মহিলা সমাজ

প্রিয় স্বদেশ

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৪-২০১৯ ইং ০১:৩৮:২৯ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত



একটি সভ্য জাতির কাছে স্বাধীনতার চেয়ে প্রিয় কিছু আর নেই। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম। এ সাহসী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমধারায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ উপ্ত হয়েছিল। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি দেবার পাশাপাশি এ সংগ্রাম অন্য জাতির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে আমাদের রক্ষা করে জাতি গঠন ও আত্মবিশ্বাসের সুযোগ করে দিয়েছে।
১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি ইংরেজ শাসক এ দেশ থেকে বিদায় নিলেও স্বাধীনতার স্বাদ এ দেশের মানুষ পায়নি। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি এক রাষ্ট্রের নামে তাদের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ছাত্র সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের বাঙালিদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে। দীর্ঘ দিনের অধীনতা ও অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকারে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ এই জনপদে জ্বলে ওঠেছিল ছোট্ট মাটির প্রদীপ।
দীর্ঘ ৯ মাসের জমাট বাঁধা অন্ধকারে এই প্রদীপই এ জনপদের মানুষের মনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল আশার ক্ষীণ আলো। এ প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তাই হয়ে ওঠে দিবালোকের মতো উজ্জ্বল। ২৬শে মার্চের সূচিত স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষীণ ধারাটি ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ উপত্যকায় হাজারো প্রান্তে অসংখ্য রক্ত ¯্রােতের সৃষ্টি করে।
চূড়ান্ত পর্যায়ে তার সম্মিলিত প্রবাহ ১৬ই ডিসেম্বরের সমাজ জীবনের দু’কূল ছাপিয়ে যে মহা প্লাবনের সৃষ্টি করে তার ফলে জন্মলাভ করে স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতার স্বর্ণ দ্বীপ বাংলাদেশ। ২৬শে মার্চকে তাই জাতি স্মরণ করে আত্মমর্যাদার দিগদর্শন রূপে। স্মরণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দুর্জয় প্রত্যয় হিসেবে।
১৯৭১ সালের পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার গভীর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) নিরীহ জনগণের ওপর হামলা চালায়। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ হয়। অনেক স্থানে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অনেক স্থানে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকান্ড চালানো হয়।
এমতাবস্থায় বাঙালিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং অনেক স্থানেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা না করে অনেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাবার পর আপামর বাঙালি জনতা, পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সারা বাংলার জনজীবন স্তব্ধ হয়ে গেলো। পাকিস্তানী স্বৈরাচারদের দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে ঘোষণা করলেনÑ
‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
২৫ মার্চ রাতে সামরিক শাসকের পেটোয়া বাহিনী ঘুমে অচেতন বাঙালির ওপর আক্রমণ চালানো শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৭ মার্চ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন।
২৫ মার্চ রাতে সারা বাংলাদেশে সংগ্রামের আগুন জ্বলে ওঠে। দেশের অনেক মানুষ নিরুপায় হয়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গে আশ্রয় নেয়। সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চললো। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাঙালি ছিনিয়ে আনলো বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সূর্য। লক্ষ বাঙালির হাতে সেদিন শোভা পেয়েছিল লাল সবুজের মাঝে হলুদ মানচিত্র খচিত জাতীয় অহংকার ও স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকা। এভাবেই বিশ্বের বুকে সেদিন নতুন রাষ্ট্র সগৌরবে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে।
১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে এ দিনকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। জাতীয় জীবনে স্বাধীনতার তাৎপর্য অপরিসীম। এ দিনটি বাঙালির জীবনে বয়ে আনে একই সঙ্গে আনন্দ বেদনার অম্লমধু অনুভূতি।
দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আমাদের এই দেশটি পেয়েছি। আজ পৃথিবীর বুকে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা স্বাধীনতা। আজ আমাদের দায়িত্ব এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সুখী সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT