স্বাস্থ্য কুশল

যক্ষ্মা নির্মূলের এই তো সময়

ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৪-২০১৯ ইং ০১:১৮:০৯ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

আমাদের দেশে যক্ষ্মা এখনও একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে শুধু যে নি¤œ আয়ের মানুষরাই আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়, বরং এই রোগ যে কারোরই হতে পারে। সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার যক্ষ্মারোগী মারা যাচ্ছে। সারা বিশ্বে এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে : যক্ষ্মা রোগীর কাছাকাছি থাকেন এমন লোকজন- যেমন, পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, নার্স বা সেবা-শুশ্রƒষাকারীর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, মাদক সেবন, বার্ধক্য, অপুষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যক্ষ্মার ঝুঁকি থাকে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম যেমন- এইডস রোগী, দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধসেবী মানুষের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যক্ষ্মা কেবল ফুসফুসে হয় না : শতকরা ৮৫ ভাগ যক্ষ্মা ফুসফুসে হয়ে থাকে। ফুসফুসের আবরণী বা প্লুরাতে যক্ষ্মা হয়। লসিকা গ্রন্থি, মস্তিষ্কের আবরণী, হাড়, অন্ত্র ও ত্বকেও যক্ষ্মা হতে পারে। শুধু হৃৎপি-, নখ এবং চুল যক্ষ্মা রোগের আওতামুক্ত।
ফুসফুসের যক্ষ্মা আবার দুই ধরনের স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ বা কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী এবং স্পুটাম স্মিয়ার নেগেটিভ বা কফ জীবাণুমুক্ত যক্ষ্মা রোগী। এ দুই গ্রুপের মধ্যে স্মিয়ার স্পুটাম পজেটিভ রোগীরাই মারাত্মক সংক্রামক।
এদের ফুসফুস থেকে নির্গত যক্ষ্মা জীবাণু বাতাসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ লোকের শরীরে প্রবেশ করে এবং নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পর এদের মধ্যে কেউ কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার আওতায় আসেনি এমন একজন স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ রোগী বছরে একজন করে নতুন যক্ষ্মা রোগীর জন্ম দেয়।
যক্ষ্মার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেই কি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হবে : যক্ষ্মা রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত নাও হতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেও যক্ষ্মার জীবাণু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুসে বংশবৃদ্ধি করতে পারে, এর ফলে যক্ষ্মার সংক্রামক রোগ হতে পারে। তবে এর উপসর্গগুলো তেমন বোঝা যায় না এবং রোগ ছড়ায় না, বরং সুপ্তাবস্থায় থাকে।
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, যক্ষ্মার জীবাণু খুব দ্রুত তাদের শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং দ্রুতাকারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় রক্ষাকারী কোষগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। একে সক্রিয় যক্ষ্মা বলা হয়ে থাকে। আবার বছরের পর বছর যদি যক্ষ্মা রোগের জীবাণু শরীরে থেকে যায়, তাহলে কোনো এক সময় সুপ্ত যক্ষ্মা থেকে সক্রিয় যক্ষ্মায় রূপ নিতে পারে।
ফুসফুসের যক্ষ্মার লক্ষণ : তিন সপ্তাহের অধিক সময় ধরে কাশি (শুকনো/কফযুক্ত) অন্যতম লক্ষণ। কাশির সঙ্গে রক্ত যেতেও পারে, নাও যেতে পারে। বুকে ব্যথা হওয়া, অস্বাভাবিকভাবে ওজন হ্রাস পাওয়া, অবসাদ অনুভব করা, সন্ধ্যায় হালকা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর (৯৯-১০১ ডিগ্রি) থাকতেও পারে/নাও থাকতে পারে, রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া ও ক্ষুধা মন্দা।
যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা : যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা সাধারণত দুই ভাগে বা ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। ক্যাটাগরি একÑ ছয় মাস ধরে ওষুধ খাওয়া। ক্যাটাগরি দুই : আট-নয় মাস ধরে ওষুধ খাওয়া। এছাড়া, চিকিৎসা ব্যর্থতা কিংবা রোগী পুনরায় যক্ষ্মা আক্রান্ত হলে সেভাবেই চিকিৎসা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।
কখন সতর্ক হবেন : তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাশি (কাশির সঙ্গে রক্ত যেতেও পারে, নাও যেতে পারে), জ্বর, অরুচি, ওজন কমা, অবসাদ ইত্যাদি দেখা দিলে অবশ্যই যক্ষ্মা পরীক্ষা করা উচিত। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে লসিকাগ্রন্থির স্ফীতি, মলত্যাগের অভ্যাসে আকস্মিক পরিবর্তন, কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য, কখনও ডায়রিয়া, বুকে বা পেটে পানি জমা ইত্যাদিও যক্ষ্মার উপসর্গ হিসেবে বিবেচ্য।
যক্ষ্মা প্রতিরোধে করণীয় : যক্ষ্মা প্রতিরোধে জন্মের পরপর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেয়া। ফুসফুসের যক্ষ্মা ছোঁয়াচে। কেবল স্পর্শে এ রোগ ছড়ায় না। এ রোগ ছড়ায় হাঁচি, কাশি আর কফের মাধ্যমে। তাই রাস্তাঘাটে হাঁচি-কাশির বেগ এলে মুখে রুমাল চাপা দেয়া উচিত। যত্রতত্র কফ ফেলা উচিত নয়।
যক্ষ্মা নিয়ে ভয় নেই : যক্ষ্মা হলেও আতঙ্কিত হবেন না। আগে বলা হতো ‘ যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই’। এখন বলা হচ্ছে, যক্ষ্মা ওষুধে ভালো হয়। যক্ষ্মা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ছয় থেকে নয় মাসের পূর্ণ ডোজ ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিনামূল্যে এ ওষুধ প্রদান করে থাকে। ওষুধ অনিয়মিত খেলে পরবর্তী সময়ে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা হতে পারে, যা সারানো খুব জটিল।
দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি ক্লিনিক বা হাসপাতাল, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এনজিও ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়সহ যক্ষ্মার চিকিৎসা করা হয় ও ওষুধ দেয়া হয়। পূর্ণ মেয়াদে ওষুধ সেবন করতে হবে। তাই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • পিত্তথলীর ভেষজ চিকিৎসা
  • ফুটপাতের শরবত আর চাটনি : সংকটে জনস্বাস্থ্য
  • স্মৃতিশক্তি সমস্যা : করণীয়
  • যক্ষ্মা নির্মূলের এই তো সময়
  • মলদ্বারের রোগে পেটের সমস্যা
  • ব্যথার ওষুধ খাবেন সাবধানে
  • অতিরিক্ত ওজন ও স্থুলদেহী প্রসঙ্গ
  • স্বাস্থ্য রক্ষায় খতনা
  • আপনিই সুস্থ রাখতে পারেন আপনার কিডনি
  • এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্কতা
  • মুখের আলসার ও টুথপেস্টের রসায়ন
  • গলার স্বর বসে গেলে
  • মেছতার আধুনিক চিকিৎসা ডাঃ দিদারুল আহসান
  • স্ক্রিনে দীর্ঘসময় শিশুর মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে
  • প্রকৃতির মহৌষধ মধু
  • তাফসিরুল কুরআন
  • প্রসব পরবর্তী থায়রয়েড গ্রন্থির প্রদাহ
  • শ্বাসকষ্ট কোনো রোগ নয়!
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • শীতে বয়স্কদের সমস্যা
  • Developed by: Sparkle IT