সাহিত্য

হারিয়ে যাওয়া বাবা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৩-২০১৯ ইং ০০:১৪:৪৫ | সংবাদটি ৫৯ বার পঠিত

জীবনের প্রথম পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আনন্দে ধরে না জামালের। ষান্মাসিক পরীক্ষায় ১ম হয়েছে সে। গ্রামের ছোট্ট পাঠশালার ক্ষুদে ছাত্র জামাল। মায়ের শেখানো অক্ষরগুলো হুবহু শ্লেটে লিখেছিল সে। বাংলা-ইংরেজী বর্ণ শতকিয়া মুখস্থ হয়ে গেছে। উল্টাপাল্টা যেভাবে ধরান- সে ঠিকই বলে দেয়। মা দেখেন অত্যন্ত মেধাবী ছেলে জামাল। ওর উপর ভরসা করেন। একদিন ছেলে বড় না হয়ে পারে না।
ফলাফল শুনে ক্লাস থেকে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এলো জামাল। মা রাজিয়া স্কুল আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেলে আসতে দেখে এগিয়ে গেলেন তিনি। জামাল দৌড়ে এসে মায়ের কোলে ঝাপ দিল। আর বলল মা আমি প্রথম হয়েছি। শনিবারে মা-বাবা দু’জনকেই স্কুলে আসতে বলেছেন বড় স্যার। হঠাৎ জামালের মনে পড়ল বাবা কোথায়? মাকে ধরল- ‘মা তুমি না বললে বাবা চাকরিতে গেছে। ফিরে আসবে। কত দিন হয়ে গেল। একটা দিনও বাবাকে দেখলাম না। বাবার কি আমার জন্য কোন মায়া নেই? একটি বারও আমার কথা মনে পড়ে না?
মা রাজিয়া আঁচলে মুখ ঢাকেন। চোখের পানি মুছে বলেন তোর বাবা মিলিটারির লোক। সরকার ওকে ছুটি দেয় না। যখন ছুটি দেবে ঠিকই চলে আসবে। জামাল মনে মনে সরকারকে গালি দেয়। দূর সরকারের সরকার। আমার বাবাকে আটকে রেখেছে। না হয় এত দিনে চলে আসত। জান মা আমি বড় হলে ঠিকই বাবাকে ধরে নিয়ে আসব। সরকারকে মারবো। আচ্ছা মা মিলিটারি কী? মায়ের কোলে ঝুলতে ঝুলতে প্রশ্ন করে সে।
-মিলিটারি হলো আর্মি বুঝলে?
-হ্যাঁ। কিন্তু আর্মি কী?
-ঐ যে আমাদের দেশ আছে না? বাংলাদেশ।
এই দেশকে রক্ষা করার জন্য বা শত্রুর আক্রমণ হতে বাঁচানোর জন্য যারা দেশ পাহারা দেয় তারা আর্মি। এই যেমন ধরো তোমাদের স্কুলের তপু ভাই। স্কুলে যখন কেউ থাকে না তখন স্কুল পাহারা দেয়। ঠিক একইভাবে আর্মিরা দেশ পাহারা দেয়।
কিন্তু দিনেতো স্কুলে সব থাকে। আমরা থাকি, স্যারেরা থাকেন। তাহলে তপু ভাই পাহারা দেয় কেন?
জামাল ছোট হলেও কথা বলতে উস্তাদ। একটা কথার পিঠে আরেকটা কথা বলতেই থাকে। মা বিরক্ত হয়ে বললেন-
-আচ্ছা বাবা আচ্ছা। কাল আবার তোমাকে বুঝিয়ে বলব। এবার একটু নামো। হেঁটে যেতে পারবে না?
-হ্যাঁ। পারিতো। তুমি তো আমাকে হাঁটতে দাও না।
জামাল মায়ের হাত ধরে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।
১৯৭১ সাল। ই.পি.আর জোয়ান নূরুল হক গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসেছেন। সিলেটের বালাগঞ্জের খাগদিওর গ্রাম। ছায়াঢাকা, পাখি ডাকা, ঘন সবুজ বেষ্টিত শান্ত গ্রাম সেটি। একে অন্যের প্রতি রয়েছে অগাধ ভালবাসা আর মমতা। গ্রামের ছেলে, বুড়ো সকলে নূরুল হককে ভালবাসে। ও তাদের গর্ব- তাদের অহংকার। পাকিস্তান মিলিটারির যোগ্য সৈনিক। ওদের গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে নূরুল হক। তাই সবারই একটা সমীহ ভাব।
নূরুল হক তার পরিবারকে ভালবাসেন। ভালবাসেন স্ত্রী-সন্তানকে। ইতোমধ্যে পাঁচ পাঁচটি সন্তানের গর্বিত জনক তিনি। ছুটির দিনগুলো স্ত্রী সন্তান নিয়ে খুব আনন্দে কাটছিল তার। হঠাৎ তারবার্তা এলো। ঢাকায় গন্ডগোল শুরু হয়েছে। নূরুল হককে চাকরিতে যোগদান করতে হবে। নূরুল হকের যেতে মন চায় না। স্ত্রী ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন তাকে মায়ার জালে বন্দী করেছেন। তবুও কর্তব্যের খাতিরে ছুটলেন তিনি। মায়ার বাঁধন ছিড়ে প্রিয়তমা স্ত্রীকে রেখে ছুটলেন তিনি। যাওয়ার সময় স্ত্রী, সন্তানকে জড়িয়ে আদর করলেন। আর বললেন, ‘রাজিয়া আমার বাচ্চাদের তুমি দেখে রেখো। খুব শীঘ্রই ফিরবো। দোয়া কর আমার জন্য।’
রাজিয়া অশ্রুভেজা চোখে স্বামীকে বিদায় দিলেন। আর বললেন শীঘ্রই এসো। আমার পেটে তোমার ষষ্ঠ সন্তান।
নূরুল হক সেই যে গেলেন- আর কোন খবর নেই। তখনতো আর মোবাইলের যুগ ছিল না। ল্যান্ড ফোনও ছিল খুব কম। সমস্ত এলাকার মধ্যে একটি মাত্র ফোন ছিল পোস্ট অফিসে। আর জরুরী হলে টেলিগ্রাম/তারবার্তা পাঠানো হতো। আর সব যোগাযোগ চলতো চিঠির মাধ্যমে। রাজিয়া বেগম ট্রানজিস্টারের মারফত জানলেন- বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধ চলছে। তার সৈনিক স্বামীর জন্য দুশ্চিন্তায় পড়লেন। স্বামীর ঠিকানায় একটার পর একটা চিঠি পাঠালেন। কোন উত্তর নেই। তখনকার ডাক ব্যবস্থাটাও ছিল মান্দাতার আমলের। ঢাকা থেকে চিঠি আসতে সপ্তাহ দশদিন লেগে যেতো। ডাক পিয়ন বাজারে বাজারে চিঠি বিলি করত। প্রতি সপ্তাহে সোম ও শুক্রবারে গ্রামের হাট বসত। রাজিয়া বেগম বড় ছেলেকে হাটবারে পাঠাতেন চিঠির জন্য। সদরুদ্দিন প্রতি হাটবারেই খালি আসত। কোন চিঠি নেই, নেই কোন সংবাদ।
দিন যায় মাস যায়। রাজিয়া বেগমের চোখের পানি ঝরে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না। চারিদিকে যুদ্ধের ঘনঘটা। এই এখানে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করেছে- এই এখানে মুক্তিবাহিনী ব্রীজ উড়িয়ে দিয়েছে- এই আদিত্যপুরে লাইন ধরে হিন্দু মেরেছে, এই শ্রীরামসীতে হিন্দু বধ অনুষ্ঠিত- এভাবে লোকমুখে অনেক কাহিনী রাজিয়া বেগমের কানে আসে। কোথাও কোথাও পাকিস্তানি আর্মি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের ধরে নিয়ে গেছে- এরকম সংবাদ আসতে থাকলো। রাজিয়া বেগমের পেটে সন্তান বড় হতে থাকে। উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় দিন কাটে। রাতের ঘুম অনেকখানি হারাম হয়ে গেল। রাজিয়া বেগম রাতে ঘুমাতেন না। কখন বুঝি তার স্বামী এসে দরজায় কড়া নাড়ে। একটু আশ্রয় একটু খাবারের জন্য হয়তো তিনি ছুটে বেড়াচ্ছেন। কী তার কষ্ট! রাতদিন নামাজ পড়ে স্বামীর জন্য দোয়া করতে লাগলেন। ‘আল্লাহ আমার স্বামীকে ভালো রেখো। হায়াত দারাজ করে দাও।’ যতো দিন যায় ততো উদ্বিগ্নতা বাড়ে। অতি কষ্ঠে ছেলে মেয়ে নিয়ে দিন কাটান রাজিয়া বেগম। নূরুল হকের চলে যাওয়ার প্রায় নয় মাস অতিবাহিত হলো। কোন খবর নেই। কেউ বলে বেঁচে আছে, কিন্তু যোগাযোগ করতে পারছে না। কেউ বলে পাকিস্তানি আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলে যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। কিন্তু সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারে না। রাজিয়া বেগম অপেক্ষা করতে করতে প্রহর শেষ হয় না। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি গেলো শুকিয়ে। এখন কান্নাও আসে না। হৃদয় পাষাণে বেঁধে স্বামীর পথ চেয়ে রইলেন......।
দেখতে দেখতে এলো ১৬ই ডিসেম্বর। বাংলাদেশ অর্জন করল চূড়ান্ত বিজয়। অর্জিত হলো স্বাধীনতা। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেল। যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের খবর আসতে লাগলো। আর যারা বেঁচে ছিলেন তারা লাল সবুজের পতাকা নিয়ে বীর দর্পে ঘরে ফিরলেন। রাজিয়া বেগম ঘরে বসে প্রহর গুনতে থাকেন এই বুঝি তার স্বামী এলো বলে.....। এটা সেটা কত কী রান্না বান্না করেন- অনেক কষ্ট করে। আর কষ্ট হবেই তো তিনি সন্তান সম্ভবা। নিজের দেহ নিয়েই চলাফেরা বড় কষ্ট, তার উপর সংসারের ঘানি। তারপরও মনে মনে একটু খুশীই হন। এখনতো আর ঘরে ফিরতে কোন বাধা নেই; যুদ্ধ নেই, সরকারি বাধ্যবাধকতা নেই। নূরুল হক অবশ্যই ফিরবে। সে আমাকে অনেক ভালবাসে। ভালবাসে তার পুত্র কন্যাকে। সে না এসে পারেই না......।
ডিসেম্বর ৭১ পেরিয়ে ৪ জানুয়ারি ১৯৭২। ঘর আলো করে এলো এক পুত্র সন্তান। রাজিয়া বেগম নাম রাখলেন জামাল। মানে সুন্দর। যার ভ্রুণ প্রোথিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঙালিরা ছিল আবদ্ধ। জামাল এলো স্বাধীন বাংলাদেশে। লাল সবুজের পতাকা হাতে। তাইতো সে নিঃসংশয়, নিঃসংকোচ। কেমন যেন ইঁচড়ে পাকার মত। বয়স কম কিন্তু কথা বলে পাকা পাকা। আর আধো আধো বোল নয়- ‘একেবারে কড়কড়ে : নতুন কড়কড়ে নোটের মত......।
বোধ হওয়ার পর থেকেই জামাল বাবাকে খোঁজে। এতদিন এটা সেটা বলে প্রবোধ দিয়ে রেখেছিলেন; এখন আর সে মিথ্যা বুলি মানতে চায় না। মাকে প্রশ্ন করতে করতে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। দিনে দিনে জামাল বড় হয়। ভাইবোনেরা বিয়ে শাদি করে। সেও মেট্রিক পাশ করে ভর্তি হয় শহরের নাম করা মদনমোহন কলেজে। এখনও সে বাবার কোন সন্ধান পায় না। এখন আর মাকেও প্রশ্ন করে না। মনে মনে ভাবে বাবা যদি সত্যিই মিলিটারি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের সদর দপ্তরে ছবি থাকবে। কিন্তু অনেক চেষ্টা তদবির করেও সে ছবি বা ফাইলের কোন খোঁজ বের করতে পারল না। তবে সে হালছাড়ার পাত্র নয়। লেখাপড়া শেষ করে সে পাড়ি জমালো বিলাতে। টাকা পয়সার সমস্যাও শেষ হয়ে গেল। ক্ষমতা অর্থ সবই ধরা দিল তার।
দীর্গ ৪৮ বছর পর। জামাল এখন মধ্য বয়সী। একাত্তরের চেতনায় উজ্জীবিত একজন রাজনৈতিক নেতা। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ঘাদানিকের নেতা তিনি। তার অব্যাহত প্রচেষ্টা চলতে থাকে। ২৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার ২০১৯। সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, ব্রিগেডিয়ার লুৎফুর রহমান ও কর্নেল রশীদের সহায়তায় বের হয়ে এলো পিলখানার বিজিবি সদর দপ্তর হতে অর্ধ শতাব্দী প্রাচীন ফাইল। জামাল দেখলেন তার বীর পিতার অবয়ব। দু’চোখ ভরে পানি এলো তার। দু’হাতে চোখ বন্ধ করে বসে পড়লেন তিনি। বুকটা গর্বে ফোলে উঠল তার। ভাইবোনসহ সমস্ত দেশবাসীকে তার পিতার ছবিটি পোস্ট করে দিলেন। মুখে গর্বের হাসি.......।
পিতার বীরত্ব গাঁথা গল্প বেরিয়ে এলো। নূরুল হক বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েই দেশের জন্য নবগঠিত মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। অসীম বীরত্বের সাথে সম্মুখ সমরে নেমে পড়েন। প্রথমে তিনি শেরপুরে যুদ্ধ করেন এবং পরে মে মাসে সিলেট ক্যাডেট কলেজে স্থাপিত পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্প আক্রমণ করেন এবং এখানেই শহীদ হয়ে যান (ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহী রাজিউন)। একটি গণকবরে এখানেই তাঁর ঠাঁই হয়? বাংলার মাটির সাথে মিশে আছেন নূরুল হক.......
একদিন জামাল পিতার কবরের পাশে একাকী হাজির হলো। মনের যত ক্ষোভ, যত অভিমান সবই ঝেড়ে ফেলে জামাল পিতার পায়ের পাশে বসল। বলল ‘বাবা তুমি চলে গেছো- এ যাওয়া বড়ই বীরত্বের। তোমার কীর্তি দেখে আজ আমি অভিভূত। আমার দেহে বইছে তোমার মত বীরের রক্ত। দোয়া কর আমরা যেন তোমার মতই বীরের মত মরতে পারি। মনের অজান্তেই প্রার্থনা বেরিয়ে এলো- ‘হে আল্লাহ আমার বাবাকে রহম কর শহিদী দরজা দাও.......।
মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছিল জামাল। তখন পূর্বাকাশে লাল সূর্য উদিত হচ্ছে............।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT