শিশু মেলা

একুশের ভোর

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৯:৪০ | সংবাদটি ৪৯ বার পঠিত

মাঝরাতে বাবলার ঘুম ভাঙ্গে। ভোরে উঠবে বলে সকাল সকাল শুয়ে পড়েছিল সে। স্কুলের ক্লাস টিচার বলেছেন ভোরেই ফুল নিয়ে স্কুলে যেতে হবে। সে তো আবার ঘুম কাতুরে। ঘুমালে কোন খবর থাকেনা। ওদিকে যথাসময়ে স্কুলে না গেলে স্যারের বকুনি তো রয়েছেই। মনের মধ্যে একটা হাপিত্যেস কাজ করছে। তাড়াতাড়ি বিছানায় যাওয়ার একটা সমস্যা রয়েছে বাবলার। মধ্যরাতে উঠে প্রশ্রাব করতে হয়। এটা একটা বিরক্তিকর কাজ। শীতের রাতে ঘুম থেকে ওঠে প্রশ্রাবে যাওয়া আর এভারেস্ট বিজয়-দুটোই যেন সমান ওর কাছে।
বাবলাকে উঠতেই হলো। ঘড়িতে খেয়াল করে সে। রাত বারটা। গ্রামে তো আর শহরের মতো রুমের সাথে লাগোয়া টয়লেট নেই। ঘর থেকে অনতি দূরে পুকুরের উত্তর পাশে পাকা টয়লেট। বিদ্যুৎ তখনও গ্রামে পৌঁছায়নি। অগত্যা লণ্ঠন জ্বালিয়ে টয়লেটে যেতে হলো। বাবলা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হলেও রাত বিরেতে একাকী চলার সাহস আছে। গ্রামের বাজার থেকে মাগরিবের আযানের অনেক পরে অনেক দিন মাছ তরকারি কিনে বাড়ি ফিরেছে সে। কিন্তু এখনতো আর সন্ধ্যা সন্ধ্যা নয় গভীর রাত। একটু ভয় ভয় থাকলেও দ্রুতই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হলো। টয়লেটে না গিয়ে উপায় নেই।
টয়লেট থেকে ফেরার পথে দূরে কিসের শব্দ হলো। সেদিকে তাকাবার সাহস নেই বাবলার। জোরে হাঁটা দিয়ে রুমে ঢুকল সে। দরজায় খিল এটে কয়েকটি দীর্ঘশ্বাস নিল। কান খাড়া করে আরও শব্দ হয় কি না খেয়াল করল। না, আর কোন শব্দ টব্দ নেই। লেপ টেনে শুয়ে পড়ল সে।
আযানের ধ্বনি কানে বাজতেই ধড়মড় উঠে বসল বাবলা। হ্যাঁ ঐতো ফযরের আযান। রাত শেষ হয়ে আসার সিগনাল। সৃষ্টিকর্তার গুণকীর্তন শুরু। আল্লাহু আকবারÑআল্লাহ সবার বড়। আযানটা সাহস এনে দেয় বাবলার। যখনই আযান হয় তখনই বাবলার ডর ভয় কিছুই থাকে না। মনে হয় এইতো দূরে মানুষের আনাগোনা। কাজেই জ্বীন ভূত আর থাকবে না। বাবলা মসজিদে যায়। নামায আদায় করে তাড়াতাড়ি ফিরে সে। ইতোমধ্যে ওর মা বাবা জেগে উঠেছেন। বাবলার স্কুলের প্রস্তুতি দেখে বাবলা ডাকলেনÑ
Ñবাবলা, স্কুলে যাচ্ছিস না কি?
Ñহ্যাঁ, বাবা।
Ñএত্ত ভোরে যাচ্ছিস কেন?
Ñস্যার বলেছেন। আজ শহিদ দিবস। অনুষ্ঠান আছে। কিছু না খেয়েই যাচ্ছে দেখে মা বললেনÑ বাবলা কিছু খেয়ে যা।
Ñনা মা এসে খাবো। এখন সময় নেই।
বাবলার মা খেয়াল করেন ওর পায়ে জুতো নেই। তিনি হন্তদন্ত হয়ে বললেনÑ বাবলা খালি পায়ে যাচ্ছিস? জুতো নে বাবা।
Ñনা মা। জুতো লাগবে না। স্যার বলেছেন খালি পায়ে যেতে।
বাবলা দ্রুত চলল স্কুলের দিকে। পুকুর পাড়ের ফুল গাছ হতে ক’টি রক্তজবা হাতে নিল। ওগুলোকে জড়ো করে একটা সুন্দর আঁটি বেধে ফেলল সে। জীবনের প্রথম কোন অনুষ্ঠান পালন করতে যাচ্ছে বাবলা। নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো তার কাছে। পাশের বাড়ির তুহিনকে সঙ্গ নিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব হাঁটা দিল বাবলা। স্কুলটাতো আর বাড়ির পাশে নয়। দূরত্ব তিন কিলোমিটার। হেঁটে যাওয়া ছাড়া কোন পথ নেই।
স্কুলে পৌঁছে হাফ ছেড়ে বাঁচল বাবলারা। এখনও মুজাম্মিল স্যার আসেন নি। সূর্যটা লাল হয়ে কেবল গ্রামের উপরে উঠেছে। খালি পায়ে স্কুলের ৬ষ্ট থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অনেকেই এসেছে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের খালি পা-টা অনেক সুন্দর। ভোরের শিশির ভেজা খালি পাগুলো যেন জীবন্ত পদ্ম। গোড়ালিতে রূপোর নূপুর অপরূপ লাগে বাবলার কাছে।
মুজাম্মিল স্যার আসার পরেই শুরু হলো আনুষ্ঠানিকতা। ছেলেমেয়েদের আলাদা লম্বা লাইনে দাঁড় করানো হলো। স্কুল ক্যাম্পাস থেকে শুরু হলো ‘নগ্নপদে মৌন মিছিল’। স্কুল গেইট পেরিয়ে প্রধান রাস্তা। মুখে সবাই গাচ্ছে-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি। সবার হাতে একটি দু’টি ফুল। প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে যাচ্ছে ওরা। গ্রামের কৃষাণ কিষাণীরা চেয়ে চেয়ে দেখছে মিছিল। গরু নিয়ে যাচ্ছিল হাবুল। সে গাঁয়েব মাতব্বর শুকুর আলীকে পেয়ে জিজ্ঞেস করল। চাচা এই ছেলে মেয়েরা সাত সকালে কই যাইতাছে? মাতব্বর বললেনÑতুই জানিস না? না চাচা আমি মুর্খ মানুষ জানি না তো। শোন, এইডা অইল গিয়া শহীদ দিবসের মিছিল। ১৯৫২ সালে এই দিনে অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার, শফিউল এরা ভাষা রক্ষার জন্য জীবন দিছিল। হেগো স্মরণ করবার জন্যে এই মিছিল। হাবুল হা হয়ে মাথা নাড়ল।
মিছিল প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে আবারও স্কুলে এলো। শহীদ মিনারের বেদীর উপর সবাই ফুল রাখল। বাবলাও রাখল। ফুল দেওয়া শেষ হলে মুজাম্মিল স্যার জোরে বললেনÑ মহান শহীদ দিবস-বাবলারা সবাই বললÑ ওমর হউক, অমর হউক। এরপর আলোচনা সভা হলো। বড় ভাই বোনেরা শহীদ দিবসের গান গেয়ে শোনাল। স্যারেরা বক্তৃতা দিলেন। বাবলাভাবে আমার ভাষার এতোই মর্যাদা! এই ভাষাকে আমার অনেক সম্মান দিতে হবে। এই ভাষাকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে হবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ভাষাকে আকড়ে ধরতে হবে। মায়ের দুগ্ধ পান করে যেমন শান্তি-এই ভাষায় কথা বলে তেমনি শান্তি পাই। বাড়িতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বাবলা বলে এই ভাষা তোমারই দান মা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT