ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গ্রাম বাংলার ঢেঁকি

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৫:০৫ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত

‘ধান ভানিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে, আমি নাচি, হেলিয়া দুলিয়া’... এ গান গেয়ে গ্রাম বাংলার নারীরা এক সময় ঢেঁকিতে পাড় দিতেন। ভানতেন ধান, চালসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য। ঢেঁকির ধাপুর ধুপুর শব্দ এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছড়িয়ে পড়তো। দিনভর ঢেঁকির ধাপুর ধুপুর শব্দে মুখরিত থাকত পুরো গ্রাম। ঢেঁকি সাধারণত নারীরাই ব্যবহার করতো। ঢেঁকি কমপক্ষে দু’জন নারীকে চালাতে হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। হারিয়ে গেছে অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য। এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ঢেঁকির প্রচলন দেখা যেতো। পিঠা পায়েশ তৈরির জন্য গ্রামের বধূরা ঢেঁকিতেই চাল গুড়া করতেন। তাছাড়া ধান ভানা, হলুদের গুড়া, চাউলের গুড়া ও চিড়া তৈরি সহ নানান কাজে ঢেঁকির ব্যবহার হতো। আশির দশক পর্যন্ত ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছিল তবে আধুনিক কারখানা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে ঢেঁকির প্রচলন হারিয়েছে। পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। গ্রাম গঞ্জের প্রতিটি হাট বাজারে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। গ্রামে শ্যালো ইঞ্জিন কিংবা ধান ভাঙ্গার মেশিন ও ছড়িয়ে পড়েছে। ভাসমান মেশিন দিয়েও এখন ধান, চাল, গমসহ নানান খাদ্য সামগ্রী ভাঙ্গানো হচ্ছে।
ঢেঁকি গ্রাম বাংলার বউ ঝি’দের প্রাত্যহিক ব্যবহৃত যন্ত্রবিশেষ। এর সাথে তাদের হাসি কান্না মিশ্রিত জীবনযাত্রা জড়িয়ে ছিলো। তারা আমোদ ফূর্তির মধ্যে দিয়ে অর্থাৎ গান গেয়ে, গল্প করে ঢেঁকিতে পাড় দিতেন।
এ যন্ত্রে কাজ করেন কয়েকজন মহিলা। সাধারণত ঢেঁকিতে প্রায় ৭২ ইঞ্চি লম্বা এবং ৬ ইঞ্চি ব্যসবিশিষ্ট একটি কাঠের ধড় থাকে। মেঝে থেকে প্রায় ১৮ ইঞ্চি উচ্চতায় ধড় ও দু’টি খুঁটির ভিতর দিয়ে একটি ছোট হুড়কা বা বল্টু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এ হুড়কার উপরেই ধড়টি ওঠানামা করে। ধড়ের এক মাথার নিচের দিকে সিলিন্ডার আকারের প্রায় ১৮ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ৬ ইঞ্চি ব্যসবিশিষ্ট এক টুকরো কাঠ যুক্ত করে দেওয়া হয়। এ কাষ্টখন্ডের নি¤œপ্রান্ত একটি লোহার বলয় দিয়ে পরিবৃত করা হয় এবং এটি মুষলের কাজ করে। ধড় এটিকে উপরে তোলে, নিজের ওজনে এটি নিচে পতিত হয়। হুড়কা তার শক্তি বৃদ্ধি করে। মুষল থেকে ধড়ের মোট দৈর্ঘ্যরে পাঁচ অষ্টমাংশ দূরত্বে স্থাপিত হুড়কা উপস্তম্ভের কাজ করে থাকে।
সাধারণত ২-৩ জন মহিলা এ ঢেঁকিতে কাজ করেন। ১-২ জন মুষল উত্তোলনের জন্য ধড়ের এক প্রান্তে পা দিয়ে পালাক্রমে চাপ দিয়ে থাকেন এবং পা সরিয়ে নিয়ে মুষলকে নিচে পড়তে দেন। অপর মহিলা বৃত্তাকার খোড়ল থেকে চূর্ণীকৃত শস্য সরিয়ে নেন এবং তাতে নতুন শস্য সরবরাহ করেন। মুষলের আঘাত ধারণ করার জন্য খোঁড়লটি কাটা হয় মাটিতে বসানো এক টুকরা শক্ত কাঠের গুড়িতে। ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার কাজ খুবই শ্রমসাপেক্ষ। কাজটিতে মহিলাগণ একে অপরের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে থাকেন। পরিশ্রম লাঘব করার জন্য এ কাজে নিয়োজিত মহিলাগণ কোনো কোনো সময় গান গেয়ে থাকেন।
বর্তমান আধুনিক যুগে সহজলভ্য হয়েছে চলমান জীবনের কার্যক্রমের গতিধারা। অনেক কষ্ট করে গ্রামের বধূদের ধান ভানতে হতো। তাছাড়া চাল থেকে গুড়া তৈরি করতে হতো। যা অনেকটাই কষ্টসাধ্য ছিলো। কিন্তু এখন কারখানার মাধ্যমে খুব সহজেই চাল থেকে গুড়া তৈরি করা যায়। ঢেঁকি প্রধানত ধানের তুষ ছাড়িয়ে চাল তৈরি করার কাঠের কল বিশেষ। গ্রামাঞ্চলে চাল ও গমের আটা তৈরিতেও এর ব্যবহার ব্যাপক। দেশে বর্তমানে অনেক ধান ভানা যন্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় চাল কল রয়েছে। কিন্তু কৃষক সমাজের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রায় সকল বৈশিষ্ট্যসহ যথেষ্ট সংখ্যক ঢেঁকি এখনও গ্রামাঞ্চলে বিরাজমান।
প্রাচীনকাল থেকে ভারত উপমহাদেশে ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছে। ঢেঁকির মাধ্যমে তৈরি চালের গুড়ার পিঠা পুলি অনেক সুস্বাদু হয়।
আজ আমরা সবকিছুতেই আধুনিক। মনটাও হয়ে গেছে যান্ত্রিক। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগুক কিন্তু আত্মা বেঁচে থাকুক। গ্রাম বাংলার অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম একটি হল ঢেঁকি। এটিকে আমাদের টিকিয়ে রাখা উচিত বলেই আমার মনে হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT