উপ সম্পাদকীয়

একজন মারুফ জামানের ফিরে আসা

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৩:৩৫ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

সবুজ ঘাসের দেশ যখন / সে চোখে দেখে দারুচিনি / দ্বীপের ভিতর; তেমনি দেখেছি / তাঁরে অন্ধকারে, বলেছে সে / এতদিন কোথায় ছিলেন?
জীবনানন্দ দাশ-এর ‘বনলতা সেন’ কাব্যের এই পঙক্তিগুলো মনে পড়লো গত ১৯ মার্চ জাতীয় দৈনিকের একটি খবর পড়ে। একজন মারুফ জামান যিনি পেশায় সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। নিখোঁজের পনের মাস পর তাঁর ফিরে আসাটা স্বজন ও পরিবারকে যেমন বিস্মিত করেছে, তেমনি আমাদেরও বিস্ময় ও কৌতুহল বাড়িয়ে দিয়েছে। চলুন জনাব মারুফ জামান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।
২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানী ধানমন্ডির বাসা থেকে ছোট মেয়ে সামিহা জামানকে আনার জন্য বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে জনাব মারুফ জামান অপহৃত হয়েছিলেন। বিমানবন্দরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মারুফ জামান বের হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মাত্র কিছু সময় পর জানা যায়, তিনি বিমানবন্দরে যাননি এবং কয়েক ঘন্টা পর তাঁর বাসার ল্যান্ড ফোনে তিনি জানান যে, কয়েকজন লোক বাসায় গেলে যেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলো দিয়ে দেন। তারপর কালো টি-শার্ট পরা সুদর্শন তিন ব্যক্তি তাঁর বাসায় এসে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ প্রতিটি প্রযুক্তি ব্যবহারের জিনিসগুলো নিয়ে যায় এবং নাটকীয়ভাবে তিনি ফিরে আসেন ৪৬৭ দিন অর্থাৎ পনের মাস পরে।
এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, অপহরণ যাঁরা করেছিল জনাব মারুফ জামানকে, তাঁরা কেন অপহরণ করেছিল? আর তিনিই বা এতদিন কোথায় ছিলেন? আমাদের দেশের কর্তা ব্যক্তিরা কি ভেবে দেখেছেন,্ এই রকম একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ওই পরিবারের সদস্যদের মন-মানসিকতার কী রকম পরিবর্তন ঘটে চলে? ঠিক কী রকম মনঃসংযোগ নষ্ট হয় তাঁদের? হয়তো তাঁর স্ত্রী বেঁচে থাকলে সারাক্ষণ উনার মন থেকে বেজে ওঠেছে সকরুণ সুর-
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে / কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি / হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে ...
আর তাঁর সন্তান হয়তো বারবার জানালা খোলে পথ চেয়ে থেকেছে এবং স্বগোতুক্তি করেছে-
কতদিন দেখিনা বাবার মুখ / শুনি না সেই কোকিল নামের / কালো পাখির গান / হায় রে পরান! হায় রে পরান!
অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এভাবে পরাণের গহীনে হাহাকার নিয়ে নিশি-দিন যাপন করেন। কেউ রাখেনা তাঁর খবর। কারণ, আমাগো দেশের লোকজন এখন মহাব্যস্ত। অনেকের তো মল-মূত্র ত্যাগ করারও যেন সময় নাই। ফেসবুক-এর নেশায় মাতাল হয়ে অনেকে প্রাকৃতিক কার্যপদ্ধতি ও পরিবর্তনের চিন্তা-ভাবনা করছেন। যা হোক, আমরা প্রায়ই দেখি, যাঁরা অপহরণের শিকার হয়ে ফিরে এসেছে, তাঁদের প্রায় সকলকেই বাসার সামনে অথবা দূরে কোনো জায়গায় অপহরণকারীরা রেখে গেছে। তারপর তাঁদের কাছ থেকে দেশবাসী আর কোনো তথ্য জানতে পারে না, এমনকি এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও কোনো কিছু জানাতে পারেন না আগ্রহী পাবলিকদের। এক অজানা কারণে যেন, তাঁরাও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন।
স্বাভাবিকভাবে জনাব মারুফ জামান-এর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে, এমনটা আমরা আশা করতে পারি না। এটা হয়তো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা অথবা অন্য কারো। এখানে সুনির্দিষ্টভাবে আমরা কাউকে দোষারোপ করতে পারি না। তবে আমাদের কথা হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের ভেতরে অপহরণকারী চক্র যেকোনো সময় যাকে ইচ্ছা তাঁকে তুলে নিয়ে যাবে এবং দিনের পর দিন আটকে রেখে ফেরত দেওয়া বা না দেওয়ার ব্যাপারটি তাগো ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে, এবং এ ভয়ংকর চক্রের পাত্তাও পাবে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী-রাষ্ট্রের বিবেকবান নাগরিক হিসেবে এটা আমরা মেনে নিতে পারি না। কেননা, আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা ক্ষেত্রে তাঁদের পাওয়ার দেখাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের পাওয়ারলেস হয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আমরা খুঁজে পাই না। নিশ্চয়ই কিছু আছে?-এমন প্রশ্ন সাধারণ পাবলিক করেন।
অতএব, জন-মনের ভাবনা দূর করার জন্য এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি পুরোপুরি অটুট রাখার স্বার্থেই এ জাতীয় সকল অপহরণ এবং অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলে আমরা মনে করি। কেননা, এ রকম ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করে কিছুটা হলেও। অর্থাৎ, আমরা চাই, আর একজন লোকও যেন এ রকম অপহরণের শিকার না হয়। অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা যেন ডিপ্রেশন (বিষণœতা)-এ না ভোগে। সকল প্রাণের, সকল কানে কানে আমরা শুনতে চাই মঙ্গল বারতা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদেরকে কহ কানে কানে/শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা কহ কানে কানে/শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা!
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার
  • বৈশাখের বিচিত্র রূপ
  • বিচার নয় অভিশাপ
  • আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব
  • সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব
  • ঐতিহ্যময় উৎসব পহেলা বৈশাখ
  • Developed by: Sparkle IT