুমি এগুলো ফেরত নিয়ে যাও আর তোমার বাবাকে বলো যে, গত পঞ্চাশ বৎসব ধরে আমি মানুষকে শিক্ষা দিয়ে এসেছি যে, তোমরা দ্বীনের বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ করবে না। আজ দেখছি আমরাই দ্বীন বিক্রয় করে খাওয়া শুরু করেছি।
হযরত আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহঃ শ্রেষ্ঠ চার ইমামের একজন। দুনিয়ার প্রতি তাদের কোন আসক্তি ছিল না। দুনিয়া তাদর পিছে পিছে চলত। কিন্তু তিনি দুনিয়ার দিকে ফিরেও তাকাননি। শেষ পর্যন্ত দুনিয়া ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে আখেরাতের পথে ছেড়ে দিয়েছে। একদিন হারুন আল মোস্তামালী ইমাম সাহেবের সাক্ষাতে এলেন এবং বললেন জনাব আমার নিকট কোন অর্থ কড়ি নেই। ইমাম সাহেব তাকে পাঁচ দিরহাম হাদিয়া দিলেন আর বললেন আমার নিকট এছাড়া আর কিছু নেই। একদিন ইমাম সাহেব কোথাও বসা ছিলেন। এমন সময় এক লোক এসে খবব দিল, আপনার ছেলে অসুস্থ সে মাখন খেতে চাচ্ছে। তিনি মাখন আনতে অর্থ দিলেন। লোকটি কাগজে করে মাখন নিয়ে এল। ইমাম হাম্বল রাহঃ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যে এই অতিরিক্ত কাগজ এনেছ তা কি দোকানদারের অনুমতি নিয়ে এনেছ? লোকটি জবাব দিল, না। ইমাম হাম্বল বললেন, যাও কাগজটি ফেরত দিয়ে আসো।
হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহঃ কোন কারণে একটি পাত্র ব্যবসায়ীর নিকট বন্ধক রেখেছিলেন। বন্ধক ছুটাতে এসে পাত্র দেখে তার সন্দেহ হল এটি তার কি না। এ জন্য তিনি পাত্রটি আর ফেরত নেন নি। ব্যবসায়ীকে তিনি বললেন, ভাই এটি তোমার। তুমি এটি রেখে দাও এবং ব্যবহার করো।
হযরত আব্দুর রাজ্জাক রাহঃ সাথীদের নিয়ে বসা ছিলেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাঃ কে নিয়ে আলোচনা করলেন। আলোচনা করতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেললেন। তার গাল বেয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি বলেন, একবার কারো কাছে জানতে পারলাম, ইমাম সাহেবের হাতে অর্থ কড়ি নেই। আমি দশ দিনার নিয়ে তার দরবারে হাজির হলাম এবং তাকে দিতে চাইলাম। ইমাম সাহেব মুচকি হাসলেন আর বললেন, হে আব্দুর রাজ্জাক কারো নিকট থেকে কিছু নিলে তোমার কাছ থেকেও নিতাম।
হযরত আহমাদ ইবনে হাম্বল বলতেন, জমিন দুই ধরনের লোকের কর্মকান্ড দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে। প্রথমত ঐ ব্যক্তিকে দেখে, যে ঘুমানোর উদ্দেশ্যে আরামের বিছানা করার জন্য সাধ্যাতীত চেষ্টা করে যায়। জমিন তখন তাকে ডেকে বলে, হে আহাম্মক কিছুক্ষণ আরামে শোয়ার জন্য একটু নরম বিছানা করার জন্য সাধ্যের বাইতে কত চেষ্টা তুমি করে যাচ্ছ। অথচ চিন্তা করে দেখো না যে, মৃত্যু তোমাকে ধাওয়া করছে। অতিশীঘ্রই তোমার মৃত্যু হবে। বিছানা ছাড়াই তোমাকে অনেক অনেক বছর পড়ে থাকতে হবে। তোমার এই শরীর কঙ্কালে পরিণত হবে। আরো অন্য এক ব্যক্তির কান্ডকারখানা দেখে জমিন আশ্চর্যাম্বিত হয়। যে একটুকরো জমির জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তপাত ঘটায়। সে একটুও চিন্তা করে দেখে না যে সামান্য কিছুকাল আগে এই ভূমির মালিকানা তার ছিল না। আবার অল্প কিছুকাল পরেও তার এই মালিকানা থাকবে না। দুনিয়া সৃষ্টির পর থেকে এই জমির মালিকানা কত লোকের হাত বদল হয়েছে আরো কত লোকের হাত বদল হবে সে কি একটু চিন্তা করে দেখে না?
হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলতেন, গোনাহের যদি দুর্গন্ধ থাকত তাহলে তোমরা কেউ আমার নিকট বসতে না। আমল করার জন্য যতটুকু আহার প্রয়োজন ততটুকু আহার করতেন। এই পরিমাণ না পেলেও আনন্দিত হতেন। তার ছেলে সালেহ বর্ণনা করেন। একদিন বাবা একটি রুটির টুকরো নিয়ে বসলেন। এর থেকে ফুঁ দিয়ে ধুলো বালি পরিষ্কার করলেন। একটি পাত্রের মধ্যে পানিতে ভিজিয়ে সামান্য লবন দিয়ে খেয়ে নিলেন। তিনি বলতেন আমার কাছে কিছুই না থাকলে ভাল লাগে।
তাকে কোন দিন আনার পেয়ারা বা অন্য কোন ফল কিনতে দেখা যায় নি। তবে মাঝে মাঝে তিনি তরমুজ কিনে রুটির সাথে খেতেন। জেলে গিয়েও তিনি অল্প আহার করতেন। হযরত দাউদ আস সিখতিয়ানী বলেন, তার মজলিস ছিল আখেরাতের মজলিস। সেখানে দুনিয়ার বিষয়ে আলোচনা হত না। সব আলোচনা থাকত আখেরাতকে উপলক্ষ্য করে। মৃত্যুর কথা স্মরণ হলে তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসত। তিনি বলতেন, মৃত্যুর ভয়ে আমি পানাহার করতে পারি না। মৃত্যুর কথা মনে হলে এই দুনিয়ার সব আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।
সূত্র: কুড়ানো মানিক : মাওলানা মহিউদ্দিন খান রাহঃ ও দুনিয়া বিমুখ শত মনীষী : মুহাম্মাদ সিদ্দীক আল মিনশাভী

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT