পাঁচ মিশালী

কবি বুদ্ধদেব বসু

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৩-২০১৯ ইং ০১:০৮:২৫ | সংবাদটি ৫১ বার পঠিত

কবি, সম্পাদক, সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর জন্ম ১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর কুমিল্লায়। বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকের নতুন কাব্যরীতির সূচনাকারী কবি হিসেবে সমাদৃত বুদ্ধদেব অল্প বয়স থেকেই কবিতা রচনা করেছেন। প্রগতি ও কল্লোল নামে দুটি পত্রিকায় লেখার অভিজ্ঞতা সম্বল করে যে ক’জন তরুণ লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই তাঁর প্রভাবের বাইরে সরে দাঁড়াবার দুঃসাহস করেছিলেন তিনি তাদের অন্যতম।
বুদ্ধদেব বসুর বাবা ছিলেন পেশায় উকিল। মায়ের নাম বিনয় কুমারী। পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের মালখানগর গ্রামে। তাঁর জন্মের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মা বিনয় কুমারীর মৃত্যু ঘটে। এতে শোকাভিভুত হয়ে তাঁর বাবা সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করেন। মাতামহ-মাতামহীর কাছে প্রতিপালিত বুদ্ধ দেবের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রথম ভাগ কাটে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকা জেলায়।
১৯২১ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং প্রায় দশ বছর ঢাকায় শিক্ষা লাভ করেন। ১৯২৩ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন, ২৫ সালে ঐ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান ঢাকা কলেজ) থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯৩০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ¯œাতক সম্মান ও ৩১-এ প্রথম শ্রেণিতে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ¯œাতক পরীক্ষায় তাঁর প্রাপ্ত নম্বরের রেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেননি।
ঢাকায় শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতায় যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে প্রতিভা সোমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে তিনি প্রতিভা বসু নামে লেখক খ্যাতি অর্জন করেন। অধ্যাপনা দিয়ে বুদ্ধদেবের কর্মজীবনের শুরু। জীবনের শেষাবধি নানা কাজকর্মে যুক্ত থাকলেও শিক্ষকতাই ছিল তাঁর মূল জীবিকা। ইংরেজি সাহিত্যে অগাধ পান্ডিত্যের জন্য পরিণত বয়সে তিনি আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে সারগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৪-৪৫ সাল পর্যন্ত কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যাপনা করেন। বছর ছয়েক স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতার পর ৫২ সালে দিল্লি ও মহীশূরে ইউনেস্কোর প্রকল্প উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের পেনসিলভেনিয়া কলেজ ফর উইমেনে শিক্ষকতা করেন। এরপর দেশে ফিরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৬-৬৩ সাল পর্যন্ত তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি অজিত দত্তের সঙ্গে যৌথ সম্পাদনায় ১৯২৭-২৯ পর্যন্ত প্রগতি নামে মাসিক পত্রিকা বের করেন। এ সময় তাঁর কল্লোল গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কলকাতায় বাসকালে তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহযোগিতায় ত্রৈমাসিক কবিতা পত্রিকা ১৯৩৫ প্রকাশ করেন। পঁচিশ বছরেরও অধিককাল তিনি পত্রিকাটির ১০৪টি সংখ্যা প্রকাশ করে আধুনিক কাব্য-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তাঁর অনুপ্রেরণা ও নিয়ন্ত্রণে বাংলা কবিতা আধুনিক রূপ লাভ করে। ১৯৩৮ সালে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গ সম্পাদনা করেন।
বুদ্ধদেবের গদ্য ও পদ্যের রচনাশৈলী স্বতন্ত্র ও মনোজ্ঞ। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কাব্য ধারার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। কবিতার পাশাপাশি গদ্য শিল্পী হিসেবও বুদ্ধদেব সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। সমালোচনা সাহিত্য রচনায়ও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যে অধ্যায়কে বলা হয় ‘কল্লোল যুগ’ সেই অধ্যায়ের তরুণতম প্রতিনিধি ছিলেন বুদ্ধ দেব বসু।
তাঁর প্রথম যৌবনের সাড়া এবং প্রাক-প্রৌঢ় বয়সের তিথিভোর উপন্যাস দুটি ভিন্ন ধারার ছিল। তাঁর চল্লিশোর্ধ বয়সের রচনায় গ্রীক, ল্যাটিন, সংস্কৃত নানা চিরায়ত সাহিত্যের উপমার প্রাচুর্য দেখা যায়। তিনি ছিলেন আধুনিক কবিকুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা, নাটক, কাব্যনাটক, অনুবাদ, সম্পাদনী, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ, শিশু সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫৬। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার পাগুনে যে কজনার নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয় বুদ্ধদেব তাঁদের অন্যতম। কলকাতায় তাঁর বাড়ির নাম ছিল ‘কবিতা ভবন’ যা হয়ে উঠে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তীর্থস্থান। জীবনের শেষ ভাগে তিনি নাট্যকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইর মধ্যে অন্যতম তিথিভোর, বন্দীর বন্দনা, যেদিন ফুটল কমল, নির্জন সাক্ষর, শেষ পান্ডুলিপি প্রভৃতি।
এই সব্যসাচী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি বুদ্ধদেব বসু ১৮ মার্চ ১৯৭৪ সালে দেহত্যাগ করেন। আজ তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT