উপ সম্পাদকীয়

সন্ত্রাসবাদের নির্মমতা ও বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৫৯ | সংবাদটি ৪৪ বার পঠিত

সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক, নির্মম এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী হামলা হলো নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে নামাজরত মুসলমান মুসুল্লিগণের ওপর বর্বর হামলা। হামলায় নিহত হয়ছেন পঞ্চাশজন এবং আহত হয়েছেন সমান সংখ্যক মুসুল্লি।
নামাজরত মুসুল্লিগণের ওপর বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সন্ত্রাসী যুবকটি শেতাঙ্গ এবং অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। অস্ট্রেলিয়ানরাও হরহামেশা ইসলামী জঙ্গিবাদ নিয়ে নিন্দাবাদ করে গলা ফাটান। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দেখা গেলো, ইসলামী নয়, অস্ট্রেলিয়ান শেতাঙ্গ যুবকটি মারাত্মক ধরনের সন্ত্রাসী। সে একাই গুলি চালিয়ে ঠান্ডা মাথায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসী এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ইসলাম ধর্মের লোকজন এবং পক্ষান্তরে হামলাকারী সন্ত্রাসী হলো শেতাঙ্গ জাতি গোষ্ঠীর অষ্ট্রেলিয়ান।
ইসলাম ধর্মের লোকেরাই জঙ্গি-সন্ত্রাসী-এমন অপবাদ দিতে অভ্যস্ত পশ্চিমা শাসক, পশ্চিমা মিডিয়াসমূহ তথা শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার কি জবাব দেবেন। অস্ট্রেলিয়ান সরকার কী বলছে। হামলাকারী কি কেবলই বন্দুকধারী যুবক, নাকি সন্ত্রাসী সেটা স্পষ্ট করা উচিত নয় কি? নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন অবশ্য হামলার ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী হামলা বলেই বর্ণনা করেছেন।
মুসলমানদের ওপর বর্বোরোচিত এই সন্ত্রাসী হামলা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটা পূর্ব পরিকল্পিত ঠান্ডা মাথার সন্ত্রাসী হামলা এবং হামলায় সংঘটিত হত্যাকান্ডকে কেবল সাধারণ হত্যাকান্ড বললে ভুল হবে, এটা পরিষ্কার একটা গণহত্যা।
পশ্চিমা তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা এবং এদের দোসর মিডিয়াগুলো প্রতিনিয়ত ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আসছে এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রে তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাসবাদ খোঁজে খোঁজে যেসব প্রচারণা করেছে তার ফলে মুসলমান বিরোধী একটা বিদ্বেষ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে শেতাঙ্গদের মধ্যে এবং বলা যায়, এ ধরনের ঘৃণা ও বিদ্বেষ তাড়িত হয়েই অস্ট্রেলিয়ান শেতাঙ্গ যুবক ব্রেনটন হ্যারিসন ইবাদতকারী মুসুল্লিগণের ওপর হামলা করেছে, বর্বর গণহত্যা সংঘটিত করেছে। তবে পাশ্চাত্য জগতের মিডিয়াগুলো এ ধরনের মুসলমান বিরোধী ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে সভ্যতার সংকট ও সংঘাত উসকে দিচ্ছে কিনা তাও ভেবে দেখার সময় এসেছে।
যাহোক, অতর্কিতে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা ও সম্পদ ধ্বংসকারীরা সন্ত্রাসী, সে যে ধর্মের লোকই হোক। এদেরকে সুনির্দিষ্ট পরিচয়ে চিহ্নিত করা সঙ্গত নয় বলেই মনে করি। এদের পরিচয় একটাই-এরা জঙ্গি-সন্ত্রাসী এবং নিরীহ মানুষ হত্যাকারী। এদের কোনো জাতপাত নেই। এদের না আছে ধর্মীয় পরিচয় বা না আছে জাতীয় পরিচয় বা না আছে রাজনৈতিক আদর্শগত পরিচয়। সন্ত্রাসীদের পরিচয় একটাই-তাহলো, এরা মানুষ, সমাজ, সভ্যতা এবং বিশ্বব্যবস্থা এবং বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি। এরা মানবতার শত্রু।
অথচ বাস্তবতা হলো, পশ্চিমা সভ্যতা এবং পশ্চিমা মিডিয়াগুলো মানবতার শত্রু সন্ত্রাসীদেরকে পরিচয়ের বৃত্তে চিহ্নিত করার জন্য ইসলামী জঙ্গি ও সন্ত্রাসী খোঁজতে শুরু করে দেয় অনুরূপ কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই। অন্যদিকে, কোনো শেতাঙ্গ যখন সন্ত্রাসী ঘটনার জন্ম দেয় তখন এ ধরনের ঘটনাকে সন্ত্রাসী ঘটনা বলতে বা সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীকে শেতাঙ্গ বা অমুসলিম সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো অনীহা প্রকাশ করে। অর্থাৎ, মুসলমানদের ক্ষেত্রে ইসলামী জঙ্গি এবং অমুসলিমদের বেলায় পুরো বিপরীত অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এভাবে মুসলমান ও অমুসলিমদের মধ্যে বিভেদ রেখা তৈরি করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, যখন আমেরিকার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অথবা কোনো নাইট ক্লাবে সন্ত্রাসী আক্রমণে শিক্ষার্থী বা নিরীহ মানুষ হত্যা করা হয়, তখন হামলাকারীকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত না করে পশ্চিমা গণমাধ্যমে বলা হয়ে থাকে বন্দুকধারী। একইভাবে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণকারীকে পশ্চিমা গণমাধ্যম বললো বন্দুকধারী। যেহেতু সন্ত্রাসী ব্যক্তিটি শেতাঙ্গ, তাই তাকে সন্ত্রাসী না বলে বন্দুকধারী হিসেবে বর্ণনা করে পশ্চিমা গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশন করে একজন বন্দুকধারী মসজিদে হামলা চালায় এবং বন্দুকধারীর গুলিতে ৫০ জন মুসুল্লি নিহত হন।
সংবাদ পরিবেশনে এই যে পক্ষপাতিত্ব তার দরুণ পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে একরোখা নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে মুসলমানদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা ও তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণ করতে আদাজল খেয়ে উঠেপড়ে লেগে যায়। অথচ শেতাঙ্গ বা অমুসলিমদের দ্বারা সংঘটিত অনুরূপ কোনো ঘটনায় যথা সম্ভব সংবাদ প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো শেতাঙ্গ বা অমুসলিম কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটালে সংবাদ মাধ্যম যতখানি গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রকাশ করে থাকে, সেই একই ধরনের ঘটনা কোনো মুসলিম ধর্মের লোক ঘটালে তা তার চেয়ে ৩৫৭ গুণ বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়ে থাকে। আর এসব সংবাদ প্রচারে মুসলমানদের বেলায় সন্ত্রাসী বা টেররিস্ট শব্দ উল্লেখ করা হলেও অমুসলিমদের ক্ষেত্রে সহসা সন্ত্রাসী বা টেররিস্ট শব্দ ব্যবহার করা হয় না।
সংবাদ প্রচার ও প্রকাশে এই যে বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে এবং এভাবে মুসলমানদের সাথে অমুসলিম সভ্যতার এক ধরনের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে, যা শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার জন্য ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তাই একচেটিয়াভাবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা দ্বারা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করার পশ্চিমা প্রবণতা পরিহার করা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থার জন্যই অপরিহার্য।
একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার যে, নানা বৈষম্যের কারণে ও আঘাতে ইসলাম ধর্মানুসারীদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছে-যার নিন্দা মুসলিম বিশ্ব করে চলেছে। কিন্তু শুধু মুসলমানরাই সন্ত্রাসে জড়িত এটা সঠিক নয়। বরং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে শেতাঙ্গ-অশেতাঙ্গ, মুসলমান-অমুসলিম সকল সম্প্রদায়ের লোকজনদের মধ্যে কমবেশি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছে, এই সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে প্রকৃত সত্য সংবাদটা বিশ্ববাসীকে জানাতে ভূমিকা পালন করতে হবে পশ্চিমা-অপশ্চিমা নির্বিশেষে মিডিয়াগুলোকে।
যে বিষয়গুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় কখনো প্রচারিত বা প্রকাশিত হয় না তাহলো, পশ্চিমা শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিশ্বের নানা স্থানে মসজিদ, মন্দির, সিনাগগ বা কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চ, শরণার্থী, অভিবাসী মানুষ সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে সম্প্রতি ‘এন্টি-ডিফামেশন লীগস সেন্টার অন এক্সট্রিমিজম’-নামক এক সংগঠনের প্রকাশিত জরিপ থেকে এ তথ্য ওঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এ সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চরমপন্থী সংশ্লিষ্ট প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে মোট ৩৮৭টি, যার মধ্যে ৭১% শতাংশের পেছনেই দায়ী শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও কট্টরপন্থী সন্ত্রাসীরা। মুসলিম চরমপন্থীরা দায়ী মাত্র ৬১% শতাংশ প্রাণহানী ঘটনার জন্য।
সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, সেটা বিশ্বের যেকোনো স্থানে অশেতাঙ্গ, শেতাঙ্গ, মুসলিম, খৃষ্টান, ইহুদি, অমুসলিম, যাদের দ্বারাই সংঘটিত হোক না কেন,তা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং এগুলো শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্বসভ্যতার ওপর নির্মম, নিষ্ঠুর আঘাত এবং অবশ্যই বিশ্বব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গোটা বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মপন্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার
  • বৈশাখের বিচিত্র রূপ
  • বিচার নয় অভিশাপ
  • আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব
  • সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব
  • ঐতিহ্যময় উৎসব পহেলা বৈশাখ
  • Developed by: Sparkle IT