উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

মুক্তিযুদ্ধে পরদেশি বন্ধু সঙ্গীতশিল্পী

মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩০:৪৬ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত


১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ধরে ধরে হত্যা, নারী নির্যাতন, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া ‘সার্চলাইট অপারেশন’ এর মুখে আত্মরক্ষার্থে দেশ ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন প্রায় ১ কোটি মানুষ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও পরিচালিত হয় ভারত থেকে। বাংলাদেশিদের এ দুঃসময়ে শরণার্থীদের সাহায্যের জন্যে পন্ডিত রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন যৌথভাবে আমেরিকার ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘কনসার্ট পর বাংলাদেশ’ নামে একটি দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
পন্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বনন্দিত সেতারবাদক। তিনি ভারত, ইউরোপ, আমেরিকার দেশে দেশে সেতারের ফেরিওয়ালা। রবিশঙ্করের জন্ম হয় ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের বারানসিতে। অবশ্য তার পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বাংলাদেশের নড়াইল জেলায়। এ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে তার শিকড়ের সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর গণহত্যায় তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের সাহায্যে তিনি উদ্যোগী হন।
রবিশঙ্করের বন্ধু জর্জ হ্যারিসন তখনকার আমেরিকার ব্যান্ড তারকাদের শ্রেষ্ঠ শিল্পী। অবশ্য জর্জ হ্যারিসনের জন্ম হয় ১৯৪৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। পরে তিনি বিখ্যাত গানের পার্টি বিটলসে যোগদান করতে আমেরিকায় পাড়ি জমান। জর্জ হ্যারিসন নিজে গান রচনা করতেন। নিজের লেখা গানে নিজে সুর দিতেন। নিজের লেখা গান নিজে গেতেন এবং সাথীদের গেতে দিতেন। বিটলসের হয়ে গান গেয়ে গেয়ে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন জর্জ হ্যারিসন। শিল্পী, পন্ডিত রবিশঙ্কর জর্জ হ্যারিসনের কাছে বাংলাদেশে চলিত বহুমুখী সামরিক বর্বরতা ও ভারতে আশ্রিত প্রায় ১ কোটি শরণার্থীদের দুঃখদুর্দশার কথা তুলে ধরে শরণার্থীদের সাহায্যে আমেরিকায় একটি সঙ্গীত অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব রাখেন।
জর্জ হ্যারিসন বন্ধু রবিশঙ্করের মুখে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের করুণ কাহিনী শুনে ব্যথিত হন। কিন্তু আমেরিকার পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশে পাকিস্তানি আর্মির নিষ্ঠুরতার খবর প্রকাশিত হচ্ছেনা। আমেরিকার জনসাধারণকে বাংলাদেশের ঘটনাবলীর ব্যাপারে অন্ধকারে রেখে মার্কিন সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দমনে জাহাজ বোঝাই করে অস্ত্র পাঠাচ্ছে পাকিস্তানি আর্মির জন্যে। অবশ্য যুক্তরাজ্যের বিবিসির সংবাদ মাধ্যম বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে বাংলাদেশের নাজুক পরিস্থিতিও বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিল্পী জর্জ হ্যারিসন বিবিসির ইংলিশ সংবাদ শুনে তার বন্ধু রবিশঙ্করের কথার সত্যতার প্রমাণ পান। জর্জ হ্যারিসন অবশেষে তার বন্ধু রবিশঙ্করের প্রস্তাবে সাড়া দেন। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি দাতব্য সঙ্গীত অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
যেহেতু আমেরিকা সরকার পাকিস্তানি আর্মির জন্য অস্ত্র পাঠাচ্ছে সেহেতু আমেরিকার বুকে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ সঙ্গীতানুষ্ঠান করা একটি চ্যালেজিং ব্যাপার। জর্জ হ্যারিসন এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
রবিশঙ্কর তার দলবল নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন। রবিশঙ্করের দলে যোগ দেন ওস্তাদ আল্লা রাখা খান, কমলা চক্রবর্তী প্রমুখ। জর্জ হ্যারিসনও দলবল নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন। জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে যোগ দেন রিঙ্গোস্টার, বিলি প্রেস্টন, বব ডিলার, লিয়ন রাসেল, ডন প্রেস্টন। প্রায় ৫ সপ্তাহ প্রস্তুতির পর ১ আগস্ট ’৭১ নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ দাতব্য সঙ্গীত অনুষ্ঠানটি বিকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলে। হলে আসন সংখ্যা ৪০ হাজার। অনুষ্ঠানে শ্রোতা-দর্শকদের উপস্থিতি এমন হয় যে ৪০ হাজার আসনের মধ্যে একটি আসনও খালি থাকেনি।
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশনে পন্ডিত রবিশঙ্কর ও তার দল সঙ্গীত পরিবেশন করেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে জর্জ হ্যারিশন ও তার দল সঙ্গীত উপস্থাপন করেন। বব ডিলান এককভাবে ৫টি গান গেয়েছেন অনুষ্ঠানে। রিঙ্গোস্টার, বিলি প্রেস্টন, লিয়ন রাসেল কখনো আলাদা আলাদা, কখনো সম্মিলিতভাবে আসর মুখর করেছেন গান গেয়ে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আসরের প্রধান আকর্ষণ জর্জ হ্যারিসন মনমাতানো ৮টি গান পরিবেশন করেন। সবশেষে নিজের লেখা নিজের সুর করা ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ গান গেয়েছেন জর্জ হ্যারিসন। ক্রন্দনের সুরে আবেগময় ভাষায় জর্জ হ্যারিসন গান ঃ

My friend came to me, with sadness in his eyes

He told me that he wanted help

Before his country dies----


কনসার্ট ফর বাংলাদেশ দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠানে জর্জ হ্যারিসনের মর্শিয়া শুনে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির বেদনাময় পরিস্থিতি জেনে দর্শক-শ্রোতা সকলেই মর্মাহত হন। কারো কারো চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সবাই মুক্তহস্তে দান করেন শরণার্থীদের জন্যে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আড়াই লক্ষ পাউন্ড সংগৃহীত হয়। সব টাকাই পাঠিয়ে দেয়া হয় শরণার্থীদের জন্যে।
বাংলাদেশের দুর্দিনের পরদেশী বন্ধু, সঙ্গীতজ্ঞ রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন ও তাদের সাথীরা প্রজন্মে প্রজন্মে স্মরণীয় থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের কাছে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শব্দদূষণ রোধে এগিয়ে আসুন
  • খাদ্যে ভেজালকারীদের নির্মূল করতেই হবে
  • বাংলাদেশের গৃহায়ন সমস্যা
  • বৃদ্ধাশ্রম নয় বৃদ্ধালয়
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • Developed by: Sparkle IT