উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

জীবন থেকে নেওয়া

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:০৯:৪৭ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

শিশুটি কোর্টের বারান্দায় অঝর ধারায় কাঁদছে। বয়স বেশি হলে সাত অথবা আট বছর হবে। গত ১৯ মার্চ মঙ্গলবারের ঘটনা এটি। এই অবুঝ শিশুর বিলাপ দেখে তার পাশে যাই। গিয়ে জিজ্ঞেস করি তার সাথে থাকা একজন পুরুষ অভিভাবককে এই শিশুটি কাঁদছে কেন? তিনি উত্তর দিলেন শিশুটি তার বাবাকে হাত কড়া অবস্থায় দেখে কাঁদছে। কী অপরাধে তার পিতার হাতকড়া পরানো জিজ্ঞেস করতেই তিনি বল্লেন, তার কপাল খারাফ। সে যে সিএনজি অটোরিক্সায় যাত্রী হয়েছিল সেই সিএনজিতে ১০ বোতল ফেনসিডিল পাওয়া গেছে। আর সেই ফেনসিডিলের মামলায় অন্য তিন যাত্রীর সাথে শিশুটির পিতাও জেলে। সেই মামলার তারিখে কোর্টে আনা হয়েছে এই হতভাগা পিতাকে। আর সেই পিতাকে মায়ের সাথে দেখতে এসে বিলাপ করে কাঁদছে শিশুটি। আহারে, হৃদয়ে একটা হোচট খেলাম। আবার জিজ্ঞেস করলাম এই লোকটির পেশা কী? শিশুটির চাচা বল্লেন, সে অন্যের জমি বর্গাচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায়। সেদিন বিকেলে স্থানীয় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিতে উঠেছিলেন এই তার অপরাধ। এক সপ্তাহ হলো জেলে আছেন। বাড়িতে স্ত্রী আর দু’টি সন্তান রয়েছে। তাদেরকে নিয়ে অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার এনে কোটে দেখতে এসেছেন নিজের ভাইকে।
কোর্ট, উকিল, পেশকার, মরিল কোন কিছু সম্পর্কেই ধারণা নেই এই অসহায় পরিবারের। কিন্তু নিয়তির কী নিমর্ম পরিহাস পুলিশ সিএনজিটি আটকিয়ে ফেনসিডিল বহণকারী অন্য দু’জনের সাথে এই সাদাসিদে লোকটিকেও কোর্টে চালান দিল। অথচ সামান্য ন্যায়বিচার কিংবা সুষ্ঠু তদন্ত করলে পুলিশই এমন অসংখ্য লোককে সাহায্য করতে পারতো। তাদেরকে কোর্টের বারান্দায় আসতে হতো না। কিন্তু পুলিশ তা করে না। বরং তারা যেন আটক করলেই নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে পারলো। শুধুমাত্র এই একটি কারণে গ্রামগঞ্জের অসংখ্য নিরাপরাধ লোককে জেলের গ্লানী টানতে হয় তার হিসেব রাখে কে?
যে শিশুটি আদালতের বারান্দায় তার মায়ের পাশে বসে বিলাপ করে কাঁদিছিল এই ভেবে যে, হয়তো তার বাবাকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে মেরে ফেলবে। শিশুটিকে আদালত পাড়ায় নিয়ে আসাও কিন্তু এক ধরনের অপরাধ। কিন্তু শুধুমাত্র সচেনতার অভাবে এই বিষয়টি জানেনা এমন অসংখ্য অভিভাবক। এখনো এমন অজ্ঞ সমাজের বাসিন্দা আমরা। শিশুটির কান্না দেখে অসংখ্য লোক জড়ো হয়েছিলেন তার পাশে। সবারই জানার আগ্রহ ছিল কি অপরাধে আটক করা হয়েছে তার পিতাকে। আদালতে একবার প্রবেশ করলে পরে সেখান থেকে বের হওয়া খুবই কটিন। বিচার পক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সাহায্যকারীদের পোয়াভারোর কারনে অনেক দীর্ঘ সূত্রিতার সৃষ্টি হয়। বিচারের বাণী নিরবে কাঁদে এই বাক্যটির সাথে কিন্তু সেই ছেলে বেলা থেকেই পরিচিতি। আদালত পাড়ায় এখন যখন নিজে দেখি দীর্ঘ ৮/৯ বছর ধরে একেক একটি মামলা ঝুলে আছে তখন সেই নীতি বাক্যটির কথাই স্মরণ হয়।
আমি অবুঝ শিশুর কান্না আর আমাদের পুলিশ বাহিনীর কথা বলছি। পুলিশ সেদিন সিলেট জগিঞ্জ সড়কে যে সিএনজি অটোরিক্সাটি আটকিয়েছিল। সেটাতে ১০ বোতল ফেনসিডিল ছিল তা পুলিশ জানতো। আমার মনে হয় পুলিশ এটাও জানতো যে, কে বা কারা এই ১০ বোতল ফেনসিডিল এই অটোরিক্সাতে রেখে ছিল। আর তা না হলে অসংখ্য সিএনজি অটোরিক্সার মধ্যে পুলিশ টার্গেট করে এই অটোরিক্সাটিকে থামাতে যাবে কেন? সিএনজির তিন যাত্রীকেই পুলিশ আটক করলো এই ১০ বোতল ফেনসিডিলসহ। তারপর চালান করে দিল কোর্টে। আর কোর্ট থেকে জেল হাজতে। অথচ এই তিন যাত্রীর একজন শিশুদের পিতা। তিনি জানেনই না তার অপরাধ কী? কে ফেনসিডিল রাখলো সিএনজিতে। আর কেনইবা পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। আদালত চত্ত্বরে এই অসহায় পিতা হাতকড়া অবস্থায় পুলিশ বেষ্টনিতে থাকাকালে যখন দেখলেন তার অবুঝ শিশুটি অঝোর ধারায় কাঁদছে, তখন কিইবা করার ছিল তার। আহারে জীবন, এমন সব যাতনা নিয়েই চলছে আমাদের যাপিত জীবনের গল্প। যে গল্প আর শেষ হয়েও আর হইবে শেষ। চলতেই থাকবে অবিরাম। আর এসবের মাঝেই বসবাস আমাদের।
লেখক : সিলেট প্রতিনিধি, বার্তা সংস্থা টয়টার্স।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT