ধর্ম ও জীবন

রাসূলুল্লাহ (সা.) যুগে সম্পদ ব্যবহার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৪-২০১৯ ইং ০১:২২:৩৮ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

মহান আল্লাহ তার রাসূল (সা.) সম্পর্কে বলেনÑনিশ্চয় তোমাদের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনে উত্তম আদর্শ রয়েছে, এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করে। মুফাসসিরগণের মতে, এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে পঞ্চম হিজরিতে আহযাব যুদ্ধের সময়। এর তাফসীরে হাফিয ইবনে কাছীর বলেন, আয়াতটি রাসূলে কারীম (সা.) এর উত্তম আদর্শ অনুসরণের মৌলিক নীতি। তার কথা ও কাজ সকল মানুষের জন্য উত্তম নমুনা। এ কারণেই মহান আল্লাহ আহযাব যুদ্ধকালীন সময়ে রাসূলে কারীম (সা.) এর ধৈর্য্য ও অবিচলতা প্রদর্শন, জিহাদের প্রস্তুতি, কষ্ট স্বীকার এবং আল্লাহ তা’আলার কাছে সাহায্য ও বিজয় প্রার্থনা ইত্যাদি বিষয়কে আমাদের জন্যে উত্তম আদর্শরূপে সাব্যস্থ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষা ও জীবন চরিত্রকে সকল মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে সাব্যস্থ করা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি শাখায় সীরাতে নববীর মৌলিক নির্দেশনা বর্তমান রয়েছে। যা সকল যুগের দাবি ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে সর্ব যুগে ও সকল সমাজে এর প্রয়োগ সম্ভব। মানব সমাজের উত্থান-পতন, পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মধ্যেও সীরাতে নববী মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ প্রতাপ ও প্রভাবের সাথে মানবতাকে তার আলোকময় নির্দেশনা পৌঁছে দিচ্ছে। এ প্রবন্ধে আমরা সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের বণ্টন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একান্ত অনুসরণীয় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অনুপম শিক্ষা ও নির্দেশনাসমূহ আলোচনার প্রয়াস পাবো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে সব বিষয় ও সমস্যার সমাধানে তিনি ছিলেন মূল কেন্দ্র। তিনি মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রের যে রূপরেখা পেশ করেন, তাতে বর্তমানের মতো নিয়মতান্ত্রিক অফিস, দারোয়ান ও রাষ্ট্রীয় আইন ছিলো না। বরং তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা প্রদান করেন। তিনি শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক, শাসক ও জনগণের অধিকার, মুসলিম ও অমুসলিমদের অধিকার নির্ধারণ করেন। যদিও বাহ্যত মদিনা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ছিলো অতি সাধারণ, তথাপি গভীরভাবে মনোযোগ দিলে বুঝা যায়, এ রাষ্ট্রের মৌলিক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছিলোÑ১. নির্বাহী, ২. আইন প্রণয়ন, ৩. বিচার বিভাগ।
এই তিনটি শাখা মদিনা রাষ্ট্রে কার্যকরভাবে সক্রিয় ছিলো; যদিও তার কাঠামো বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। যেহেতু তখন সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আল্লাহ এবং তার রাসূলুল্লাহ (সা.), তাই নির্বাহী পরিষদের স্বরূপ তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর খেলাফত ব্যবস্থার আকারে বিদ্যমান ছিল। খলিফার এ সম্মানিত পদ আল্লাহ তা’আলা তার নবীকে দান করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি পরিচালনার জন্যে তিনি একেক জনকে একেক পদ দিয়েছিলেন। নির্বাহী পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো ছিল, গভর্নর, সেনাপতি, কাতিববৃন্দ ও সেক্রেটারি। ‘সারায়া’ (যুদ্ধ) পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ৭৪ জন ব্যক্তি। যেমন তিনি হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রা.) কে সীফুল বাহর (সমুদ্র উপকূলের) যুদ্ধে আমির নিযুক্ত করেছিলেন। মুআয বিন জাবাল (রা.) কে ইয়ামেনের গর্ভনর নিযুক্ত করেছিলেন। নির্বাহী পরিষদের দায়িত্বের মধ্যে আরো ছিল অঞ্চলভিত্তিক শাসক রাষ্ট্রদূত। যেমন ইমাম বুখারী তার সহীহ-তে এই শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন : নবী (সা.) একের পর এক শাসক ও দূত পাঠাতেন। নির্বাহী বিভাগের অধীনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিভাগ হলো বায়তুল মাল। বায়তুলমালে যাকাত সংগ্রহকারী, উৎপন্ন ফসলের যাকাতের পরিমাণ নির্ণায়ক ও কর্মকর্তা ইত্যাদি পদ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) এক দিকে যেমন দ্বীনের প্রতি আহ্বানকারী ছিলেন, আবার রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন। তিনি ইসলামের দাওয়াত ও ব্যবস্থাপনাগত বিষয় পরিচালনার জন্যে চিঠি ও দোভাষী পাঠাতেন। ইবনু ‘আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : নবী (সা.) দিহয়া কালবী (রা.) কে চিঠিসহ বুসরার শাসকের কাছে পাঠিয়েছেন যেন তিনি তা রোমের সম্রাট কায়সারের কাছে পৌঁছান। এছাড়াও নির্বাহী পরিষদে আরও কিছু পদ ছিল। যেমন যুদ্ধলব্ধ ও প্রোথিত সম্পদে রাষ্ট্রের প্রাপ্য একপঞ্চমাংশ সম্পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, টহল বাহিনী, অস্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত, স্থানীয় ব্যবস্থাপক, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন এবং হজ্জের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মকর্তা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে আইন প্রণয়ন বিভাগের কার্যকর ছিল। সে সময়ে অধিকাংশ বিষয়ের সমাধান অহীর মাধ্যমে হতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নবী করীম (সা.) মজলিসে শুরা আহ্বান করে পরামর্শ করার মাধ্যমেও ফয়সালা দিতেন। যেমন বদর যুদ্ধে বন্দীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করেন।
উক্ত পরামর্শ সভার কিছু সাহাবী উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীর পদে উত্তীর্ণ ছিলেন। আইন প্রণয়ন বিভাগের অধীন দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সেক্রেটারি বা কাতিবের পদ। নুকূশ পত্রিকার রাসূল সংখ্যায় কাতিবীনদের সংখ্যা ৪৩ জন পর্যন্ত গোনা করা হয়েছে। কাতেববৃন্দ (লেখক) পুরো মানবজাতির জধবন- বিধান পবিত্র কুরআন অবতীর্ণের সাথে সাথেই লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। আর কিছু সাহাবী রাসূলে আকরাম (সা.) এর চুক্তিনামা ও চিঠিপত্র লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।
মদিনা রাষ্ট্রের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হলো বিচার বিভাগ। সাধারণভাবে এটা প্রসিদ্ধ যে, বিচার বিভাগ উমর (রা.) এর যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সীরাতে নববী অধ্যয়নকারীগণ খুব ভালো ভাবেই অবগত আছেন যে, এই পদও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তবে পার্থক্য এই যে, উমর (রা.) বিচারবিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পরিপূর্ণ পৃথক করে স্বতন্ত্র একটি বিভাগে পরিণত করেন; পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে এ দুটি মিলে একটি বিভাগ ছিল। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) মুআয (রা.) কে ইয়ামেনের বিচারক ও শাসক উভয় পদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন।
সীরাত থেকে আরও জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই বিচারক পদে কাউকে নির্বাচন করার শর্ত ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তথাপি এটা স্বীকৃত বিষয় যে, তাঁর মাধ্যমে কোন এলাকায় যিনি নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ পেতেন, তিনি একাধারে নির্বাহী কর্মকর্তা, বিচারক ও গভর্ণর হিসেবে কর্তব্য সমাধা করতেন।
প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য সীমান্ত সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, নির্বাহ এবং রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নিজস্ব অর্থবিভাগ থাকা আবশ্যক। রাসূলূল্লাহ (সা.) এর যুগে সম্পদের একত্রকরণ, সংরক্ষণ, বন্টন ও এতদসংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্যে বায়তুল মাল নামে পৃথক বিভাগ ছিল। তার মক্কী জীবনে স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। এ কারণে সে সময় উক্ত বিভাগের উপকরণ ছিল সীমিত। তবে মাদানী জীবনে মদিনা রাষ্ট্রের জন্যে নি¤েœর সরকারি সম্পদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল।
সাদাকা : মদীনা রাষ্ট্রে সম্পদ আয়ের সবচেয়ে বড় খাত ছিল যাকাত ও সাদাকা। সাদাকা উসূল করা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সাদাকার অধীনে স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য, উশর, গবাদিপশুর যাকাত, গুপ্তধন ইত্যাদি সম্পদের যাকাত একত্রিত করা হতো। বিভিন্ন কর্মকর্তা সাদকা উসূল করতেন। যাকাত তো একটি ফরয বিধান। সে সময়কালে ব্যক্তি উদ্যোগে যাকাত পাওয়ার হকদারদের মধ্যে যাকাত বন্টন করা হত না, বরং সরকারি উদ্যোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে যাকাত আদায় করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হত। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সরকারি সম্পদের সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, নির্বাহ করা ও বন্টন করার কাজও ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জিয্য়া ও খারাজ : আল্লামা শিবলী নোমানী জিয্য়া খারাজ সম্পর্কে লিখেছেন, অমুসলিম প্রজাদের কাছ থেকে তাদের নিরাপত্তা প্রদান ও দায়গ্রহণের বিনিময় জিয্য়া গ্রহণ করা হয়। এর কোন পরিমাণ নির্ধারিত ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সময় প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সক্ষম ব্যক্তির ওপর বছরে এক দিনার করে জিয্য়া ধার্য করেছিলেন। শিশু ও নারী এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘ইলীয়া’ থেকে প্রাপ্ত জিয্য়ার পরিমাণ ছিল ৩০০ দিনার। সে সময় জিয্য়ার সবচেয়ে বড় পরিমাণ উসূল হতো বাহরাইন থেকে। অমুসলিম কৃষকদের মালিকানা অধিকারের বিপরীতে তাদের সাথে আপোসে সন্ধির ভিত্তিতে উৎপন্ন ফসলের যে পরিমাণ ধার্য্য হতো, তার নাম হলো খারাজ। খায়বার, ফাদাক, ওয়াদিল কুরা, তায়মা ইত্যাদি জায়গা থেকে খারাজ উসূল করা হতো। জিয্য়া ও খারাজকে ‘ফাই’ বলেও অভিহিত করা হত, যেহেতু ‘ফাই’ অর্থ বিনাযুদ্ধে লব্ধ সম্পদ, আর এ সম্পদগুলো তো বিনাযুদ্ধে লব্ধ হচ্ছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে সম্পদেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল প্রোথিত সম্পদ ও গণীমত। আল্লামা কাসানী বলেন, ভূগর্ত থেকে যতো সম্পদ বের হয় এগুলো দু’প্রকার। এক প্রকার হলো যা মানুষ নিজে যমিন প্রোথিত করে। একে কান্য বলে। দ্বিতীয় প্রকার হলো খনি, যা সৃষ্টিগতভাবে যমিনের অভ্যন্তরে রাখা আছে। রিকায শব্দটি উভয় প্রকার সম্পদ বোঝানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়। গণীমত হলো সে সম্পদ, যা যোদ্ধারা শত্রুপক্ষের ওপর কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অর্জন করে।
সরকারি পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে হলে তার মধ্যে আবশ্যক কিছু গুণাবলি বিদ্যমান থাকতে হবে। যেমন জ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ইত্যাদি। ইসলাম সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে ঘুষ ও উপঢৌকন গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অপকর্ম থেকে নিষেধ করেছে। ইসলাম এ শিক্ষাও দিয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সবসময় দেশের ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে এবং সরকারি সম্পদকে নিজ মালিকানাধীন সম্পদের ন্যায় মনে করা ও নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। অতএব রাষ্ট্রীয় পদ ও জাতীয় সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্তব্য হলো, তারা সুন্নাহ থেকে সরকারি চাকুরির নীতিমালা অনুধাবন করবেন এবং সে অনুসারে আমল করবেন, বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ইসলামী আদর্শের আলোকে গড়ে তুলবেন, তবেই রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে অনিয়ম, সুপারিশ, ঘুষ গ্রহণ ও অবৈধ পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT