উপ সম্পাদকীয়

প্রাসঙ্গিক কথকতা

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:০৭:০৮ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

আজকের সমাজ ব্যবস্থায় পেশীশক্তির প্রভাব বেশি বলে প্রতিভাত হয়। তৃণমূল বলতে যা বুঝায় সেখানে যেমন একেবারে শীর্ষেও রয়েছে, একই রকম আবহ। তৃণমূলে পেশীর ব্যবহার হয় আক্ষরিক অর্থে আর শীর্ষ পর্যায়ে হয় ইশারা, ইঙ্গিত আর না হয় বাকচাতুর্যে। আজকালকার সমাজ ব্যবস্থাই যেন ইঙ্গিত করে নিজেকে প্রকাশ করার সুপ্ত মানসিকতার। সে হিসাবে অতিকথন যেন জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে চলেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীপরিষদ এর সদস্যবৃন্দকে সতর্ক করে দিয়েছেন অতিকথন এর ব্যাপারে। দায়িত্ব নিয়ে যদি বাক্যব্যয় না করতে পারি তাহলে বক্তব্য দিয়ে তো লাভ নেই। অনেক সরকার গত হয়েছে অতিকথন আর বাকপটুদের কথার তুবড়ী আর বাস্তবতার অমিল এর কারণে সৃষ্ট সংকটের কারণে। আমাদের বৃহত্তর সিলেটের কৃতিসন্তান এবং বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব অনেক কথা বলতেন তাও আবার অর্ধেক সিলেটী আঞ্চলিক শব্দ সমূহ ব্যবহার করে। তার কথ্যভাষার ধরণ আর সাবলীলতা বৃহত্তর সিলেটের কথ্যভাষাকে একটি বৃহত্তর পরিসরে ব্যাপৃত করেছে পরোক্ষভাবে। ভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভাষ্য উপস্থাপনকালে কোন সিলেটী আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহৃত হলে দেখেছি শ্রোতা বেশ মনোযোগ সহকারে সেটি গ্রহণ করছেন এবং আত্মস্থ করছেন।
মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব কথা বলতেন কিন্তু সব বাক্যের সাযুজ্য আর বাস্তবতা বুঝতেই সেটি করতেন। তিনি যা বলতেন তা করেই ছাড়তেন। তার সকল বক্তব্যের বাস্তবতা বৃহত্তর সিলেটবাসী হাতে হাতে পেয়েছেন বলেই এই মরহুম (সাবেক) অর্থমন্ত্রীকে সিলেটের কৃতি সন্তানের মর্যাদার আসনে স্থান দিয়েছেন দলমত নির্বিশেষে। সিলেট মহানগরীর আলীয়া মাদ্রাসা ময়দান, ভবনসহ পুরো স্থাপনা, সন্নিহিত স্কাউট ভবন আরও কিছু জরাজীর্ণ ভবনসহ উন্নয়নের দাবিদার বেশ কিছু স্থান দেখিয়ে স্মরণ করলেন মরহুম সাইফুর রহমান এর কথা, যিনি তা করলেন-তিনি একজন নগণ্য ফুটপাত এ বসা ব্যবসায়ী। উল্লেখ করলেন মরহুম সাইফুর রহমান সাহেবকে সিলেটের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসাবে। বললেন বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমার উপরে তিনি অনেকগুলি সেতু নির্মাণ করে বৃহত্তর সিলেটবাসীকে সারাদেশের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন আত্মিক এবং ব্যবসায়ীক দিকে। মেঘনা সেতু তৈরির মাধ্যমে ফেরী পারাপারের ঝক্কি, ঝামেলা এবং ঝুকিমুক্ত করেছেন বৃহত্তর সিলেটের যাত্রা সাধারণকে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীটি আমাকে বললেন যে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এর জরুরি বিভাগ এর ফটক থেকে একেবারে কুমারপাড়া মোড় পর্যন্ত একটি উড়াল সড়কের প্রয়োজনীয়তা সেই সাবেক অর্থমন্ত্রী সাহেব বুঝতেন কারণ তিনি তৃণমূল থেকে সব চাহিদা জেনে নিতেন। আমি জানিনা বর্তমান সরকার এর আমলে সেটি আদৌ দৃষ্টি কাড়বে কিনা। অনুরূপভাবে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সিলেট-০১ আসনের সংসদ সদস্য (মাননীয়) আব্দুল মোমেন সাহেব কর্তৃক ঘোষিত ত্রিমুখী উড়াল সড়কটি বাস্তবে রূপ পাবে কিনা। আম্বরখানা, রিকাবী বাজার আর জিতু মিয়ার মোড় এলাকায় যে অনতিবিলম্বে ফুটওভার ব্রীজ স্থাপন জরুরি সেটি ভাবনায় স্থান পাবে কিনা। এই ফুট ওভার ব্রীজগুলি স্থাপিত হলে প্রতিদিনকার অগণিত সড়ক দুর্ঘটনার বিস্তৃতি হ্রাস পাবে বলে আশা করা যেতে পারে।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে একটি উন্নতমানের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। এটি সময়োপযোগী ও মহতী একটি উদ্যোগ। সাশ্রয়ী আর নিরাপদ গণপরিবহন বলতে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বুঝায়। আমার কলামটিতে বারবার সিলেটকে সংযুক্তকারী রেলব্যবস্থাকে উভয়মুখী ও ব্রডগেজ লাইনে রূপান্তরিত করার কথা বলেছিলাম। কারণ, প্রয়োজন আর অর্থনৈতিক ন্যায্যতার উল্লেখ করেছিলাম কিন্তু অতিকথনের মাধ্যমে সেগুলিকে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আশা করবো পাহাড়ী এলাকা, অনেকগুলি বাক জাতীয় বাহানা এড়িয়ে উভয়মুখী ব্রডগেজ রেল লাইনটি হবে। আমার পরিবার এর সদস্যদের ঢাকাভিমুখী যাত্রা প্রায় নিয়মিত এবং সেটা হয়ে থাকে আকাশপথে। একমাত্র আমিই মাঝে মধ্যে ভ্রমণ করি সড়কপথে ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার কারণে। আমার পরিবার এর সদস্যরাও বলে থাকেন রেল ভ্রমণ উনাদের কাছে অতি পছন্দের আবার রোমাঞ্চকর কিন্তু এখনকার সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এবং অনিশ্চিত। দুর্বল রেললাইন, পুরনো ইঞ্জিন সমৃদ্ধ রেলব্যবস্থা কোন সময় যে লাইনচ্যুতির কারণ ঘটায় সেটার হদিস মেলা ভার। অবশ্যই মনে রাখতে হবে এতো কিছুর পরও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলটি এখনো বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী খাত। আমার নাতনী কোনদিন রেলগাড়ী চড়ে নাই। তার বায়নাটিও মেটানো যাচ্ছে না রেল কর্তৃপক্ষের অনিয়ম আর অবহেলার কারণে সৃষ্ট অনিরাপদ যাত্রা পথের কারণে। গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো রয়েছে রেল টিকেটের দুষ্প্রাপ্যতা আর টিকিট কালোবাজারীদের দোর্দন্ড প্রতাপ। এদের থেকে নিরীহ যাত্রি সাধারণকে রক্ষা করতে হবে। এখনও বৃহত্তর সিলেটবাসী রেলযাত্রায় আগ্রহী আর রেলকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বড় অংকের রাজস্বের যোগানদারও এই অঞ্চলের রেলযাত্রিরা।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে নদী দখলের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সেটির ব্যাপারে অবশ্যই কঠোরতম অবস্থানে যেতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আশা করা যায় সকল অবৈধ দখলকারীদের কবল থেকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মুক্তি পাবে। নৌপথ ও রেলপথে পণ্য পরিবহনে উৎসাহ প্রদান আবার দ্রুততম উপায়ে সেগুলি গন্তব্যে পৌঁছানো জাতীয় কর্তব্যকর্ম নিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বা এলাকায় অবশ্যই রেল ও নৌ কর্তৃপক্ষের নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্ট থাকতে হবে। কমিশন ভিত্তিক ব্যবসা যেমন উৎসাহিত হবে তেমনি নতুন নতুন কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সড়কপথের উপর চাপ যেমন কমবে তেমনি সংস্কারবাবদ বিপুল অর্থরাশি ব্যয় করা থেকে সরকারি কর্তৃপক্ষ রক্ষা পাবে। সিলেট নগর মধ্যস্থিত সড়কগুলি দিয়ে ভারী মালামালবাহী দানবসদৃশ্য বাহনগুলির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর থেকে বাদাঘাট ও খাদিমনগরমুখী দুটো বাইপাস সড়ক নির্মিত হচ্ছে বলে শুনে আসছি দীর্ঘদিন থেকে কিন্তু বাস্তবে কিছুই দৃশ্যমান হচ্ছে না। নৌপথে পাথর পরিবহন উৎসাহিত করলে যেমন সাশ্রয়ী হবে তেমনি সড়কপথে প্রাণসংহারি ট্রাক চলাচলও বন্ধ হবে। ছাতককে কেন্দ্র করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত করতে পারলে অবশ্যই হাওর অঞ্চল সহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলবাসি উপকৃত হবেন সাথে সাথে মুমূর্ষ অবস্থা থেকে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রক্ষা পাবে নিশ্চিতভাবে।
ছাতক থেকে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত মানসম্মত Water Taxi এর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার আনন্দময় একটি সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ছাতক থেকে ভৈরব, আশুগঞ্জ এবং ঢাকা পর্যন্ত এই যাত্রিসেবা বর্ধিত করা যেতে পারে। মনে হয় সেটি হবে যেমন পর্যটন পিয়াসী মানবমনের চাহিদা পূরণে সক্ষম তেমনি হবে পরিবেশবান্ধব।
সিলেট মহানগরীটিকেও অহেতুক যানজটমুক্ত করতে অনাকাংখিত ত্রিচক্রযান অর্থাৎ অটোরিক্সা মুক্ত করতে হবে আর রিকশার সংখ্যা সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সাথে সাথে নির্দিষ্ট এলাকায় রিক্সা চলাচলে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নগরে অবিলম্বে দ্বিতল বাস চলাচল ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। মনে রাখতে হবে এ সকল বাস চলাচল শুধুমাত্র নগর মধ্যস্থিত অঞ্চলে নির্ধারিত থাকতে হবে। বন্দরবাজারস্থিত হাসান মার্কেটটিকে পুনঃনির্মাণ করে এটির ছাদে হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার। অকৃতি লভেতে লাঞ্চনা।
লেখক : অধ্যক্ষ, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT