উপ সম্পাদকীয়

চোপড়া-জোলিরা কিসের বার্তা দিয়ে গেলেন?

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:১১:৩৫ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

গ্রামে আমাদের পাশের বাড়িতে আগুন লাগতে দেখেছি। সে এক ভয়াবহ চিত্র। গ্রামের মানুষ বালতি-কলসি নিয়ে ছুটে এসেছে। নদী থেকে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। গ্রামে ফায়ার ব্রিগেড নেই। এগুলোই ভরসা। আগুন লাগা বাড়ির লোকজন তাদের ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র বের করার চেষ্টা করছে। পাশের বাড়ির লোকজন তীক্ষèদৃষ্টি রাখছে তাদের ঘরে যেন আগুনের ফুলকি ছুটে না আসে। আর একদল লোক দূরে দাঁড়িয়ে আগুনের লেলিহান শিখার দৃশ্য দেখছে। কে জানে, কেউ কেউ হয়তো সে দৃশ্য দেখে দেখে আনন্দও পাচ্ছে। কিন্তু যার ঘর পুড়ছে সেই জানে তার অন্তরের জ্বালা। শুধু ঘরই নয়, পুড়ছে তার মন, সংসার, ভবিষ্যৎ।
আর বনের আগুন, মনের আগুন কতো রকমের আগুনইতো রয়েছে। বনের আগুন নেভানো যায় কিন্তু মনের আগুন? মনের আগুন ধুকে ধুকে জ্বলে। সওয়া যায় না, কওয়া যায় না। তোষের আগুনের মতোই জ্বলে। ছোট্ট ভুখন্ড জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত এই যে বাংলাদেশ তার ওপর চেপে বসা রোহিঙ্গা সমস্যা সেকি এক বিচিত্র ধরনের আগুন নয়? রোহিঙ্গা আগুনের জ্বালা সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না কিন্তু সহ্য করতে হচ্ছে। আর রোহিঙ্গা আগুনের লেলিহান শিখার দৃশ্য অবলোকন করছে বিশ্বের দেশ সমূহ, কেউ কাছে এসে কেউ দূরে দাঁড়িয়ে। নিরাপদ দূরত্বে সবাই। কারো গায়ে যেন এ আগুনের তাপ নাহি লাগে। আর এ দহন জ্বালা তিলে তিলে অনুভব করছে দুর্ভাগা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আর এ আগুনে দগ্ধ হচ্ছে প্রকৃতির লীলাভূমি কক্সবাজার। এর বনভূমি। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সমগ্র কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের। বাড়তি জনসংখ্যার চাপে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ। এর সামাজিক শান্তি বিঘিœত হচ্ছে। উজাড় হচ্ছে বনভূমি। শ্যামল-সবুজে মরুভূমির হাতছানি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সবাই সবকিছু জানেন-বুঝেন, চেয়ে চেয়ে দেখছেন আক্রান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি।
লাখ লাখ রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশের এমনি অবস্থা দেখতে কতোজন এলেন, গেলেন সে হিসেবটা রাখাই আজ কঠিন। তারা এলেন-গেলেন, উভয় পক্ষের মন জয় করলেন। কিন্তু সমস্যার সমাধানটা দূরে বহু দূরেই রয়ে গেল। আমাদের অবস্থাটা যেন হৈমন্তি শুক্লার সেই বিখ্যাত গানের কলি ‘তুমি চলে গেলে, চেয়ে চেয়ে দেখলাম, আমার বলার কিছু ছিল না।’ এমনিভাবে একদিন এলেন জাতিসংঘের দূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখলেন। হয়তো বা সেদিন তার মাতৃত্ব নীরবে কেঁদেও ছিল। যাবার বেলায় তিনি বলেছিলেন-‘আবার আসবো’। যতটুকু মনে পড়ে, এ প্রসঙ্গে ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ এ একটি নিবন্ধ লিখে বলেছিলেম ‘প্রিয়াঙ্কা চোপড়া’ বাংলাদেশে আপনি বার বার আসুন কিন্তু বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের দেখতে নয়; ওরা মিয়ানমারে ফিরে গেলে সেখানে তারা কেমন সুখে থাকে সেটা জানাতে বার বার বাংলাদেশে আসুন। অবশ্য আমাদের মতো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র মানুষের এমন আহবান তার কানে পৌঁছার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও নেই।
বলিউড থেকে এবার হলিউড। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে বাংলাদেশে এলেন হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তিনি শুধু অভিনেত্রীই নন, তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূতও বটেন। তিনি জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআরের বিশেষ দূতই হোন বা হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রীই হোন সকল পরিচয় ছাপিয়ে তিনি কিন্তু সর্বাগ্রে একজন নারী, মায়ের জাতির সদস্যা। তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে রোহিঙ্গা নারীদের সুখ-দুঃখ-বেদনা-অত্যাচার-নির্যাতন-খুন-ধর্ষণের অমানবিক নানা দৃশ্য দেখে ব্যথিত হবেন সেটাই স্বাভাবিক। এবং সেটাই করলেন। তারপর পত্রিকার পাতায় খবরের শিরোনাম দেখলাম ‘শেখ হাসিনার প্রশংসায় জোলি’। ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলির প্রশংসা-বিশ্বে দৃষ্টান্তকারী নেতা শেখ হাসিনা।’ আমরা জানলাম রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় তিনি মিয়ানমারের নাগরিকদের উপর চালানো হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন কাহিনী শুনেছেন। সেতো পুরানো কথা। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তো আসলে কারো কাছ থেকে প্রশংসা কুড়ানোর জন্য এই এগারো লাখ রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেননি। একান্ত মানবিক দিক বিবেচনা করেই তা করেছেন। প্রশংসা তো সবাই করছেন। কিন্তু এই প্রশংসার মধ্যেতো সমস্যার সমাধান নেই। সমাধান তো রোহিঙ্গাদেরকে সসম্মানে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া। সত্যিকার প্রশংসা তো ঐখানেই। কিন্তু ঐ কাজটি তো কেউ করছেন না। আর এই মানবিক দায়িত্ব পালন করা কী শুধু বাংলাদেশের? শেখ হাসিনার? এমনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে অবশ্যই। বাংলাদেশে এসে জাতিসংঘ মহাসচিবের মানবিক দূত আহমদ আল মেরাইখি এ প্রসঙ্গে যথার্থই বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে শুধু মানবিক সহায়তাই নয়, রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। প্রশ্ন আসে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যদি এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান আন্তরিকভাবে সবাই চাইতেন তাহলে এতোদিনে এর সমাধান হচ্ছে না কেন? মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কি এতোই শক্তিশালী? এসব প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সত্যিকার সমাধান।
যে যত কথাই বলুন না কেন, রোহিঙ্গারা কবে মিয়ানমারে ফিরে যাবে বা কখনো ফিরে যাবে কিনা কেউ বলতে পারছে না। কখনো কখনো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার ভান করে কিন্তু আসলে ওরা রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফিরতে নানা কৌশলে বাঁধার সৃষ্টিই করে যাচ্ছে। কারো কথাই তারা আমলে নিচ্ছে না। তাদের কাজকর্মের মধ্যেই এর প্রমাণ মেলে। মিয়ানমার থেকে বিতারিত রোহিঙ্গারা তাদের যে সমস্ত বসতভিটা ফেলে এসেছে সেখানে মিয়ানমার সরকার নানা কৌশলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নাকি সাড়ে ৯ লাখ একর জমি বাজেয়াপ্ত করেছে মিয়ানমার। আর অত্যাচার নির্যাতনের নতুন মাত্রা তারা সংযোজন করছে। এ ব্যাপারে ৯ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ একটি লাল লাল অক্ষরে শিরোনাম লিখে ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন রাখাইন থেকে বৌদ্ধ হিন্দু শরণার্থী আসছে বাংলাদেশে।’ বৌদ্ধদের দেশ থেকে বৌদ্ধদেরকে তাড়ানো হচ্ছে এর অর্থ কি। এর উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত করা। বিশ্ব সম্প্রদায়কে তারা বুঝাতে চাচ্ছে তাদের অভিযান শুধু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নয় সকল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। এতে করে তারা সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অনিশ্চয়তার মুখেই ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গুপ্তচরের দল নানাভাবে সক্রিয় হচ্ছে। বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এমনি অবস্থায় নাকি আন্তর্জাতিক সংস্থা পরামর্শ দিচ্ছে রোহিঙ্গাদেরকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের এবং স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সখ্য বৃদ্ধির। এতে করে কি বুঝা যায় যে কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা চাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা ফিরে যাক?
১৫ জানুয়ারি দৈনিক ভোরের কাগজ অভিমত দেয় যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই ৭ কারণে। শুধু তাই নয়, একাধিক কারণও রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো-বিপুল হারে ত্রাণসামগ্রী পাওয়া, বাংলাদেশে বসবাসে ও চলাচলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, দেশি-বিদেশি এনজিওদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করা, রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া, পরিচয় গোপনে রেখে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ যাওয়ার সুবিধা থাকা এগুলোই অন্যতম কারণ। রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলে তারা নাকি সব ধরনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। উখিয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি হামিদুল চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, এনজিও দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা যুগের পর যুগ জিইয়ে রেখে ব্যবসা করতে চাইছে। এদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ার কারণ হিসেবে কক্সবাজারের বিশিষ্টজনরাও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও এনজিওদের নেতিবাচক প্রচারণাকে দায়ী করছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক এবং হতাশার বিষয়টি হলো জাতিসংঘের ইউএনএইচপিআরও নাকি প্রত্যাবাসনের বিরোধিতা করছে।
এখন প্রশ্ন হলো উপরোক্ত অভিযোগগুলোর বিন্দুমাত্রও যদি সত্য হয় তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যার কী সমাধান সহসা আশা করা যায়? সরিষার ভূত কী সরিষা তাড়াতে পারে? এমনি অবস্থায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বা আরো অনেকের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগমন কিসের বার্তা বহন করে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দায় কি শুধুই বাংলাদেশের? বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কি দায় এড়াতে পারেন? বিশ্বের সবাই তো মানব সন্তান। মানবিক গুণ শুধু বাংলাদেশেরই থাকবে, অন্যরা মানবিক গুনে ঋদ্ধ হবেন না সেকি কভু হয়?
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা কলামিস্ট সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT