মহিলা সমাজ

স্বপ্নযাত্রা

মেহেরিমা সুলতানা প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৪-২০১৯ ইং ০১:৩২:১৭ | সংবাদটি ২৩৫ বার পঠিত

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মা সবসময় অসুস্থ থাকতেন। সে জন্য বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আমরা দুই বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন দুরারোগ্য ব্যাধিতে মা মারা গেলে আমি প্রায় একা হয়ে যাই। মা চলে যাবার পর বাবা কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দিতে চাইতেন না, তবুও কেন জানি আমার নিজেকে খুব একা মনে হত। লেখাপড়ায় ভাল ছিলাম, প্রাইমারিতে টানা কয়েক বছর রোল ছিল ২ এর মধ্যে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আসা করার সময় অনেক ছেলের বিরক্তির শিকার হয়েছি, তবুও কখনো ভেঙে পড়িনি। বাবা বলতেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে, বাঁধা বিপত্তিতে ভেঙে পড়লে চলবে না।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন পাশের এলাকার এক ছেলেকে ভাল লেগে যায়। তখন থেকেই জীবনের ঝড় শুরু। স্কুল পালিয়ে নদীতীরে ঘুরতে যাওয়া, প্রতিরাতে ফোনে কথা বলা। এ সব কিছু আমাকে লেখাপড়া থেকে প্রায় দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল। পরিবারের চোখে ব্যাপারটি ধরা পরার পর বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তবুও অনেক বুঝিয়েছেন, এ সময়টা নিজেকে গড়ে তোলার। তখনো আমি বুঝতে পারিনি উল্টো বাবাকে ভুল বুঝেছি। এদিকে ছেলেটি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রতি মাসে অনেক টাকা পয়সাও হাতিয়ে নিয়েছে। এভাবে এক বছর চলতে চলতে পরিবারের সবাই বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিল আমাকে বিয়ে দিবে। বড় আপুর শ্বশুর বাড়ির পাশেই জানাশোনা এক ছেলে আছে ইঞ্জিনিয়ার। অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই বিয়েও হয়ে যায়। নিজ বাড়িতে থেকে কোন রকম জেএসসি পাস করার পর স্বামী একপ্রকার জোরপূর্বক নিজের কাছে নিয়ে আসে। ভর্তি করে দেয় শহরের নামীদামী এক স্কুলে। প্রতিদিন সকালে অন্য মেয়েরা কেউ বাবার সাথে কেউ ভাইয়ের সাথে আসলেও আমি আমার স্বামীর সাথে স্কুলে যেতাম। আবার তার সাথেই বাসায় ফিরতাম।
মাধ্যমিকে পড়াকালীন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে কেমন লাগে আমি জানিনা। ওই বয়সে হাতে চুড়ি, নাকের নথ, স্কুল শেষে রান্নাঘর পরিষ্কার, স্বামীর কাপড় ধোয়া, শাশুড়ির সেবা করা আমার জিবনটাকে প্রায় একঘেয়ে করে তুলেছিল। তাছাড়া শাশুড়ির সারাদিন প্যানপ্যান, বাচ্চা নিব কবে? তখন প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনটা তো সবেমাত্রই শুরু, পড়তে হবে আমাকে, দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। পিছনের সব বাঁধাকে উপেক্ষা করে সামনে এগুতে শুরু করলাম। সারাদিন রুটিনের সব কাজ শেষে গভীর রাত পর্যন্ত পড়তাম। মাধ্যমিকে ভাল ফল হল আমার। একজন ভাল বন্ধুর মতো স্বামীকে পাশে পেলাম, তখনো শাশুড়ির প্যানপ্যানানি বন্ধ হয়নি। স্বামীর ঐকান্তিক সহযোগিতায় শহরের বড় কলেজ থেকে ভাল ফল করে আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আজ আমি স্বপ্ন দেখি, পিতার মুখ উজ্জ্বল করার সময় আমার শেষ হয়ে যায়নি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT