সাহিত্য

বিষটোপ

মোঃ ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:১৪:০৫ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

মুক্তিযোদ্ধা সজল রণাঙ্গনে। পাহাড়ে পর্বতে, শুকনো নদী, খাল-বিলের গর্ভে। আমতলায়, জামতলায়, ঝোপ-ঝাড়ে, খোলা আকাশের নীচে। সবুজ ঘাসের নরম বিছানায়। কখনও ঘুমিয়ে, কখনও রাত জেগে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান, নাটক ও কৌতুক শুনে অধিকাংশ সময় কাটে। সরাসরি কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের এখনও হয়নি। যখন তখন একটা যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা। সামনে তাদের দলের শক্তির অগ্নি পরীক্ষা। বিশাল বনের ওপারে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান। সজলদের ক্যাম্প কমান্ডার বিশাল এ বনের একটা ম্যাপ নিয়ে খুব গবেষণা করছেন। পাক আর্মিদের সঠিক আস্তানার অবস্থান নির্ণয়ে চেষ্টা করছেন। রাতে পাক সেনারা ভয়ে ভয়ে বের হয়। তারাও মুক্তিবাহিনীর সংবাদ নেয়ার চেষ্টা করছে।
কমান্ডার সজলকে আড়ালে ডাকলেন। সজল তাদের দলের সবচেয়ে কম বয়েসী মুক্তিযোদ্ধা। বয়সের তুলনায় তার সাহস একটু বেশি। অস্ত্র চালনায়, বুদ্ধিমত্তায় সজল অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ক্যাম্প কমান্ডার সজলকে বললেন, গাছ সেজে আজ সারা রাত তোমাকে ওই বড় বট গাছটায় ডিউটি করতে হবে। সজল কমান্ডারের কথা কিছুই বুঝল না। সে জিজ্ঞেসু চোখে কমান্ডারের দিকে তাকাল। কমান্ডার মৃদু হেসে বললেন, গাছের পাতার রঙের পোষাক পরে গাছে বসে থাকবে। সারা রাত গাছে বসে থেকে আমি কি করব? সজল বিনয়ী সুরে কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করল। ক্যাম্প কমান্ডার সজলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, পুরানো এ বট গাছটি তিনটি মেঠো পথের মুখে। পাক সেনা ও রাজাকারের দল এ রাস্তাগুলো দিয়ে চলাফেরা করে। গাছের নীচে বসে আড্ডা দেয়। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণের শলাপরামর্শ করে। আজরাতে পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধানে এলাকা চষে বেড়াবে। মুক্তিবাহিনীদের ক্যাম্পের অবস্থান জানতে তারা নিশাচরের মত ঘুরে ফিরবে। সুযোগ সন্ধান পেলেই ক্যাম্প আক্রমণ করবে। তোমার দায়িত্ব হলো সারা রাত গাছে বসে পাক হানাদার বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করা। গাছতলায় বসে কী পরিকল্পনা করে তা শুনা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি নিখুঁতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে। জ্বী স্যার। নিশ্চয় পারব। সজল আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল।
সন্ধ্যারাতে বট গাছে ওঠার আগে কমান্ডার তার দেহ তল্লাসী করেন। তাজা গাছ পাতা রঙের কোট পেন্টের পকেট থেকে সব জিনিসপত্র তিনি নিজের কাছে নিয়ে নেন। তার পকেটে ভরে দেন একটি বিষটোপ। নির্দেশের সুরে বলেন, ধরা পড়া নিশ্চিত হলে ওদের সামনে বিষটোপ খেয়ে হাসতে হাসতে মরবে। সম্ভব হলে লড়াকু বীরের মত লড়তে লড়তে শহীদ হবে। ওদের হাতে ধরা পড়লে তোমাকে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে মারবে। চরম নির্যাতনের মুখে মুক্তিবাহিনীর গোপন আস্তানার ঠিকানা বলানোর চেষ্টা করবে। তাই সাবধান। কখনও পাক আর্মিদের হাতে ধরা দিবে না। কমান্ডার সজলের সাথে আবেগে আলিঙ্গন করেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন।
পরক্ষণে কঠিন কন্ঠে বলেন, ‘সজল গাছে ওঠ। মগডালের ওই ছোট ছোট ডালপালার মাঝে লুকিয়ে থাক। সজল স্পষ্ট বুঝতে পারে আজই তার জীবনের হয়ত শেষ রাত। ধরা পড়লে সীমাহীন যন্ত্রণায় মৃত্যু। নয়ত বিষটোপ খেয়ে মরা। সজল একটা ঘোরের মাঝে পড়ে যায়। তার মায়ের কথা মনে পড়ছে। ছোট ভাইবোনদের অসহায় কচি মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মরার আগে বিধবা মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করতে পারলে শান্তিতে মরা যেত। একটু একটু করে অনেক কথামালায় মাকে লেখা চিঠিটা পকেট থেকে কমান্ডার নিয়ে গেছেন। সে মারা গেলে কমান্ডার নিশ্চয় চিঠিটা তার মার কাছে পৌঁছাবেন। মা চিঠির শেষ অংশ পড়ে ঢুকরে কেঁদে ওঠবেন। সজল নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তার চোখ হতে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
ক্যাম্প কমান্ডার কঠিন কন্ঠে বললেন, ‘সজল তুমি কী ভয় পাচ্ছ। তুমি সাহস হারালে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেব। যুদ্ধের ময়দানে চোখের পানি মানায় না।’
কমান্ডারের কড়া কথা কানে বাজতেই সজলের ঘোর কেটে যায়। চোখের পানি মুছে সে সাহসের সুরে বলে, মা-মাটির জন্যে আমি সব সময় মরতে প্রস্তুত। সজল কমান্ডারকে সামরিক কায়দায় স্যালুট দেয়। কালবিলম্ব না করে সে ঝড়ের বেগে গাছে ওঠে পড়ে। ঘন পাতায়বেষ্টিত একটা ডালে নির্ভীক বীরের বেশে চুপচাপ বসে থাকে।
মাঝ রাতে তার ঘুমঘুম ভাব হয়। হঠাৎ বুটের মছমছ শব্দ। শব্দ শুনে সে কান খাড়া করে। ফিসফিস করে পাকিস্তানি আর্মিরা উর্দুতে কথা বলছে। বনের মেঠো পথ ধরে তারা বট গাছটার দিকে এগিয়ে আসছে। একজন রাজাকার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে কথা বলছে। ঘুটঘুটে আঁধার রাতে চোখের সব শক্তি প্রয়োগ করে সজল পাক সেনাদের দেখার চেষ্টা করে। গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক ধরনের অস্পষ্ট ছায়া মূর্তি। নিরস্ত্র সজল। তার শরীর শিউরে ওঠে। গা ছমছম করছে। হাত পা একটু একটু কাঁপছে। সে নিজেকে শক্ত করে। পকেটে লুকিয়ে রাখা বিষটোপে হাত বুলিয়ে সজল এর অস্তিত্ব অনুভব করে। মৃত্যু এত কাছে ভেবে সজল অবাক হয়। একটা অস্ত্র থাকলে ওদের সাথে যুদ্ধ করে মরলে ভাল লাগত। কমান্ডার কেন যে তাকে নিরস্ত্র করে ডিউটি দিলেন সে তা বুঝে ওঠতে পারছে না। আবার সুযোগ হলে লড়াকু বীরের মত লড়তে লড়তে মরার কথা বলেছেন।
দুই রাজাকার ও পাক সৈন্যরা বট গাছতলায় বসে। তারা শলাপরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয়। রাত পোহালেই বনের শেষ প্রান্তে মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে আক্রমণ করবে। সজল তাদের সিদ্ধান্ত শুনে ভাবনায় পড়ে যায়। কেমন করে ক্যাম্পে খবর পৌঁছানো সম্ভব সে বুঝে ওঠতে পারছে না। কিন্তু খবর তাকে পৌঁছাতে হবে।
সজল সাবধানে ধীরে ধীরে পা ফেলে গাছ হতে নামতে শুরু করে। অর্ধেক নেমে সে চুপ করে বসে পড়ে। সে ভাবে ভূত সেজে ওদের ভয় দেখালে কেমন হয়। পাকিস্তানি আর্মিরা ভূতটুত বিশ্বাস করে কিনা সে জানে না। ভূত ভেবে ওরা যদি বন্দুক তাক করে। গুলি ছুড়ে। এ মৃত্যু হবে কাপুরুষের ম। সজল আরও একটু নীচে নেমে দেখল প্রায় পনব জনের একটি দল। ভারি অস্ত্রসস্ত্র সাজে সজ্জিত।
সকালে যুদ্ধ শুরু হবে। আগেভাগে সতর্ক না করলে তাদের দলের পরাজয়ের সম্ভাবনা। সজল অতি সাবধানে গাছের গোড়ার কাছে চলে আসে। পাক আর্মিদের সাথে তার মাত্র কয়েক হাত ব্যবধান। যে কোন মূল্যে তাকে ক্যাম্পে খবর পৌঁছাতে হবে। আর্মিদের চোখে ফাঁকি দিয়ে অন্ধকার রাতে ক্যাম্পে সে কেমন করে যাবে। কিন্তু যেতে তাকে হবেই।
পাক বাহিনী টের পেলে গুলি করে তার বুক ঝাঝরা করে ফেলবে। ধরা পড়লে তার চামড়া ছিলে লবণ মরিচ লাগাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য জানার জন্যে। নয়ত বিষটোপ গিলে মরে যাওয়া। মৃত্যুর সাথে মুহূর্তের মাঝে তার আলিঙ্গন হতে পারে। এ সত্য জেনেও সজলের এখন মোটেই ভয় করছে না। তার সাহস বহুগুনে বেড়ে যায়। রাত পোহাবার পূর্বেই সে তার কমান্ডারের কাছে পৌঁছতে চায়। তার হাতে সময় কম। ঘন বনের পাখিগুলো কিচিরমিচির শব্দ করে শেষ রাতের জানান দিচ্ছে। একটা পাখি করুণ সুরে ডাকছে। কয়েকটা শেয়াল হুক্কা হুয়া রবে ডেকে ওঠে। একটা অচেনা জন্তু কষ্টের কান্না শুরু করে। পুরো বনে নিরবতা নেমে আসে। বনের সব পশুপাখিগুলো নিরব নিস্তব্ধ। সজল এমন অবস্থায় জোরে শ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু বিলম্বে মুক্তিবাহিনীর মহাবিপদ হতে পারে।
সজল সাবধানে গাছ হতে নেমে যায়। কেউ টের পায়নি। পাক সেনারা গাছের গোড়ার এক পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। সজল গাছের বিপরীত দিকে বসে ভাবছে। সে কী দৌড়ে যাবে। না কী ধীর পায়ে হেঁটে যাবে। কিন্তু তার হাতে ভাবনার সময় নেই। সজল পা ফেলে সতর্ক হয়ে। তার পা পড়ে শুকনো পাতার উপর। শুকনো পাতার মরমর শব্দ শুনে পাক সেনারা সজলকে দেখে ফেলে। একজন সৈনিক ঝাপটা মেরে সজলকে ধরে ফেলে। সজল তার সব শক্তি প্রয়োগ করে সৈনিকের নাকে একটা ঘুষি মারে। তাকে ছেড়ে ছিটকে পড়ে যায় পাক সেনা। সজল দৌড় দেয় ক্যাম্পের দিকে। পেছন থেকে একজন তাকে টেনে ধরে। সজল তার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করে। আরও কয়েকজন তাকে ধরে। সে তাদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
সজল বুঝে যায় সে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে গেছে। বিষটোপটা নেয়ার জন্যে সে পকেটে হাত ঢোকায়। সজল বিষটোপ ছুতে পারে না। একজন রাজাকার গাছের চিকন লতা ছিড়ে তার দুই হাত পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT