শিশু মেলা

জিন্দা দৈত্য ও বাবার দরবার

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৩-২০১৯ ইং ০০:৪৯:০৬ | সংবাদটি ৩১৬ বার পঠিত

ফুলমতি কোমরটা পর্দার ভিতর বাড়িয়ে ধরলেন। অমনি প্রথমে কার হাতের ছোয়া পড়ল কোমরে। ধীরে ধীরে সে হাত হিম হতে হতে বরফের টুকরো মনে হলো। ফুলমতির চোখ জুড়ে ঘুম আসতে লাগলো। কোমর ব্যথায় বহুদিন ধরে রাত জাগা ফুলমতির আজ যেন কার যাদুর ছোঁয়ায় প্রচন্ড ঘুম অনুভূত হলো। পর্দা বাধা খোঁটায় ডান হাত দিয়ে শক্ত করে ধরলেন। পেছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠের স্পষ্ট আওয়াজ ‘তুমি ভালো হয়ে গেছ ফুলমতি। বাবার বাক্সে চারশ টাকা দাও। তোমার কোমরে অমাবশ্যার রাতে একটা বিচ্ছিরি দৈত্য পাড়া দিয়েছিল। সেই থেকে এই ব্যথার উৎপত্তি। খোদা হাফেজ...।
ফুলমতি কে হাত ধরে টেনে এনে বসালেন ছুটু মোল্লা। আহেন আহেন বহেন ব্যথা সাইরা গ্যাছে গা আমার জিন্দা দৈত্য বিষ-ব্যথা খাইয়া পালায়। ব্যথা কমছে না? ফুলমতি কোমরে হাত দিয়ে অনুভব করে। হ্যাঁ ব্যথা তো নেই। কী আশ্চর্য্য! খুশি হয়ে ফুলমতি চারশ টাকা বাবার বাক্সে ফেলে। উপস্থিত রোগীরা তা প্রত্যক্ষ করে।
ঘর ভর্তি রোগীদের মধ্যে শামছু একজন। সেই গৌরিপুরের ছোট্ট গ্রাম থেকে এসেছেন তিনি। লোকমুখে শুনেছেন ছুটু মোল্লার কথা। জ্বীন পরী তাবিজ-কবজ ইত্যাদির চিকিৎসক ছুটু মোল্লা। শামছু গ্রামের এক ক্ষুদ্র কৃষক। আয় রোজগার তেমন নেই। চার চারটি মেয়ে তার। কৃষিকাজ করে জীবন নির্বাহ করেন। ওদের কষ্ট করে মানুষ করেছেন শামছু। বড় মেয়ে শায়লা অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। গ্রামের হাইস্কুলে পড়ে সে। ওর ছোট শিলা পঞ্চম শ্রেণিতে। এর ছোটটি পড়ে থ্রিতে এবং সর্বশেষ ওয়ানে। ওদের বই খাতা সরকার থেকে পান শামছু। স্কুলেও বেতন দিতে হয় না। শুধু স্কুল ড্রেস, কাপড় চোপড়, আর পরীক্ষার ফি টি একটু দিতে হয়। সেটাই যোগাড় করতে হিমশীম খান শামছু। তারপরও স্ত্রী আছিয়াকে নিয়ে সুখের সংসার তার। এতোদিন ধরে বেশ চলে যাচ্ছিল। একদিন হঠাৎ স্কুল থেকে অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল শায়লা। মাথার অর্ধেক অংশে প্রচন্ড ব্যথা। ক্লাসে বসা অবস্থায় চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল তার। বিষয়টি স্যারের চক্ষু এড়ায়নি। তিনি জিজ্ঞেস করে বিষয়টি জেনে হেড স্যারের রুমে পাঠিয়ে দিলেন ওকে। হেড স্যার বিষয়টি লক্ষ্য করে ছুটি দিয়ে দিলেন শায়লাকে।
সেদিন থেকে শায়লা মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। ব্যথা যখন বাড়ে তখন ওর হুশ থাকে না। নিজের চুল নিজেই টেনে ছিড়তে লেগে যায়। মা বাধা দিতে গেলে কামড় বসিয়ে দেয় মায়ের হাতে। শামছু ঘরে এসে এই অবস্থায় দেখে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলেন। পাড়া পড়শি বলল ‘মনে হয় ওরে জ্বিনে ধরছে কোনো মোল্লা মুন্সী থাইক্যা তেল পড়া লও। ভালো অইয়া যাইবো শায়লা।
গ্রামের জব্বর মুন্সীকে এনে ঝাড় ফুঁকের ব্যবস্থা করা হলো। একটু শান্ত হলো শায়লা। তবে পুরোপুরি ঠিক হয়েছে বলে মনে হলো না। ও পাড়ার যদু শেখ পরামর্শ দিল ‘ছুটু মোল্লা নামে এক নাম করা কবিরাজ আছে বাদাম্যা গ্রামে। তুমি গিয়া খবরাখবর লইয়া আহ।
শামছু এক শনিবারে বাদাম্যা গ্রামের পথে পা বাড়ান। সিএনজি, রিক্সা, আর পায়ে হেঁটে প্রায় বিশ কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌঁছলেন ছুটু মোল্লার বাড়ি। নিয়ম মতো তেল ও পানি এক বোতল করে সাথে রাখলেন। নাতিদীর্ঘ একটি টিনের ঘরে অনেক লোক বসা। কোন বেঞ্চ ডেস্ক নেই। চাটাই বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশ্য একটা পর্দা দিয়ে বসার স্থানকে দ্ইু ভাগ করা হয়েছে। এক দিকে পুরুষ আর অন্য দিকে মহিলা। মহিলার সংখ্যাই বেশি বলে মনে হলো শামছুর কাছে। মানুষের মুখ থেকে শামছু যে জিনিসটি বুঝতে পারল তাহলো এখানে যাদু টুনা বান, তাবিজ করে বশে আনা, দৈত্যের আছর দূর করা ইত্যাদির তদবির ও চিকিৎসা দেয়া হয়।
শামছু সহজ সরল প্রকৃতির। উনাকে যে যা বলে তাই করেন। বুদ্ধি বিবেচনা প্যাচ পাচ ইত্যাদির বিন্দুমাত্র নেই। যা শুনেন বা দেখেন তার মধ্যেই তার চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খায়। শামছু বসেছেন ছুটু মোল্লার চেম্বার ঘেষে। মোল্লা বা রোগী রোগীনির কথাবার্তা মোটামুটি শোনা যাচ্ছে সেখান থেকে। রোগীদের সমস্যা-উদ্দেশ্য সবই আসছে শামছুর কানে। শামছু অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষিত লোক। বাংলা স্পষ্ট লেখা পড়তে বা বুঝতে তেমন অসুবিধা হয় না। রোগীদের বসার ঘরের এক পাশে একটা কাগজ সাঁটানো। তাতে লেখা দেশি চিকিৎসা ফি ২০০ টাকা, সৌদি আরব তালাবি ৩০০ টাকা, লন্ডন আমেরিকায় তালাবি ৫০০ টাকা। বিষয়টি পুরোপুরি না বুঝে পাশের লোককে জিজ্ঞেস করলেন-ঐ যে লেখা দেখছেন এর মানে কী? লোকটি বললÑ রোগী দেশের ভিতর থাকলে ফি কম। কিন্তু বিদেশে থাকলে এখান থেকে বসেও চিকিৎসা দিয়ে থাকেন উনি।
ওহ হো... বুঝতে পারছি শামছু যোগ করেন। ছুটু মোল্লার এটেনডেন্ট সিরিয়েল নং দশ কল করলে শামছু নিজের টিকিট দেখেন। ১৫ নং সিরিয়েল তার। এখনও পাঁচ জন বাকী। কল শুনে এক মহিলা চেম্বারে ঢুকলেন। তিনি তার রোগের ব্যাপারে বলছেন-‘হুজুর আমি রোগী নই। রোগী আমার সোয়ামী। আইজ চাইর বশ্শর হয় উনি সৌদি আরবে গ্যাছে। প্রথম দিকে ট্যাহা টুহা দিতো। এহন কী জানি কে তাবিজ করছে! রেগুলার ট্যাহা দেয় না। দুই তিন মাস পর কিছু দেয়। রেগুলার ট্যাহা দেওনের লাইগ্যা কোনো ব্যবস্থা আছে?
ছুটু মোল্লা বলল-চোখ বন্ধ কইরা বইয়া থাহেন। আমার জিন্দা দৈত্যরে জিগাই। এই বলে ছুটু মোল্লা টেবিলে একটা লোহার হাতুড়ি দিয়ে তিন বার শব্দ করল। হঠাৎ স্পষ্ট উচ্চারণে অদ্ভুত ধরণের আওয়াজ হলো। মেয়েলি আওয়াজ। হুজুর আদেশ করুন। এই রোগীনীর সমস্যা কী?
হুজুর... সমস্যা... বুঝতে পারছি। আমি... সৌদি আরব থেকে তিন মিনিটের মধ্যে তাবিজ ছুইয়ে আসবো। ব্যস কাজ হয়ে যাবে। উনার স্বামী মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। বেশি করে পাঠাবে। ছুটু মোল্লা বলল ‘চোখ খুলুন। শুনতে পেয়েছেন।’ এবার তিন’শ টাকা বাক্সে ফালান। যান আপনি। কাজ অইয়া যাইবো। Ñনেক্সট।
এটেনডেন্ট হাক দিয়ে বললÑসিরিয়েল এগারো। এরই ফাকে শামছুর মাথায় বেশ বুদ্ধি খেলে গেল। অনেক চেষ্টা মেষ্টা করেও নিজের ভাগ্য বদলাতে পারতাছি না। এই হানে তো সুযোগ রইয়া গ্যাছে। জিন্দা দৈত্যটা সৌদি আরব তাবিজ নিয়া যায়। ফি নেয় মাত্র তিন’শ টাকা। আমারে যদি নিয়া যাইতো কোন ভিসা ছাড়া যাইতে পারতাম। অবশ্য তাবিজের তুলনায় আমার ওজন একটু বেশি। সেই তুলনায় ওরে বিশ হাজার ট্যাহা দিয়া দিতাম। এই যখন ভাবনা চিন্তা করছেন শামছু ঠিক তখনই ডাক পড়লÑসিরিয়েল পনের...
তড়িঘড়ি শামছু উঠে চেম্বারে ঢুকলেন।
Ñছুটু মোল্লা চোখ বন্ধ করে বললেন কী সমস্যা?
শামছু তার মেয়ের কথা আর তুলবেন না। এই পর্যন্ত যা ঘটেছে তার উপর একটা সমীক্ষা করে মনের কথাটি খুলে বললেন।
Ñছুটু মোল্লা একটু অবাক হলেও স্বাভাবিকভাবেই বলল এ আর এমন কি। আমার জিন্দা দৈত্যকে বললে এখনই নিয়া যাইবো। তয় ট্যাহা টুহা লগে আছে।
Ñনা এখনতো সঙ্গে আনি নাই।
Ñআগামী শনিবারে ট্যাহা বিশ হাজার নিয়া আইবা। সৌদি আরব পাঠাইয়া দিমু পাঁচ মিনিটের মধ্যে।
বাড়িতে গিয়ে শামছু কাউকে কিছু বলে না। শুধু নিরবে ভাবতে থাকে। বিদেশে যাওয়ার এতোবড় মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু তার কাছে এতো টাকা তো নেই। সম্পদ বলতে একখানি জমি আছে। বিক্রি করলে হয়তো বিশ পঁচিশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। শামছুর ঘনিষ্ট বন্ধু সাজু। ওর টাকা পয়সা আছে। বিদেশ থেকে ফিরেছে। শামছু গেলেন ওর কাছে। বিষয়টি খুলে বললে সাজু অবাক হলো। সে বুঝতে পারলো কোন ধান্ধা বাজের দেখা পেয়েছে শামছু। ও বলল-‘শামছু তুইযে বিদেশ যাবি জ্বিন মারফত বুঝলাম তোকে পৌঁছে দিল। কিন্তু ভিসা টিকেট পাসপোর্ট ইত্যাদি না থাকলে তো তোকে আবার দেশে পাঠাইয়া দিবো? তখন তো টাকাও গেল জায়গা জমিও গেল। শামছু বলল ঠিকইতো এটাতো ভাবি নাই। শোন শামছু আমার মনে হয় এই লোকটা প্রতারক। ওর নিজস্ব লোক দিয়া একটা দরবার সাজাইয়া লোকেদের থেইক্কা ট্যাহা লুটতাছে।
শামছু ভাবল আমি এতো বোকা ক্যান? যে যেডা কয় হেইডাই মাথায় নিয়া ঘুরি। চাইর সন্তানের জন্ম দিয়াও বুদ্ধিসুদ্ধি হয় নাই। আর কবে সেটা অইব হেইডাও জানা নাই।
নিজেরে ধিক্কার দেয় শামছু...।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT