ধর্ম ও জীবন

কবর- আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী কবরের আযাব কি সত্য?

প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৩-২০১৯ ইং ০২:১৭:২৮ | সংবাদটি ২৩০ বার পঠিত

কবরের আযাব সত্য। যা বহু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, নেককার মুমিনগণ যেমন কবরের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত আরাম আয়েশে থাকবে, তেমনি কাফের ও পাপিষ্টরা কবরের মধ্যে আযাব ভোগ করতে থাকবে। একবার হযরত আয়েশা (রা.) এর নিকট এক ইহুদি মহিলা আসল। মহিলাটি তার সামনে কবর আযাবের আলোচনা করে বললÑ ‘আল্লাহ তোমাকে কবর আযাব থেকে হেফাজত করুন’। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা.) এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ কবরের আযাব সত্য’। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, যখনই নবীজি নামায পড়েছেন তখনই কবরের আযাব থেকে মুক্তির দু’আ করেছেন। (বুখারি ১/১৮৩ পৃষ্ঠা, হাদিস নং- ১৩৫৬)
হযরত উসমান (রা.) যখন কোন কবরের নিকট দাঁড়াতেন তখন এতো অধিক পরিমাণ কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাঁড়ি ভিজে যেত। এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল-আপনি জান্নাত জাহান্নামের আলোচনায় এতো অধিক পরিমাণে কাঁদেন না, কবর দেখে আপনার এতো বেশি কান্নাকাটি করার কারণ কি?
হযরত উসমান (রা.) উত্তর দিলেন, নবীজি ইরশাদ করেছেনÑ ‘নিশ্চয়ই কবর আখেরাতের ঘাঁটিগুলোর প্রথম ঘাঁটি। যদি এই ঘাঁটি থেকে নাজাত পাও, তাহলে অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলো পার হওয়া আরও বেশি সহজ। আর যদি এই ঘাঁটি থেকে বাঁচতে না পার তাহলে অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলো অতিক্রম করা আরও কঠিন। (তিরমিযি শরীফ)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেছেন, নামাযের জন্য একদিন নবীজি মসজিদে তাশরিফ আনলেন। তিনি দেখলেনÑ কিছু লোক খিল খিল করে হাসছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেনÑ ‘যদি তোমরা সকল আস্বাদনকে নিঃশ্বেস করে দেবার মতো জিনিস মৃত্যুকে স্মরণ করতে তাহলে তা হাসিকে রুখে দিত। মৃত্যুকে বেশি বেশি করে স্মরণ কর। মৃত্যু সকল হাসি তামাশাকে নিঃশেষ করে দেয়। কবর প্রতিদিন বলে, আমি মুসাফেরীর ঘর, আমি নির্জন কুঠরী, আমি মাটির ঘর, আমি পোকা মাকড়ের ঘর। কোন মুমিন বান্দাকে যখন দাফন করা হয় কবর তাকে অভ্যর্থনা জানায়। সে বলে আমার পিঠের উপর বিচরণকারীদের মধ্যে তুমি আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় মানুষ ছিলে। আজ যখন তোমাকে আমার দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং তুমি আমার কাছে এসে পড়েছো, তখন তুমি দেখবে আমি তোমার সাথে কতো ভালো ব্যবহার করি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এ মুমিন বান্দার জন্য কবর তখন দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হবে। তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেয়া হবে। আর যখন কোন কাফির বা পাপিষ্ট লোককে দাফন করা হয়, কবর তখন তাকে অভ্যর্থনা জানায় না। সে বলেÑ আমার পিঠের উপর বিচরণকারীদের মধ্যে তুমি সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট লোক ছিলে। যেহেতু এখন তোমাকে আমার নিকট সমর্পণ করা হয়েছে এবং আমার কাছে তুমি এসে পড়েছো, এখন তুমি দেখবে তোমার সাথে আমি কতো নিষ্ঠুর আচরণ করি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তারপর তোমার জন্য কবর খুব সংকুচিত হয়ে যাবে। এমনকি তার একটি পাঁজর অপরটির মধ্যে ঢুকে পড়বে। একথা বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাতের আঙ্গুলগুলোকে অপর হাতের আঙ্গুলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন, তারপর বললেন তার উপর সত্তরটি বিষধর সাপ ঢেলে দেয়া হবে। এর প্রত্যেকটি সাপ এতো বেশি বিষাক্ত হবে যে, মাটিতে যদি তারা শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়ত তাহলে এর বিষক্রিয়ার ফলে এ মাটি তার উৎপাদন শক্তি হারিয়ে ফেলতো। এ বিষধর সাপগুলো এ ব্যক্তিকে ছোবল মারবে ও কাটবে। হিসাব নিকাশের দিন পর্যন্ত এ আযাব এভাবে চলতে থাকবে। তারপর হিসাব নিকাশের জন্য তাকে আল্লাহর দরবারে হাজির করা হবে। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, কবর মানুষের জান্নাতের বাগিচা সমূহের একটি বাগান বনে যায়, অথবা জাহান্নামের গর্তের মতা একটি গর্ত হয়ে যায়। (তিরমিযি শরীফ)
অর্থাৎ, মানুষ যদি যথা সম্ভব খারাপ কাজ ও অন্যায় হতে বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করে এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাহলে কবরের এ মধ্যবর্তী জীবনে আল্লাহ তার সাথে করুণাপূর্ণ ব্যবহার করেন। সে ব্যক্তি আনন্দ আহলাদ অনুভব করবে। আর যে ব্যক্তি জীবনভর নষ্টামী ভন্ডামী করে শরীয়ত বিরোধী কাজ করে, তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তার সাথে এমন আচরণ করা হবেÑ যেমন আচরণ আদালতে পেশ করার পূর্বে কোন আসামীর সাথে হাজতবাসে হয়ে থাকে। হাদিস শরীফের শেষাংশের অর্থ হলোÑ মানুষ ইচ্ছা করলে তার নেক আমল দ্বারা কবরের জীবনকে আরাম আয়েশ, সুখ ও স্বাচ্ছন্দের জীবনে পরিণত করতে পারে। আবার তার খারাপ আমল দ্বারা তার কবরের জীবনকে দগ্ধিভূত আযাবের স্থানে পরিণত করতে পারে।
হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন (মুনকার নাকীর ফেরেশতার প্রশ্নের জবাবে) পাপিষ্টরা যখন উত্তর দেয়, হায়! হায়! আমি জানিনা। তখন আসমান থেকে একজন ঘোষণাকারী আওয়াজ দিয়ে বলেন এই ব্যক্তি মিথ্যা বলেছে। তার পায়ের নিচে আগুন জ্বালিয়ে দাও, তাকে আগুনের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও। তখন জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। সেখান দিয়ে জাহান্নামের তাপ ও লুহাওয়া তার কবরে আসতে থাকে। তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় যে, তার এক পার্শ্বের পাঁজর অপর পার্শ্বে চলে যায়।
অতঃপর তাকে আযাব দেওয়ার জন্য এমন একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয় যে চোখে দেখে না, কানে শুনে না। তার নিকট লোহার মুগুর থাকবে। সেই মুগুরের অবস্থা হল, তা দ্বারা কোন পাহাড়ে আঘাত করা হলে পাহাড় মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। যখন একবার মুগুর মারা হয়, তখন মানুষ ও জিন ব্যতিত পৃথিবীর সকল প্রাণী সেই আওয়াজ শুনতে পায়। কেবল একবারের আঘাতেই সে মাটিতে পরিণত হয়ে যায়। পুনরায় তার শরীরে রূহ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। (আহমদ, আবু দাউদ, হাদিস নং-১৮৭৩৩)
বুখারি ও মুসলিম শরীফের এক রেওয়ায়েতে আছে মুগুরের আঘাতের কারণে মুর্দা এমন জোরে চিৎকার করে ওঠে যে, মানুষ ও জিন ব্যতিত আশে পাশের সকল কিছুই সে চিৎকার শুনতে পায়।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একবার নবী করিম (সা.) দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনÑ এই কবর দু’টিতে আযাব হচ্ছে। তবে বড় কোন অপরাধের কারণে আযাব হচ্ছে না বরং এমন সাধারণ বিষয়ের জন্য আযাব হচ্ছে যা থেকে তারা একটু চেষ্টা করলে বাঁচতে পারত।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) উভয়ের গোনাহের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বলেন, তাদের একজন প্র¯্রাব করার সময় পর্দা করতো না (অন্য একটি বর্ণনায় আছে প্র¯্রাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতো না তথা ঢিলা, কুলুপ, পানি ব্যবহার করতো না। আর দ্বিতীয়জন চোগলখোরী করতো অর্থাৎ একের কথা অন্যের কাছে বলে বেড়াত। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি তাজা ডাল চেয়ে নিলেন। ডাল আনার পর মাঝখানে চিরে দু’টুকরা দু’কবরের উপর গেড়ে দিলেন। সাহাবাগণ আরয করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি এমন করলেন কেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হয়তো ডাল শুকানো পর্যন্ত তাদের কবর আযাব হালকা করে দেওয়া হবে। (বুখারি শরীফ, ১/১৮৪ পৃষ্ঠা, হাদিস নং- ১৩৬২)

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT