মহিলা সমাজ

নারী ও দেশের মাটি

অমিতা বর্দ্ধন প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৪-২০১৯ ইং ০১:৩০:৫২ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত



দৈনিক সিলেটের ডাকের ‘মহিলা সমাজ’ বিভাগে ‘একাত্তরের নির্যাতিতা’ শিরোনামে লেখিকা গুলশান আরা একটি নিবন্ধ লিখেছেন। উক্ত নিবন্ধে তিনি যে ঘটনা তুলে ধরেছেন পাঠকের অন্তর আয়নাতে তা লোমহর্ষক ও অত্যন্ত পীড়াদায়ক। আমি লেখিকাকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে যাচ্ছি না; আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিনীত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে এমন একটি বিশ্লেষণপূর্ণ একাত্তরের ঘটনা প্রবাহের মধ্যে নারীদের উপর কিরূপ জঘন্য নির্যাতন ঘটেছিল, তারই সচিত্র প্রতিবেদন তার লিখনীতে স্থান পেয়েছে।
পাক বর্বর কাহিনী আমরা সবাই কিছু না কিছু অবগত। কিন্তু সেই কাহিনী যে কতোটা নির্মম, জঘন্য, বিভৎস তা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী জ্ঞানী, গুণী ও সুধী সমাজই জানেন। কিন্তু আমার মতো একজন সাধারণ পাঠককে উক্ত লিখাটি প্রবলভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞজনদের কাছে এবং মিডিয়াতে যতোখানি জেনেছি তা বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ঠতম ঘটনা, এরকম বর্বরতা ও নোংরামি বিশ্বে আর কোথাও ঘটেনি। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত লিখাটির বিশদ বিবরণটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।
নারী জাতি শক্তি রূপিনী এবং প্রকৃতি স্বরূপা। আর তাই একজন পুরুষের জীবনসঙ্গীনী হিসাবে বিয়ের মাধ্যমে একজন নারীকে বেঁধে দেওয়া হয়। নারী ছাড়া যেমন একজন পুরুষের জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে, তেমনি পুরুষ ছাড়াও একজন নারীর জীবনে পরিপূর্ণতা আসে না। তারা একে অন্যের পরিপূরক। কারণ ‘মা’ ডাকেই নারীর জীবনে পরিপূর্ণতা পরিস্ফুটিত হয়। পুরুষের জীবনও ‘বাবা’ ডাকে হয়ে ওঠে সুন্দর ও মধুময়। সেই নারীই আবার জন্মদায়িনী ‘মা, বোন, কন্যা, জায়া ইত্যাদি নানাভাবে সম্পর্কিত। বিভিন্ন মত ও পথের সাধকগণ বা ধর্ম বেত্তাগণ বাণী দিয়েছেন, উপদেশ দিয়েছেন নারী মাতৃস্বরূপা, তাদের সম্মান দিতে হবে যথাযথভাবে, তবেই পরিবারের মঙ্গল, সমাজের মঙ্গল তথা দেশের মঙ্গল। যতোদিন পর্যন্ত নারীদের মুক্তি না হয়েছে বিশেষ করে আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে, ততোদিন পর্যন্ত দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। কারণ একটা পাখি কখনো এক পায়ে দাঁড়াতে পারে না এবং একটি পাখা দিয়ে উড়তে পারে না; তাই দেশ ও জাতির উন্নতি তখনই সম্ভব যে জাতি যে সমাজ নারী পুরুষ উভয়কে সম মর্যাদা ও উপযুক্ত সম্মানে ভূষিত করে থাকে। অবিভক্ত ভারতে যখন ব্রিটিশ শাসন ছিল, তখন নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয় ও ভয়াবহ রূপে নারীদের বিভিন্নভাবে পদদলিত করে তাদের একটা বিশ্রী শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা হতো। সেটা কি পারিবারিক, কি সামাজিক এবং রাজনৈতিক- সর্বক্ষেত্রে নারীরা ছিল ভোগ্যপণ্য হিসেবে। নারী জাতির এই অবমাননা, অবমূল্যায়ন এবং সামাজিক যাতাকলে নিষ্পেষিত অর্থাৎ সমগ্র নারী সমাজ ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। সমগ্র বাংলার এই নারী জাতির চরম দুর্দিনে আর্বিভূত হয়েছিলেন এক মহীয়সী নারী যিনি নিজেকে সমগ্র বিশ্বের মানুষের ‘মা’ বলে দাবী করেছেন। জগৎ জননী; সত্যিকারের মা অর্থাৎ জন্ম জন্মান্তরের ‘মা’ বলে এবং জগতের মা বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পৃথিবীতে এমন অভয় ও শান্ত¦নার বাণী ইতিহাসে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেছেনÑ ‘আমি মা থাকতে তোমাদের ভয় কী?’ সন্তান যদি কাদামাটি ধুলো বালি মেখে আসে মাকেই তো সেটা পরিষ্কার করে দিতে হবে। তোমরা জেনে রেখ তোমাদের একজন মা রয়েছে। যিনি কথায় কথায় মা নন, পাতানো মা নন, সত্যিকারের জননী।’ সেই জগৎ জননী পৃথিবীর নারী জাতির ঘোর দুর্দিনে আবির্ভূত হয়েছিলেন জগতে মাতৃভাব প্রচারের জন্য। কারণ অনেক সাধক বড় বড় দিকপালগণ তারা পরম করুণাময় ঈশ্বরকে মাতৃভাবে সাধনা করে গিয়েছেন
তাদের সাধনালব্ধ জ্ঞান সহজে লাভ করার জন্য। সেই জগৎ মাতার নাম ‘সারদামনি’। তাঁর সময়ই নারীর জাগরণ শুরু হয়েছিল। সেটা আমরা দৃষ্টান্তের মধ্যেই বুঝতে সক্ষম হব তিনি যে নারী জাতির সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য কতোখানি উদগ্রীব ছিলেন। তখনকার সময়ে নারী তথা মেয়েদের লেখাপড়ার কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মেয়েরা যতোদিন পর্যন্ত শিক্ষিত অর্থাৎ লেখাপড়া শিখে সমাজে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা না করতে পেরেছে ততোদিন তারা পুরুষ শাসিত সমাজের যাতাকলে নিষ্পেষিত হবে। তাই তিনি সুদূর আমেরিকা থেকে ‘নিবেদিতা’ কে বাংলায় এনেছিলেন নারী শিক্ষার জন্য। নিবেদিতা একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন সমাজে মেয়েদের লেখাপড়ার গুরুত্ব আরোপ করলেন। আজকের বিশ্বায়নের যুগে যে ‘নারী শিক্ষা’ নারী প্রশিক্ষণ এবং দেশের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে, দেশ পরিচালনায় নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য সেটা কিন্তু ঐ মহীয়সী জগৎ জননী ‘সারদামনি’র অন্তরের অন্তঃস্থলের অভিপ্রায় ছিল। সেটা আজ প্রতিফলিত হচ্ছে।
একদিন তিনি প্রার্থনায় বসেছেন। গভীর ধ্যানে মগ্ন- এমন সময় পাশের একটি বস্তি থেকে এক মহিলার আর্তনাদ ও কান্না শুনতে পেলেন; মহিলার স্বামী তাকে মারছে, তিনি তার ধ্যানে থাকতে পারেননি। তৎক্ষণাৎ ওঠে মহিলার স্বামীকে তিরস্কার ও ধমক দিলেন। এভাবে তিনি সামাজিক সমস্যা সমাধান করেছেন।
ব্রিটিশ শাসনকালে এক পুলিশ একজন গর্ভবতী মহিলাকে টেনে হিচড়ে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছিলো। মহিলা কাতরভাবে বলছে ছেড়ে দেবার জন্য কিন্তু পাষন্ড পুলিশ যেন আরো কঠোর আচরণ করছে। জগৎ জননী মা শুনে বললেন- তখন কী কেউ ছিলো না? যে থামাতে পারতো? সেটা কি পুলিশের কারিগরী না সরকারের আদেশ? মা অত্যন্ত শোকাতুর হয়েছিলেন। এ রকম অনেক ঘটনা রয়েছে যা শুনলে বা পড়লে হৃদয় মন তাঁর শ্রীপাদপদ্যে প্রণতি জানাই। কারণ ৭১ সালে যারা এদেশের ৩০ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত লুটেছে, অত্যন্ত নিঃসংশভাবে নারকীয় নির্যাতন নররূপী পশুরা করেছে, তাদের বিচার কাজ অর্থাৎ যোদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ আজ তোমারই কৃপায় হতে যাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধে যারা অনন্য অবদান রেখেছেন, তাদের নামে বিভিন্ন রাস্তা, সেতু, কালভার্ট স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। সেটা অত্যন্ত আনন্দের ও তৃপ্তির বিষয়। কিন্তু এ পর্যন্ত কোথাও কোন নারীর নামে কোনো স্থাপনা করা বা কোনো ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে কি না আমার জানা নেই।
বর্তমান সরকার নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন, তা খুবই যুগোপযোগী। বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন একাত্তরে যে সকল মা বোনেরা তাদের ইজ্জত, নারীত্ব হারিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, আজ তাদের চোখের দৃষ্টি বড় অসহায়ত্বের জবাব দেয় যে, এ সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের। একাত্তরে নারীরা হারিয়েছে তার স্বামী, হারিয়েছে ভাই, পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি। একাত্তরে কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা গোয়েন্দার কাজ করছেন। মুক্তিবাহিনীকে রান্নাকরে খাইয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন। খবর আদান-প্রদান করেছেন ভিখারীর বেশে। তাই নিঃর্দ্বিধায় বলা চলে, একাত্তরে নারী সমাজের অবদান অনেক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT