শিশু মেলা

জাদুর বাক্স

মাহরীন ফেরদৌস প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৭:৪১ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

খুব অদ্ভুত একটা বাক্স পেয়েছে তুলি। কাঠের একটা চারকোনা বাক্স। আর তাতে তিন রকমের রঙ করা। সাদা, গোলাপি আর নীল।
বাক্সটা তার ঘরে কোথা থেকে এসেছে কিংবা সে কিভাবে পেয়েছে তা নিজেই জানে না। এইতো গত সপ্তাহের কথা, সকাল থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ কালো হয়ে এসেছিল। চারপাশের বৃষ্টির সাদা পর্দা। মাঝে মাঝে গুড়ুম গুড়ুম মেঘের ডাক। সব মিলিয়ে একদম যেন বর্ষাকালের রচনা লেখার মতো দিন।
এমন দিনে তুলির স্কুলের যেতে ইচ্ছে করছিলো না। যদিও সে অনেক আগেই স্কুলের জন্য তৈরি হয়েছিল। বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখতে খুব ভালো লাগছিল। ভাবছিলো বৃষ্টিটা একটু কমলেই ও ছাতা নিয়ে স্কুলের পথে হাঁটতে শুরু করবে। যদিও বৃষ্টির দিনে হেঁটে হেঁটে স্কুলের যাওয়ার অনেক কষ্ট। স্কুলের জামায় কাদা লেগে যায়। অনেক সময় রাস্তায় কাদাপানির জন্য পিছলে পড়ারও ভয় থাকে। তাও ভালো এখন ওর স্কুল কেডস আছে। তাই কিছুটা রক্ষা। আগে যখন ও স্যান্ডেল পরে স্কুলে যেত তখন বৃষ্টি হলে খবরই হয়ে যেতো। ওদের ক্লাসের রবিনের যেমন অবস্থা হয়েছিল।
অবশ্য তখন বর্ষাকাল ছিল না। শরৎকালের এক সকালে সেকি বৃষ্টি! ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছিল সেদিন রবিন। তারপর তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে স্কুলের দিকে রওয়ানা দিয়েছিল। তুলি আর জান্নাত তখন স্কুলের সামনে আবীরের জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ ওরা দেখল ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে রবিন প্রায় দৌড়ে স্কুলের গেইট দিয়ে ঢুকছে। এরপর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাস। হ্যাঁ, মানে আসলেই ধপাস। চিতপটাং হয়ে পড়লো একদম। ভাগ্য ভালো অনেক বড় কোন ব্যাথা পায়নি ও।
তবে স্কুলের সবাই সেইদিন এই ঘটনা নিয়ে খুব হাসাহাসি করলো। আর তারপর ওর নাম দিয়ে দিলো ‘হামটি ডামটি’। ওই যে একটা বিখ্যাত ইংরেজি ছড়া আছে না? ‘হামটি ডামটি স্যাট অন অ্যা ওয়াল’ সেইটা আরকি! রবিন এই নাম শুনে খুব দুঃখ পেয়েছিল। কিন্তু ওর দুঃখকে পাত্তা দেওয়ার সময় কোথায়? তাই বাকি সবাই এই নামে ওকে ডাকাডাকি করে মজা করতে থাকলো। সবার কাছ থেকে ওই নাম শুনতে শুনতে তুলি নিজেও ডাকতে শুরু করেছিল। রবিন যেহেতু ওর সামনের বেঞ্চে বসে তাই ও একটু বেশিই ডাকার সুযোগ পেতো।
যাই হোক, রবিনের কথা পরে। এখন বাক্সটার কথা বলা যাক। কাঠের বাক্সটার ওজন খুব বেশি না। আর বাক্সের রঙটায় কেমন যেন আলো আলো। সাদা থেকে গোলাপি, গোলাপি থেকে নীল এমন হয়ে যায়। দেখে মনে হয় বাক্সের ভেতরে কিছু আছে। কিন্তু সেটা খোলার জন্য কোনো ডালা বা সুইচ নেই। কোনো চাবিও নেই। এমন অদ্ভুত বাক্সটা যেন হঠাৎ এসেই উড়ে বসেছিল তুলির বিছানার পাশে। তুলি অনেক ভেবেছে এই বাক্স কিভাবে এলো? কেন এলো? কেমন করে বাক্স খোলা যায়?
কিন্তু কোনই কূল কিনারা পেলো না তুলি। তাই বাধ্য হয়ে সে স্কুল ব্যাগে সেটা নিয়ে জান্নাতকে সবকিছু খুলে বলল। জান্নাত শুনে খুবই অবাক হলো, এরপর বলল, দেখি বাক্সটা। আমরা খুলতে না পারলে স্কুলের কোনো শিক্ষককে বলতে পারি, উনি যেন বাক্সটা খুলে দেখেন ভেতরে কী আছে। তুলি ভাবলো, আরে তাই তো? এমন করে ও ভাবেনি। কোনো শিক্ষক নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সাহায্য করবে। সে ব্যাগের বই, খাতা, পানির বোতল, পেন্সিল বক্সের মাঝ থেকে সেই ছোটখাটো কাঠের বাক্সটা বের করলো। তারপর জান্নাতের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘এই যে দ্যাখ।’ কিন্তু ওকে বেমালুম অবাক করে দিয়ে জান্নাত বলল, ‘তোর হাতে তো কিছুই নেই! বাক্স কোথায়?’
তুলি আবারও দুই হাত ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এই যে আমার হাতে ধরা’। জান্নাত দুই চোখভরা বিস্ময় নিয়ে তুলির হাতের দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘তুই কি স্বপ্ন দেখছিস তুলি? হাতে কিছুই নেই’। হঠাৎ করে তুলির পেটের ভেতরটা ভয়ে ডুবডুব করে উঠলো। তার মানে কি এই বাক্সটা শুধু সে একাই দেখতে পারে? আর কেউ না? এটা কি কোনো জাদুর বাক্স? জান্নাতের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘ইয়ে, মানে। আমি কাল তোকে বাক্সটা দেখাবো। আজ না।’
সেদিন ক্লাসে শেষ করে সে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাক্সটা হাতে করে স্কুলে ইচ্ছেমত সবার সামনে হেঁটে বেড়ালো। মনে মনে ভাবল কেউ যদি ওকে দেখে জিজ্ঞেস করে বাক্সটা কিসের, তার মানে অন্যরাও বাক্সটা দেখতে পায়। আর কেউ যদি প্রশ্ন না করে তাহলে এটা আসলেই জাদুর বাক্সই হবে। ওকে রীতিমত অবাক করে দিয়ে কেউ একবারের জন্য ওর হাতের দিকে তাকাল না। শুধু ক্লাসের খুব চঞ্চল একটা নতুন ছেলে বলল, ‘তুলি, তুমিকি দুই হাতে অদৃশ্য কিছু ধরে আছ? না হলে হাত এমন করে রেখছ কেন?’ তারপর নিজের কথায় নিজেই খুব খুশি হয়ে অনেকক্ষণ হা হা হা করে হাসলো।
এবার তুলি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলো তার কাছে একটা জাদুর বাক্স আছে। বাসার সবাই যখন রাতে ঘুমিয়ে গেলো। তখন সে খাটের নিচ থেকে বাক্সটা বের করলো। অনেক আগে স্কুলে সে আলদিনের জাদুর প্রদীপের গল্প শুনেছিল। পুরানো সেই প্রদীপের গায়ে হাত দিয়ে ঘষা দিলেই রূপকথার গল্পের দৈত্য ধোঁয়া হয়ে বের হয়ে আসতো। তারপর গমগমে কণ্ঠে বলতো, প্রদীপের মালিকের যে কোনো ইচ্ছে সে পূরণ করবে। এই বাক্সটাও হয়ত এমন কিছু।
তুলি দুই হাতে বাক্সটা ধরে ইচ্ছেমত হাত দিয়ে ঘষতে থাকলো। তার মনে হতে থাকল এখুনি বুঝি বাক্সটা খুলে যাবে আর ভুরভুর করে রাজ্যের সাদা ধোঁয়া থেকে কোনো জাদুর দৈত্য বের হয়ে আসবে। কিন্তু এসব কিছুই হলো না। সে বাক্সটা জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো। তাতেও কোনো লাভ হলো না। এবার সে বাক্সটায় আঙুল দিয়ে টোকা দিতে থাকলো। আর ফিসফিস করে বলল, ‘এই যে। ভেতরে কেউ আছেন?’
এবারও কোনো উত্তর এলো না। সে বাক্স হাতে দুইটা লাফ দিলও। তাতেও কিছুই হলো না। তুলি মনে মনে খুবই বিরক্ত হয়ে গেলো। এ কেমন জাদুর বাক্স? খোলাও যায় না, কথাও বলে না, ধোঁয়াও আসে না, দৈত্যও না। সে মনে মনে ভাবলো, আর একবার সে বাক্সটা খুলে দেখার চেষ্টা করবে। এরপরও যদি না খুলে তাহলে সে জানালা দিয়ে বাক্সটা ফেলে দিবে। এবারও কিছুই হলো না। তুলি খুব রেগেমেগে বাক্সটা তুলে জানালার কাছে গিয়ে ফেলে দিতে যাবে এমন সময় হঠাৎ বাক্সটা কিচকিচে স্বরে বলে উঠলো, ‘খুকি, আমাকে ফেলে দিও না।’
প্রায় লাফিয়ে উঠলো তুলি, একি! আসলেই দেখি এটা কথা বলে। সে তাড়াতাড়ি বাক্সটা এনে বিছানার উপর রাখলো। বাক্সের উপরের আলো আলো রঙগুলো বদলাতে থাকলো। তুলি গম্ভীর স্বরে বলল, ‘এই দৈত্য, কথা বলো।’ বাক্সটা এবার মিনমিন করে বলে, ‘খুকি, আমি কোনো দৈত্য নই। আমি আর বাক্স একই। আলাদা কেউ না।’
‘এই আমাকে খুকি বলবে না। খুকি তো আরও পিচ্চিদের বলে। আমি এবার ক্লাস ফোরে উঠবো। আমি কি খুকি? একদম না। আর দৈত্য না ডাকলে তোমাকে আমি কী নামে ডাকবো?’
‘তোমার যা ইচ্ছে তাই ডেকো খুকি। না মানে, খুকি না।’ কাচুমাচু স্বরে বলল বাক্সটা।
‘উমমম ...আচ্ছা, তোমাকে আমি ডাকবো ‘বাক্স মিয়া’। আর আমার নাম তুলি। এখন তুমি আমার তিনটা ইচ্ছে পূরণ করো।
‘তুলি, আমি তো কোনো ইচ্ছেপূরণের দৈত্য নই। আমি এসব পারি না।’
‘ধ্যাৎ। তাহলে তুমি কী পারো?’
‘আমি খুব বেশি হলে একটা গল্প শোনাতে পারি।‘
এটুকু বলেই বাক্সমিয়া তার গায়ের সাদা, গোলাপি, কালো রঙগুলো জ্বালাতে থাকে। শো নোতাহলে- অনেক অনেক বছর আগে, ইংরেজদের যুদ্ধে একটা কামান ব্যবহার করা হয়। সেই কামানের একটা নামও দেওয়া হয়। যুদ্ধের সুবিধার্থে একটা দুর্গের দেয়ালে সেই কামানটিকে বসিয়ে ব্যবহার করতে চাওয়া হয়। কিন্তু কামানটি এতই ভারি থাকে যে দেয়ালে বসতে না পেরে পড়ে ভেঙ্গে যায়। সেই কামানটির নাম কী ছিল জানো?
তুলি এতক্ষণ বুঝতে পারছিল না কেন সে এত আগের আর যুদ্ধের একটা গল্প শুনছে। কামানের নাম ছিল শুনে সে কিছুটা অবাকই হয়েছিলো। এবার সে জিজ্ঞেস করলো। ‘কী নাম ছিল?’
‘কামানের নাম ছিল ‘হামটি ডামটি’।
‘বলো কি বাক্স মিয়া? আমাদের ক্লাসের রবিনকে তো আমরা এই নামে ক্ষ্যাপাই!’
‘এখন তুলি, তুমিই বলো, কাউকে কি নিজের নাম বাদে অন্য নামে ডাকা ঠিক?
তুলি হঠাৎ একটু থমকে গেলো। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘না। ঠিক না। তবে ও যে পড়ে গিয়েছিল এ জন্য সবাই এই নামে ডাকে।’
‘সবাই ডাকলেই কি তুমি ডাকবে? তোমাকে তো খুব লক্ষ্মী বলে মনে হচ্ছে। তুমি কেন ডাকবে?’
‘তুমি তো দেখি অনেক বকবক করো বাক্স মিয়া। থাক আজকে আর কথা না। আমি এখন ঘুমাবো। কাল স্কুল আছে আমার।’ কী উত্তর দিবে ভেবে না পেয়ে তুলি কোনক্রমে কথা শেষ করলো।
এটুকু বলেই বাক্সমিয়াকে খাটের নিচে রেখে ঘুমাতে চলে যায় তুলি। মনে মনে ভাবে এ কেমন বাক্স? ইচ্ছে পূরণ করে না কিন্তু কত্ত বকবক করে।
পরদিন স্কুলে গিয়ে রবিনকে দেখেই কেন যেন আগের মতো ‘হামটি ডামটি’ বলে ডেকে উঠতে পারলো না সে। একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘রবিন অংক হোমওয়ার্ক করেছিস?’ রবিন একটু অবাক হয়ে তাকায় তারপর হেসে ফেলল। অনেকদিন পর কেউ আজ তাকে ওর আসল নামে ডেকেছে। ওর খুব ভালো লাগছে।
তুলি মনে মনে ভাবে বাড়ি ফিরে বাক্সমিয়াকে বলবে আরেকটা নতুন গল্প বলতে। কিন্তু বাড়ি ফিরে খাটের নিচে, সারা ঘরে তাকে আর খুঁজে পায় না। তার একটু মন খারাপ হয়। তারপর ভাবে, কে জানে বাক্সমিয়া হয়ত নতুন কারও কাছে গিয়েছে তাকে গল্প শুনিয়ে ভালো কোনো কাজ করানোর জন্য।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT