বিশেষ সংখ্যা

পেছন ফিরে দেখা

মো: আব্দুল মালিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৫৪ | সংবাদটি ১২০ বার পঠিত

বছর ঘুরে ফিরে এলো স্বাধীনতার মাস মার্চ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই মার্চ মাসে। তাই প্রতি বছর মার্চ মাস এলেই বাঙালিরা নবউদ্যমে মেতে উঠেন। আনন্দ-বেদনায় উদ্বেলিত হতে থাকেন। খোলে বসেন স্মৃতির খেরো খাতা। আলোচনা পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন অগ্নিঝরা মার্চ একাত্তরের এবং আন্দোলন সংগ্রাম ও নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের লোমহর্ষক নানা ঘটনাবলির। আমাদের এই মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববাসীর অনেক অবদান রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের। এই অবদান কখনো ভুলবার নয়। কিন্তু আমরা কতজনে কতটুকু জানি আমাদের এই মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ভারত সরকার ও ভারতের জনগণ আমাদের জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের নিকট এই অবদান বলতে গেলে অজ্ঞাত রয়েই গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের সামনে সেই অবদান নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই নিবন্ধে সে ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করব। একই সাথে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করব। যাতে করে নতুন প্রজন্ম সহ পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে বিষয়টি কিছুটা হলেও পরিষ্কার হয়।
‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করতে ভারত বিভিন্ন দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। যেমনি তাকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে, তেমনি লোকক্ষয়ের দিক দিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। ২৬শে মার্চ থেকে ৩০ শে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার অসহায় বাঙালি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব ধর্মের অনুসারীই ছিল।
এক কোটি শরণার্থী লালন-পালনের জন্য ভারত সরকারের ব্যয় করতে হয়েছে ২৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৫০ কোটি টাকা বিভিন্ন দেশ ভারত ও মুজিবনগর সরকারকে সাহায্য করেছে। শরণার্থীদের লালন-পালন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ এবং তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য রসদ সরবরাহসহ সামরিক খাতে ব্যয় করতে হয়েছে আরো বহু টাকা। সবকিছু মিলে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৭০০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এর চেয়েও বেশি ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে ভারতকে যা টাকার অংকে হিসেব করা যাবে না। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রায় দেড় হাজার অফিসার ও জওয়ান নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৮ জন অফিসার, ৬০ জন জুনিয়র কমিশন অফিসার এবং ১২৯৩ জন্য অন্যান্য স্তরের। আহত হয় ৪০৬১ জন্য এবং নিখোঁজ হয় ৫৬ জন।’ (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা- তপন কুমার দে- পৃষ্ঠা: ১০)
‘এক কোটি শরণার্থীর ভার বহনের জন্য ভারতকে এক বিশাল অঙ্কের অর্থ বহন করতে হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ শরণার্থীদের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে যে অর্থ সাহায্য করেছে তার পরিমাণ ভারতীয় টাকায় মাত্র ৫০ কোটি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতকে ব্যয় করতে হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের হিসেব ধরা হয়েছিল ৫৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।’ (জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে দেয়া ভারতের পুনর্বাসন সচিব জি এস কাহলন-এর বিবৃতি, বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা: ৯৩)
‘শরণার্থীদের জন্য ব্যয়ের হিসেব বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক সাহায্যের পরিমাণ টাকার অঙ্কে কত ছিল এ তথ্য কেউ দিতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা বলেছেন, আমরা যদি টাকা ফেরত চাইতাম তাহলে সাহায্যের টাকা অঙ্কে লিখে রাখতাম। ভারতীয়রা লিখে না রাখলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের নাগরিকদের জানা দরকার শুধু শরণার্থীদের জন্য ভারত ‘৭১ সালে ব্যয় করেছিল টাকার বর্তমান মানে ২,৩১০ কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অন্যান্য রসদ সরবরাহসহ সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে যা হিসেব করা যাবে না তা হচ্ছে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য ভারতের প্রায় সতেরশ অফিসার ও জওয়ান শহীদ হয়েছেন। টাকার অঙ্কে হিসেব করা যাবে না সাধারণ মানুষের ভালবাসা ও সহমর্মিতা’। (বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা- শাহরিয়ার কবির- পৃ: ১০০)
‘যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাকিস্তান সাময়িক বাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেলের দপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তাদের ৩৫৪ জন কমিশন্ড অফিসার, ১৯২ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং ৫ হাজার ৩২০ জন সাধারণ সেনা নিহত হয়েছিল।
যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভারতীয় কমিশন্ড অফিসারদের মধ্যে ৬৮ জন নিহত এবং ২১১ জন আহত হয়। জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারদের মধ্যে নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ১৬০, তিনজন নিখোঁজ হয়েছিলেন। এনসিওদের মধ্যে ৩ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছিলেন। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ১ হাজার ২৯০ জন নিহত, ৩ হাজার ৬৭৬ জন আহত এবং ৬৩ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। মোট নিহত হয়েছিলেন ১ হাজার ৪২১ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৫৮ জন।
যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কতজন প্রাণ দিয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যাটি এখনো অজানা। তবে নিয়মিত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের হিসাব পাওয়া যায়। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ১ হাজার ৬০৮ জন যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অফিসার ছিলেন ৪৯ জন, জেসিও ৭৮ জন এবং অন্যান্য পদের সৈনিক ১ হাজার ৪৮১ জন। তাঁদের অনেকেই ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং আটক অবস্থায় তাঁদের হত্যা করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীর ১ হাজার ২৬২ জন সদস্য যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধে নিহত ইপিআরের বাঙালি সদস্যদের সংখ্যা ৮১৭।’ (যুদ্ধ দিনের কথা ১৯৭১- মহি উদ্দিন আহমদ, পৃ: ১৪৭)
‘পাকিস্তান সরকারের তথ্য মতে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ভারত-পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩৭ জন অফিসার, ১৩৬ জন জুনিয়র অফিসার, ৩৫৫৯ জন অন্যান্য পদবীর সৈনিক নিহত হয়। তবে সমগ্র যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কত অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবীর সৈনিক নিহত হয়েছে তার প্রকৃত তথ্য জানা যায়নি।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষে মোট ১৪২১ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে ৬৮ জন অফিসার, ৬০ জন জেসিও এবং ১২৯৩ জন অন্যান্য পদবীর সৈনিক। তাছাড়া মোট ৪০৬১ জন আহত হন। যাদের মধ্যে ছিলেন ২১১ জন অফিসার, ১৬০ জন জেসিও এবং ৩৬৯০ জন অন্যান্য পদবীর সৈনিক। এছাড়াও ৫৬ জন নিখোঁজ হন।
পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি যাদেরকে পাকিস্তানি গ্রেফতার করে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে তাদের মধ্যে ছিল ৪৯ জন অফিসার, ৭৮ জন জেসিও এবং ১৪৮১ জন অন্যান্য পদবীর সৈনিক। বাংলাদেশের কত জন অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য পদবীর মুক্তিযুদ্ধা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হয়েছেন তাও সঠিক ভাবে এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা যায়নি।’ (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস-১ম খন্ড, পৃ: ৩৯০- প্রথম প্রকাশ মে-২০১৫)
বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ৮০ লক্ষ শরণার্থী ছিলেন বাঙালি অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উপর প্রচন্ড আর্থিক চাপ পড়ে। এছাড়াও এত শরণার্থীর অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরার জন্য পশ্চিমবঙ্গে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। ভারত সরকার চেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের উপর থেকে চাপ কমানোর জন্য ভারতের অন্যান্য রাজ্যে শরানার্থীদের সরিয়ে নিতে। কিন্তু শরনার্থীরা রাজি হয় নি। ফলে আর্থিক চাপ ও আইন শৃংখলার অবনতি রোধে ব্যর্থ হওয়ায় ভারত সরকার তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রি অজয় মুখার্জির সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যে লোকক্ষয় হয়েছিল তার সময় সীমা ছিল প্রায় ৯ মাস। ভারতের যে লোকক্ষয় হয়েছিল তা হয়েছিল মাত্র ১২/১৩ দিনের যুদ্ধে। সময়ের সাথে সংখ্যার হিসেব করলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চাইতে ভারতের লোকক্ষয় হয়েছিল কয়েকশ গুন বেশি।

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : মে দিবস
  • মে দিবস ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন
  • শ্রমিক দিবস ডাক দিয়ে যায়
  • মে দিবস পালনের মতাদর্শগত ভিত্তি
  • নববর্ষ নিয়ে আসুক শান্তি
  • বৈশাখী ভাবনা
  • বৈশাখে রবীন্দ্র-নজরুল
  • শৈশবের নববর্ষ উদযাপন
  • মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা
  • পেছন ফিরে দেখা
  • মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ভূমিকা
  • স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
  • ভাষার ব্যবহারের শুরু ও একুশ
  • প্রসঙ্গ : ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ
  • ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা
  • বাংলাদেশে প্রচলিত নানান ভাষা
  • বর্ষ গণনা ও ক্যালেন্ডারের ইতিকথা
  • নতুন বছরে নতুন শপথ
  • সালতামামি ২০১৮ : প্রত্যাশার ২০১৯
  • বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
  • Developed by: Sparkle IT