উপ সম্পাদকীয়

সিলেট বিভাগের শিল্পায়ন ও সম্ভাবনা

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:০৬:০৭ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে ভারতীয় সীমান্তবর্তী সুরমা কুশিয়ারা বিদৌত অঞ্চল, পীর আউলিয়ার পুণ্যভূমি ও ইসলামী রেনেসাঁর প্রাচীন অঞ্চল সিলেট। চা, তেল, গ্যাসসহ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের লীলাভূমি সিলেট। পাহাড়, পর্বত, নদী, ঝরণা ও হাওর বাওরের দেশ সিলেট। প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে শান্ত ও দৃঢ় সিলেট বিভাগকে দ্বিতীয় লন্ডন হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। তাই সিলেটের রয়েছে নিজস্ব ও আলাদা গুরুত্ব ও আলাদা ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শ্রীভূমি, আধ্যাত্মিক পুণ্যভূমি, দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। সাড়ে বার হাজার বর্গ কিঃ মিঃ এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ নিয়ে গঠিত হযরত শাহজালাল (রঃ) এর পুণ্যভূমি সিলেট। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ মোট সাড়ে পনর লক্ষ হেক্টর ভূমি নিয়ে গঠিত সিলেট। বাংলাদেশের সর্বমোট ভূমির ১২ ভাগের এক ভাগ নিয়ে গঠিত সিলেট অঞ্চলে রয়েছে ১৩৪টি চা বাগানসহ প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর সমৃদ্ধ বনভূমি। উক্ত বনভূমিতে রয়েছে মহামূল্যবান কাঠ, বাঁশ, বেত, ফল ফসল সহ নানা প্রজাতির বনজ সম্পদ। মাটির নীচে রয়েছে ৯/১০টি তেল-গ্যাস ক্ষেত্রসহ প্রায় ১৪/১৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট তেল-গ্যাস ছাড়াও চুনাপাথর, কয়লা, বোল্ডার, বালুসহ অফুরন্ত খনিজ সম্পদ। সিলেট অঞ্চল হাওর বেষ্টিত হওয়ায় সেখানেও রয়েছে প্রচুর মৎস্য সম্পদসহ পানির নীচের মূল্যবান বিভিন্ন প্রজাতির অফুরন্ত পানি সম্পদ। তাছাড়া বৃটেন, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, যা সারাদেশের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৬৮% শতাংশ। বিপুল আয় ও সম্পদের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সিলেট শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ, কৃষি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটেনি বলেই এ অঞ্চলের মানুষের বেকারত্বের হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে প্রচুর শিক্ষিত যুবক-যুবতীগণকে উন্নত কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাতে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। শিক্ষার প্রতি অনিহার কারণে মেধাবী শিক্ষিত লোকের অভাব সৃষ্টি হচ্ছে ফলে দেশের উন্নয়ন ও শিল্পায়ন হচ্ছে বাধাগ্রস্ত, যা সিলেটবাসীর জন্যতো বটেই দেশের উন্নয়নের জন্যও অন্তরায়।
সিলেট অঞ্চল উন্নয়নে পশ্চাদপদতার প্রধানতম কারণগুলোর মধ্যে শিক্ষার অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, কর্মস্থানের স্বল্পতা, শিল্প প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, বিদেশ গমনের প্রবণতা, অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অ-উৎপাদন খাতে ব্যয়ের প্রবণতা, সরকারি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা, শিল্পায়নে প্রয়োজন এমন অবকাঠামোর অভাব, আধুনিক ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জাতীয় পর্যায়ের বৈরিতা, সর্বোপরি সিলেট অঞ্চলের নেতৃবৃন্দের দুরদর্শিতার অভাব ও ব্যর্থতা ইত্যাদি প্রধানতম কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। যার ফলে বর্তমান জনবান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্য সাধারণ জনগোষ্ঠির উন্নয়ন পরিকল্পনা সমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্বেও আগামী দিনগুলোতে উন্নয়ন সম্ভাবনার এরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সম্ভাবনা নাকোচ করা যাচ্ছে না বলেই সিলেটবাসী উদ্বিগ্ন। উন্নয়ন প্রত্যাশি সিলেটবাসী বর্তমান সরকারের কাছে সিলেটের শিল্পায়নে যে সকল প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা, দুর্বলতা ও অবকাঠামোগত বাধা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রত্যাশা করছে। বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানী স্বল্পতাসহ সিলেটকে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে কাঁটা সদৃশ প্রতিবন্ধকতাগুলোর তড়িৎ উত্তরণের ব্যবস্থা চায় সিলেটবাসী।
শিক্ষার্থীরা জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। শিক্ষা মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পতা হেতু ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবের কারণে সিলেটবাসীকে পূর্বের ঐতিহ্য হারানোর উপক্রম হয়েছে। সিলেটবাসীর এই অবনতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে সিলেটের সাড়ে ১০ হাজার গ্রামের প্রত্যেকটিতে একটি করে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনসহ একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমসি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছে সিলেটবাসী।
মানুষ, মেশিন, মেটেরিয়েলস ও সহজ যোগাযোগের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলেই শিল্পায়ন সম্ভব। সিলেট অঞ্চলে শিক্ষিত মেধাবী কর্মক্ষম মানুষের অভাব নেই। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে অথচ শুধু চর্চা ও নেতৃত্ব দেওয়ার অভাবে জাতির সোনালী স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। মেশিন, মেটেরিয়েলস ও অন্যান্য কারিগরি যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য প্রচুর অলস অর্থ স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে ভালো ও উত্তম উদ্যোক্তার অভাবে পড়ে আছে। অভাব শুধু সুষ্ঠু ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। সিলেটের সকল ক্ষেত্রেই যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ দ্রুত ও উন্নত করা হয়নি। রেললাইন ডাবল করা ও ঢাকা-সুনামগঞ্জ রেললাইন স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক এখনো চার লেন করার স্বপ্ন, স্বপ্ন হয়েই বাতাসে ভাসছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি থাকলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন করার স্বপ্ন স্বপ্ন হয়েই রইল। সুনামগঞ্জ হতে নেত্রকোনা হয়ে ঢাকা-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক নির্মাণের দীর্ঘদিনের দাবীর বাস্তবায়ন চায় সুনামগঞ্জ ও সিলেট বিভাগবাসী। সহজ যোগাযোগ ছাড়া শিল্পে উৎপাদিত মালামাল বাজারজাত করা সহজ নয় ফলে উদ্যোক্তাবৃন্দ শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহী হয়ে থাকে তাই সিলেট অঞ্চলের নেতৃবৃন্দের কাছে উল্লেখিত সহজ ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার তড়িৎ উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করছে সিলেটবাসী।
ইতিমধ্যে দেশে শিল্পায়ন যে হয়নি তা নয়, বর্তমান সরকার ও ব্যবসায়ীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ক্ষুদ্র ও কিছু মাঝারি শিল্প কারখানা ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কিন্তু সে তুলনায় আমাদের সিলেট বিভাগে শিল্পায়ন হয়েছে নিতান্তই কম। এক সময় কুঠির শিল্প ও কৃষিকে অবলম্বন করে এ দেশের মানুষ আর্থিকভাবে স্বনির্ভর ছিল। কিন্তু এক সময়কার সমৃদ্ধশালী প্রাণপ্রিয় দেশটি আজ শত সমস্যার সাথে বেকার সমস্যার তীব্রতার কারণে অতীত গৌরব হারাতে বসেছে। হারানো সেই গৌরব পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন উপযুক্ততার ভিত্তিতে হাতে কলমে শিল্প ও কারিগরি শিক্ষাসহ সততার সাথে উদ্যম ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও উদ্যোগ। এক সময়কার তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বের ৪৪ তম দেশ এবং ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩৩ তম। এখন নি¤œ আয়ের দেশগুলোকে পিছনে ফেলে অর্থনীতি ও আর্থ সামাজিক সুচকগুলোর বেশির ভাগ সুচকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি এবং অধিকাংশ সুচকের ক্ষেত্রে বিশ্বের রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। দেশকে সার্বিক উন্নয়নে উন্নত দেশের তালিকায় সামিল করতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় সিলেট বিভাগকে দ্রুত শিল্পায়ন করা প্রয়োজন। তাই অত্রাঞ্চলে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ-গ্যাসের নিশ্চয়তাসহ শিক্ষা ও শিল্পায়নে প্রয়োজন সকল অবকাঠামো তৈরী করতঃ দেশি বিদেশি উদ্যোক্তাগণের কাছে বিশেষ করে সিলেটি প্রবাসীগণের কাছে সিলেটকে শিল্পায়নের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা সম্ভব হলেই এ অঞ্চলে দ্রুত শিল্পায়ন সম্ভব হবে। সম্ভাবনাময় শিল্পায়নেই ঘুচবে বেকারত্ব, আসবে অনাবিল সুখ, শান্তি ও কল্যাণ। ঘুচবে সকল গ্লানি, অভাব ও দারিদ্র্য। নতুন আলোয় আলোকিত হয়ে গড়ে উঠবে হযরত শাহজালালের পুণ্যভূমি আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট। স্বপ্নের শান্তিময় সিলেট বিভাগ তথা বাংলাদেশ।
লেখক : সাবেক কর্মকর্তা, সিলেট পাল্প এন্ড পেপার মিলস, ছাতক, সুনামগঞ্জ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT