বিশেষ সংখ্যা

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা

ঝরণা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৯ ইং ০০:৩৮:১৬ | সংবাদটি ১৯৫ বার পঠিত

বিভিন্ন পরম্পরা ও প্রক্রিয়ায় এসেছিল ৭১, এসেছিল স্বাধীনতা। যেমন লাখো বাঙালির সমাবেশে বঙ্গঁবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঢাকার রমনা’র রেসকোর্স ময়দানে সেদিন বিকাল সোয়া তিনটায় মাত্র ১৯ মিনিটের ভাষণে ১৩০৮ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন বঙ্গঁবন্ধু। পূর্ব বাংলার অকুতোভয় সন্তানরা বঙ্গঁবন্ধুর সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে নয় মাসের যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনে।
অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সে-ই রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানিরা ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সেদিন বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানের জেনারেল আমির আব্দুল্লা খান নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে দস্তখত দেন। ফলে তিরিশ লক্ষ শহীদের জীবনের বিনিময়ে এবং অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পাই স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। আমরা গাই-:
জন্ম আমার! জন্ম আমার! ধন্য হলো মাগো / এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো/ মাগো! এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো/ তোমার কথায় হাসতে পারি / তোমার কথায় কাঁদতে পারি/ মরতে পারি তোমার বুকে/ তুমি বুকে যদি রাখো / মাগো! এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো/ জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো----
বাংলার মানুষের দীর্ঘ বছরের স্বপ্ন এবং আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কষ্টের ছিল। তাঁদের অনেক স্ট্রাগল ফেস করতে হয়েছে। কারণ, মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী কোনো অস্ত্র ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় সে সময় দেখা গেছে, আকাশ পথে শত্রুরা ঘন্টার পর ঘন্টা বোমা ফেলছে, কেউবা আহত হচ্ছে, কেউবা মরছে এমন দৃশ্য! কিন্তু বাঙালিদের কিছুই করার যেন শক্তি ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের বাংকারে শত্রুরা গুলি ছুড়লো। রক্তাক্ত আহত অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে শুধু ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা হতো। কিছু যোদ্ধা শুধু পানি, লতা-পাতা চিবিয়ে খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করে এক সময় দুর্বল শরীর নিয়েও যুদ্ধ করতেন। অসুস্থ অবস্থায় অনেকে দাঁতে দাঁত কামড়ে হাতে তুলে নিতেন থ্রি নট থ্রি অস্ত্র। কন্ঠে থাকতো তাঁদের প্রেরণার গান-:
মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি!/ মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি!/ যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা / যে নদী জল ফুলে ফলে মোর স্বপ্ন আঁকা / যে দেশের নীল অম্বরে মোর মেলেছে পাখা / সারাটি জনম সে মাটির টানে অস্ত্র ধরি / একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি! / মোরা একটি ফুলকে---
অথবা-
জয় বাংলা! বাংলার জয়! হবে-হবে-হবে নিশ্চয় ! কোটি প্রাণ এক সাথে/ জেগেছে অন্ধ রাতে নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়----
এভাবে নয় মাস পরে সত্যিই এক নতুন সূর্য ওঠলো এই বাংলায়, যে সূর্যের নাম ‘স্বাধীনতা!’ বিস্ময়ে জেগে ওঠলো বাঙালির প্রাণ। বিশ্ববাসী অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো হাফ প্যান্ট পরা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘এই তো অবাক বাংলাদেশ’-বলে কেউ কেউ মন্তব্যও করলো। আসলেই বিস্ময় বাংলাদেশ!
এ দেশে সরকার আসে, সরকার যায়। ফলে সংযোজন-বিয়োজন হয় মুক্তিযোদ্ধা তালিকা। সে অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ মার্চ নতুনভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে আমরা বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া থেকে জানলাম। অপরদিকে, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেল, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে যে তালিকা হয়েছে, তার মধ্য থেকে ১৯ ক্যাটাগরির প্রায় দুই লাখ (১,৯৯,৯৩৫) মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকা প্রকাশ করবে মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তালিকাটি প্রকাশ করা হবে। এর সাথে ২০০৫ সাল থেকে (বিএনপি আমল) বিভিন্ন সময়ে করা ৩৪ হাজার ৪৪৩ জনের বেসামরিক গেজেট স্থগিত করা হবে। অর্থাৎ, তাদের ভাতা স্থগিত করে পুনরায় আবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হবে। তারপর সেই আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রায় ২৫ হাজার গেজেট বাতিল হবে বলে শোনা যাচ্ছে। কারণ, এসব গেজেটের মধ্যে এমন সব ব্যক্তি আছেন, যাদের নামে একাধিক গেজেট আছে। তাই মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয় মনে করে, বিএনপির আমলে যেসকল মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, সেসকল তালিকা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যেসকল গেজেট হয়েছে, তার মধ্যে কোনো অনিয়ম নেই বলে দাবি করছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ২০১২ হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এখন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৮। ভাতা পাচ্ছেন এখন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ জন। বর্তমানে বেসামরিক গেজেট ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৪৩ জন। তার মধ্যে লাল মুক্তিবার্তায় থাকা ৯০ হাজার এবং ভারতীয় তালিকায় থাকা ৬০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকা প্রকাশ করা হবে। ৩৪ হাজার ৪৪৩ জনের গেজেট স্থগিত করার কথা রয়েছে।
নতুন তালিকার ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মাননীয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেসব তালিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, নিয়ম মেনে করা হয়েছে, যাঁদের বিষয়ে আমরা অবহিত আছি,তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৬ মার্চ। আর যাঁদের বিষয়ে আপত্তি এসেছে, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে বলা হবে।’ মাননীয় মন্ত্রী আরও বলেন, ‘গত মেয়াদে আমরা সব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে পারিনি বা ভুয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারিনি। এবার করে ফেলব। তবে আমরা কোনো অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাইনি।’
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকারের মহাকাব্য। যাঁর মাঝে গভীরভাবে মিশে আছে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ। এই মহাকাব্যে আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ, আছে হাসি, আছে প্রেম, আছে বিরহ। অর্থাৎ, অনেক কিছুর বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আর সে-ই স্বাধীনতার ৪৯ বছরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এখন বাংলাদেশ। তবে ৪৯ বছর পূর্বে ২৫ শে মার্চের হত্যাকান্ডের কথা আমরা জাতি ভুলতে পারি নি। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা জাতির জনক বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান কারাগারে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু কারাগারে বন্দি ছিলেন। কিন্তু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি ভুলতে পারেনি। তাই বঙ্গঁবন্ধু কারাগারে থাকলেও বাঙালির মুক্তির যুদ্ধ থেমে থাকেনি। ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বিজয় লাভ করে। এভাবে আসে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা- যে স্বাধীনতা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। অথচ একসময় বাঙালির কাছে স্বাধীনতা স্বপ্ন ছিল। প্রবল যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির সেই লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ৭১’-এ। বাঙালির এ স্বপ্ন পূরণের পেছনে মিরাকল কিছুও ছিল নিশ্চয়ই? অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়েও পাকিস্তানিরা একাত্তরে বাঙালিদের সাথে যুদ্ধে জিততে পারলো না কেন? এটা আমাদের ভাবায়। যা হোক, অনেক স্বপ্নের প্রস্ফূটিত নাইটকুইনসম আমাদের এ স্বাধীনতা কোনো অন্ধকারে যেন তলিয়ে না যায়- মহান স্বাধীনতা দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সুন্দরের বীণা উঠুক বেজে স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের মনে মনে। আর সুরের ধারায় মুগ্ধ হয়ে দেশপ্রেমী, প্রগতিশীলরা আপন মনের, আপন বীণায় সুর তুলোন,-
সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য / অপরূপ রূপসী রূপেতে অনন্য / আমার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন/ ও দেশ তোমারই জন্য / সুুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য / অপরূপ রূপসী রূপেতে অনন্য----
অপরূপ রূপসী এ বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়। আমরা বাঙালিরা দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা। ইতিহাস তাই কথা কয়। তাই মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা-এ তিনটি বাক্য অনেক সম্মানের, অনেক গর্বের। বাঙালি জাতিকে সর্বদা তা স্মরণ রাখতে হবে। কারণ, একটি বাংলাদেশ জাগ্রত জনতার, সারা বিশ্বের বিস্ময়-এই সোনার বাংলাদেশ আমাদের অহংকার।
লেখক : আইনজীবি-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT