বিশেষ সংখ্যা

মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ভূমিকা

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩১:৫৭ | সংবাদটি ২৫৬ বার পঠিত


আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। আমরা আজ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অধিবাসী। আমরা গর্ব করে বলতে পারি, এদেশ আমার, এ মাটি আমার। এদেশের আলো-বাতাসে আমরা বেড়ে উঠছি। এদেশ আমার অহংকার। এদেশের প্রতিটি ধূলি-কণায় ছড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মদানের গৌরবময় কাহিনী, দু’লাখ মা-বোনের সর্বোচ্চ ত্যাগের মর্মগাথা, সাত কোটি বাঙালির অটল ঐক্যের কথা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অতুলনীয় নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছুতে সক্ষম হই। অর্জন করি বাঙালির চির আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন জনের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। এক্ষেত্রে শব্দ সৈনিকদের ভূমিকা নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করা যেতে পারে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এই সাহসী দেশপ্রেমিক শব্দ সৈনিকেরা যুদ্ধ জয়ের যে দৃঢ় প্রত্যয় জাগিয়ে তুলেছেন, জাতিকে শুনিয়েছেন আশা ও আকাক্সক্ষার কথা, তা স্বদেশপ্রেমের উজ্জ্বল মনিদীপ হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে। কী কথা, কী গান, কী অনুষ্ঠানমালাই না তাঁরা প্রচার করেছেন নয় মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মরণ ছোবল হেনেছিল। রক্তে ভেসে গিয়েছিল শহর-বন্দর-গ্রাম। হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাংলার মানুষ ২৬ মার্চ বেতারে শ্রুত একটি বাণীতে খুঁজে পেয়েছিল আশার বাণী। সে বাণী ছিল বঙ্গবন্ধুর। কী ছিল তাতে? সে বাণী ছিল স্বাধীনতার, ছিল হানাদারের কবল থেকে স্বদেশ মুক্তির আহবান। চট্টগ্রামের কালুরঘাটস্থ পাকিস্তানি বেতারের ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সেই বাণী ছড়িয়ে পড়েছিল। কে ভেবেছিল, ২৬ মার্চে প্রতিষ্ঠিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ই হয়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার।
২৬ মার্চ দুপুর এবং সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্রের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান। ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার উল্লেখ করে একই বেতারকেন্দ্র থেকে ভাষণ দেন মেজর জিয়াউর রহমান।
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত রেডিও পাকিস্তান, চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে চালু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পরিণত করতে মূল সংগঠক ছিলেন ১০ জন। এরা হলেন বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, সৈয়দ আব্দুশ শাকুর, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, মোস্তফা আনোয়ার, রাশেদুল হাসান, সারফুজ্জামান, রেজাউল করিম চৌধুরী, আমিনুর রহমান ও কাজী হাবিব উদ্দিন। এঁদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন ডা. মোহাম্মদ শফি (শহিদ), বেগম মুশতারী শফি, মীর্জা নাসির উদ্দিন (চট্টগ্রাম বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক প্রকৌশলী), সুলতান আলী (বার্তা সম্পাদক), আব্দুস সোবহান (বেতার প্রকৌশলী), মাহমুদ হোসেন (শহিদ), আব্দুশ শুকুর, সেকান্দার হায়াত খান ও মোসলেম খান প্রমুখ।
তখন অনুষ্ঠান শুরু করার কোনো সুনির্দিষ্ট সময় ছিল না। সকাল, দুপুর ও বিকেলে অনুষ্ঠান প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে বেতারকেন্দ্র চালু রাখা হতো। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত বেতার কর্মীরা অনিয়মিত হলেও অনুষ্ঠান প্রচার করেছেন। ৩০ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে প্রথম বিমান হামলা চালায়। আর তা ছিল কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে। স্যাবর বিমান থেকে রকেট নিক্ষেপ করে তারা স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল বিপ্লবী বাংলার কণ্ঠস্বর। তখনই বেতার কর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন, এ স্থানটি আর নিরাপদ নয়। তাঁরা পাড়ি জমালেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। পরে মুজিবনগরে নবরূপে গড়ে উঠল স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র।
১৯৭১ সালের ২৫ মে পঞ্চাশ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে শুরু হলো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার। ক্রমে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র ঢাকা থেকে এসে যোগ দেন আশরাফুল আলম, শহীদুল ইসলাম, আলী রেজা চৌধুরী, যহুর কাদের প্রমুখ। এঁরা সাথে করে নিয়ে আসেন প্রয়োজনীয় কিছু গানের টেপ।
একটি আবাসিক বাড়ির সীমাবদ্ধ পরিবেশে ছোট একটি ঘরকে স্টুডিও করে প্রথম অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। প্রথম কিছুদিন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার নিদারুন ঘাটতি ছিল। স্টুডিওর অভাব পর্যাপ্ত রেকর্ডিং সুবিধার অভাব এবং শুরুতে শিল্পী, সাহিত্যিক ও কথকের অভাব। প্রথম দিকের ঝক্কি-ঝামেলা কাটিয়ে ওঠার পর অনুষ্ঠান সম্পর্কে সংহত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমগ্র দায়িত্ব ন্যস্ত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত এম.এন.এ আব্দুল মান্নানের উপর। প্রতিরক্ষা দপ্তরের সচিব আব্দুস সামাদ ও অনুষ্ঠান সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিতেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সংগঠক এবং কেন্দ্রের প্রশাসনিক পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন সিনিয়র প্রোগ্রামার অর্গানাইজার শামসুল হুদা চৌধুরী। সমগ্র অনুষ্ঠানের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন আশফাকুর রহমান। পরবর্তীকালে তথ্য ও বেতার সচিব হিসেবে সার্বিক তত্ত্বাবধান করতেন আনোয়ারুল হক খান।
যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী স্বাধীন বাংলার বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠান সমৃদ্ধির জন্য নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ড. এ.আর মল্লিক, সৈয়দ আলী আহসান, ড. মাযহারুল ইসলাম, ড. আনিসুজ্জামান, শওকত ওসমান, গাজীউল হক, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, আব্দুল জব্বার, অজিত রায়, রথিন রায়, আপেল মাহমুদ, সুমিতা দেবী প্রমুখ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান ছিল উন্নতমানের। ‘চরমপত্র’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘জল্লাদের দরবার’, ‘পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে’, ‘পুতুল নাচের খেল’ অনুষ্ঠানসমূহ ছিল সবচে জনপ্রিয়।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস রণাঙ্গণে জীবনপণ লড়াই করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। আর কথা, গান ও অভিনয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ইথারে ইথারে ছড়িয়ে দিয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দ সৈনিকেরা। সেই সময়ের গান, কথিকা, সংবাদ, সাহিত্য ও বুলেটিন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের অমূল্য দলিল হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই নিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গুরুত্ব এখানেই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT