ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৫:৪৮ | সংবাদটি ১৮৪ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- শুক্রবার, ১০ পৌষ ১৪০৬ বাংলা, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৯ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)।
‘খন্ড গ-পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ।
জনসংহতি সমিতি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দাবি ত্যাগ করে, তাদের দাবি নামার প্রথম দফায় আঞ্চলিক পরিষদ মঞ্জুরের দাবি প্রতিস্থাপন করে। যথা :
‘দাবি নং-১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করিয়া ক) পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা প্রদান করা। খ) আঞ্চলিক পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রদান করা। গ) এই আঞ্চলিক পরিষদ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের লইয়া গঠিত হইবে এবং ইহার একটি কার্যনির্বাহী কাউন্সিল থাকিবে। ঘ) আঞ্চলিক পরিষদে অর্পিত বিষয়াদির উপর এই পরিষদ সংশ্লিষ্ট আইনের অধীন বিধি প্রবিধান উপবিধি আদেশ নোটিশ প্রণয়ন জারি ও কার্যকর করিবার ক্ষমতার অধিকারী হইবে।
এই দাবি নামায় অভিমত ব্যক্ত হয়েছে যে, এটি পূরণে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে। জনসংহতি সমিতির এই উপলব্ধি হলো যথার্থ। অথচ সংবিধান সংশোধন এড়াবার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়নি। যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আছে, তা মাত্র মৌখিক একটি অঞ্চল, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ইউনিট নয়, এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ইউনিট না হওয়ার কারণে এতদাঞ্চল নিয়ে কোন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃপক্ষ গঠিত হতেও পারে না। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কোন কার্যকর কর্তৃপক্ষ হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র হলো জাতীয় পরিষদ এবং অধঃস্তন ক্ষেত্রে স্থানীয় শাসনাধীন পরিষদ সমূহ। জাতীয় পরিষদ আর স্থানীয় শাসন পরিষদের বাহিরে অপর কোন রূপ পরিষদ স্থাপনযোগ্য নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং-৫৯ অনুযায়ী প্রশাসনিক ইউনিটের ভিত্তিতে জন প্রতিনিধিত্বমূলক স্থানীয় শাসন পরিষদ স্থাপিত হতে পারবে যথা :
‘তৃতীয় পরিচ্ছেদ : স্থানীয় শাসন। অনুচ্ছেদ নং ৫৯ (১) আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠান সমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বেলায় এই সাংবিধানিক শর্ত পূরণ হয় না। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম বর্তমানে কোন প্রশাসনিক একাংশ নয়। এটি না জেলা, না বিভাগ, না অন্য কিছু। অতএব পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কোন প্রতিনিধীত্ব মূলক কর্তৃপক্ষই নয়। এ নামের একটি অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান মাত্র। এর আদেশ নিষেধ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় ক্ষমতা পালন যোগ্য নয়। এই শূণ্যতা জানা সত্ত্বেও জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ এই ভুল ও ফাঁকিতে নিপতিত হয়েছেন। এই ভুল ও ফাকির সংশোধন হলো তিন পার্বত্য জেলাকে হয় পুনরায় এক জেলায় পরিণত করা অথবা তিন জেলাকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামীয় একটি বিভাগ সংগঠন। কিন্তু এই শূণ্যতা পূরণে কেউ সোচ্চার নন। সুতরাং প্রশাসনিক সংস্থানের অভাবে একদা আঞ্চলিক পরিষদের উবে যাওয়াই সম্ভব। প্রশাসনিক ইউনিটের ভিত্তি ছাড়া তার অস্তিত্ব ব্যয়বীয় থাকতে বাধ্য।
এই দাহ্য পরিস্থিতিতে ৩৬টি ক্ষমতা তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এবং আঞ্চলিক পরিষদ সে সব তত্ত্বাবধান ও সমন্বয়ের ক্ষমতা নিয়ে এখন একটি মাতবর প্রতিষ্ঠান। এ হলো ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। সাংবিধানিক স্থিতি হীনতার কারণে এ সর্দারীটা আইনতঃ প্রয়োগ যোগ্য নয়।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে, জনসংহতি সমিতির দাবি ৩৬টি বিষয়ের উপর সীমাবদ্ধ হলেও, সরকার মূলখাত ও উপখাত সহ ১০২টি ক্ষমতা হস্তান্তরের তালিকা স্থির করেছেন, যার বর্ণনা জেলা পরিষদ আইনের প্রথম তফসিলে নিহিত আছে। এটা হলো চাওয়ার চেয়ে অধিক দানের উদার উদাহরণ।
এখন জনসংহতি সমিতির আপত্তি হলো : চুক্তি বাস্তবায়নে ধীরগতি ও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি। এটা চুক্তি বানচালের ষড়যন্ত্র বলেই তাদের ধারণা।
কিন্তু এর জবাব হলো : জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ পদ্ধতি সাংগঠনিকভাবে নতুন ও জটিল। তার বাস্তবায়ন ধীরগতিক হওয়াই স্বাভাবিক। এটা অনিচ্ছাকৃত। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র আবিষ্কার অবাঞ্ছিত। ধৈর্য্য ও পারস্পরিক আস্থা অক্ষুন্ন রাখা ছাড়া, এই পদ্ধতি গড়ে উঠবে না। এও ভাবতে হবে যে, পদ্ধতিটির মূলে জাতীয় বিরোধিতা ও প্রচুর আইনগত গলদ আছে, যা কাটানো আবশ্যক ও সময় স্বাপেক্ষ। এখানে দ্রষ্টব্য, জেলা পরিষদের জন্য দাবিকৃত ও মঞ্জুরকৃত ক্ষমতার তুলনামূলক তালিকা, যথা :
দাবীকৃত ক্ষমতা তফসিল : ১. পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা। ২. জেলা পরিষদ, পৌরসভা ইউনিয়ন পরিষদ। ৩. পুলিশ। ৪. ভূমি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ৫. কৃষি উদ্যান ও উন্নয়ন। ৬. কলেজ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা। ৭. বনজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ৮. জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। ৯. আইন ও বিচার। ১০. পশু সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। ১১. ভূমি ক্রয় বিক্রয় ও বন্দোবস্ত। ১২. ব্যবসা বাণিজ্য। ১৩. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। ১৪. রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা। ১৫. পর্যটন। ১৬. মৎস্য, মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ। ১৭. যোগাযোগ ও পরিবহন। ১৮. ভূমি রাজস্ব আবগারী শুল্ক ও অন্যান্য কর। ১৯. পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ । ২০. হাটবাজার ও মেলা। ২১. সমবায়। ২২. সমাজ কল্যাণ। ২৩. অর্থ। ২৪. সংস্কৃতি তথ্য ও পরিসংখ্যান। ২৫. যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া। ২৬. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা। ২৭. মহাজনী কারবার ও ব্যবসা। ২৮. সরাইখানা, ডাক বাংলা, বিশ্রামাগার খেলার মাঠ ইত্যাদি। ২৯. মদ চোলাই, উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও সরবরাহ। ৩০. গোরস্তান ও শ্মশান। ৩১. দাতব্য প্রতিষ্ঠান, আশ্রম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়। ৩২. জল সম্পদ ও সেচ ব্যবস্থা। ৩৩. জুম চাষ ও জুম চাষীদের পুনর্বাসন। ৩৪. পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ৩৫. কারাগার। ৩৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত অন্যান্য কম গুরুত্বপুর্ণ বিষয়।
মঞ্জুরকৃত ক্ষমতা তপসিল :
১. জেলার আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও উন্নতি সাধন। ২. পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভম্যান্ট ট্রাপ্ট। ৩. পুলিশ (স্থানীয়)। ৪. ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা। ৫. কৃষি উন্নয়ন। ৬. বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। ৭. বেসরকারি বন সম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ। ৮. স্বাস্থ্য। ৯. উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার। ১০. পশু পালন। ১১. ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা। ১২. স্থানীয় শিল্প বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান। ১৩. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপন। ১৪. বেসরকারী জনপথ কালভার্ট ও ব্রিজ ১৫. স্থানীয় পর্যটন। ১৬. মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন। ১৭. যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি সাধন। ১৮. ভূমি ও দালান কোটার উপর হোল্ডিং কর ও স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করা। ১৯. পানি নিষ্কাশন ও সরবরাহ। ২০. গ্রাম্য বিপনী স্থাপন ও সংরক্ষণ। ২১. সমবায় উন্নয়ন। ২২. সমাজ কল্যাণ। ২৩. অর্থ সংস্থান। ২৪. সংস্কৃতি। ২৫. যুব কল্যাণ। ২৬. জন্ম মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান। ২৭. মহাজনী কারবার। ২৮. সরাইখানা ডাক বাংলা, বিশ্রামাগার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ। ২৯. ভিক্ষাবৃত্তি পতিতাবৃত্তি, জুয়া, মাদকদ্রব্য সেবন ও কিশোর অপরাধ দমন। ৩০. জুম চাষ। ৩১. পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। ৩৩. কারাগার। ৩৪. বাজার ফান্ড স্থানীয় এলাকা ও উহার অধিবাসীদের ধর্মীয় নৈতিক ও আর্থিক উন্নতি সাধনের পক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ।
এখানে উল্লেখ্য যে, জনসংহতি সমিতির দাবিভুক্ত বিষয় হলো ৩৬টি, এর বিপরীতে সরকার মঞ্জুর করেছেন ৩৪টি, যার খাত উপখাত হলো ১০২টি। এতদসত্বেও জনসংহতি সমিতির আপত্তি হলো সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন। এই বিষয় খাত ছাড়াও, রাজনৈতিক অঙ্গিকার, স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা নবায়ন, ও মৌখিক অঙ্গিকার ও বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের প্রত্যাহার, পালিত হচ্ছে না। সমিতি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক জটিলতা আর জাতীয় আকাঙ্খাকে মোটেও বিবেচনা করতে রাজি নয়। এমতাবস্থায় উপজাতীয় আকাঙ্খার অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT