ধর্ম ও জীবন

কবরের আযাব সত্য

আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৪-২০১৯ ইং ০১:২৪:২৭ | সংবাদটি ১২০ বার পঠিত

বুখারী শরীফের এক দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি স্বপ্নের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে কবরের কিছু বিশেষ বিশেষ শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘আজ রাতে আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম দুইজন লোক এসে আমার হাত ধরে আমাকে এক পবিত্র স্থানের দিকে নিয়ে চলল (কিছু দূর যাওয়ার পর) দেখলাম, একজন লোক বসে আছে এবং আরেক জন লোক তার নিকটে দাঁড়িয়ে আছে। দন্ডায়মান লোকটির হাতে একটি সাঁড়াশি রয়েছে। সেই সাঁড়াশি ঢুকিয়ে বসে থাকা লোকটির চোয়ালে মাথার পেছন পর্যন্ত কেটে ফেলেছে। আবার অন্যদিক দিয়েও অনুরূপ করে। একদিক কাটার পর যখন অন্যদিক কাটতে যায়, তখন প্রথম দিক জোড়া লেগে ভালো হয়ে যায়। আবার কাটে, আবার ঐরূপ জোড়া লেগে যায়।
আমি (এ অবস্থা দেখে অত্যন্ত ভীত হয়ে সঙ্গীদেরকে) জিজ্ঞাসা করলাম (বন্ধুগণ!) ব্যাপার কি? তারা বললেন ‘সামনে চলুন’। ফলে আমরা সামনের দিকে চললাম। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলাম, একজন লোক একখানা ভারী পাথর হাতে নিয়ে তার নিকট দাঁড়িয়ে আছে। দন্ডায়মান লোকটি ঐ পাথর দিয়ে শায়িত ব্যক্তির মাথায় আঘাত করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে। যখন সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করে তখন (জোরে আঘাত হানার দরুন) পাথর দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে লোকটি নিক্ষিপ্ত পাথর কুড়িয়ে আনার আগেই মাথার ছিন্ন ভিন্ন টুকরোগুলো জোড়া লেগে আগের মতো হয়ে যায়। সে ঐ পাথর কুড়িয়ে এনে আবার মাথায় আঘাত করে এবং মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে।
এভাবে সে বারবার আঘাত করতে থাকে। (এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমি অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সঙ্গীদেরকে) জিজ্ঞাসা করলাম, ‘একি কান্ড? (তারা আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে) বললেন, ‘সামনে চলুন।’ আমরা সামনে চলতে আরম্ভ করলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর একটি বিরাট গর্ত দেখতে পেলাম। গর্তটির মুখ সরু, কিন্তু ভিতরটা অত্যন্ত গভীর ও প্রশস্ত, যেন একটি তন্দুর। তার ভেতরে (দাউ দাউ করে) আগুন জ্বলছে আর বহু উলঙ্গ নারী পুরুষ সেখানে অবস্থান করছে। (আগুনের তেজ এতো বেশি যে, আগুন যেন ঢেউ খেলছে ঢেউয়ের সাথে) যখন আগুন উপরে উঠে আসে, তখন লোকগুলো গর্তের মুখে এসে গর্ত থেকে বের হওয়ার উপক্রম হয়। আবার যখন আগুন নিচে নেমে যায় তখন লোকগুলো আগুনের সাথে নিচে নেমে যায়। আমি (খুব ভয় পেয়ে) সঙ্গীদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বন্ধুগণ ব্যাপার কি?’ আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই) তারা বললেন, ‘সামনে চলুন’। আমরা সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলাম। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি রক্তের নদীর নিকট পৌঁছলাম। নদীর মাঝখানে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। আর নদীর তীরে আরেকটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটির সামনে কতোগুলো পাথর পড়ে আছে। নদীর মাঝের লোকটি যখন কুলের দিকে আসার চেষ্টা করে তখনই তীরে দাঁড়ানো লোকটি তার মুখে জোরে পাথর মেরে নদীর মাঝে হাটিয়ে দেয়। এভাবে যখনই সে তীরের দিকে আসার চেষ্টা করে তখনই তীরের লোকটি পাথর মেরে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই নিষ্ঠুর ব্যবহার দেখে খুব ভীত হয়ে সঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বন্ধুগণ বলুন, একি ব্যাপার?’ তারা কোন জবাব না দিয়ে বললেন, ‘আগে চলুন’। আমরা অগ্রসর হতে লাগলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি একটি সুন্দর সবুজ শ্যামল বাগান। বাগানের মাঝখানে অনেক উঁচু একটি বৃক্ষ। তার নিচে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। বৃদ্ধের চারপাশে অনেক বালক-বালিকা। বৃক্ষটির কাছে আরও একজন লোক বসা আছে। তার সামনে আগুন জ্বলছে। লোকটি আগুনের তাপ আরও বৃদ্ধি করছে। সঙ্গীরা আমাকে সেই বৃক্ষের উপরে নিয়ে গেলেন। বৃক্ষটির উপর একটি মনোরম বালাখানা দেখতে পেলাম। তারা আমাকে (একাই) ঘরে প্রবেশ করালেন। এমন সুন্দর ও নয়ন জুড়ানো বালাখানা ইতোপূর্বে আর কখনও দেখিনি। বালাখানার ভেতরে নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ ও বালক-বালিকা সব শ্রেণির লোক রয়েছে। বালাখানা থেকে বের হয়ে আসার পর সঙ্গীরা আমাকে আরও উপরে নিয়ে গেলেন। সেখানে প্রথমটার চেয়ে উন্নত একটি বালাখানা দেখতে পেলাম। সেখানে ছিল শুধু বৃদ্ধ ও নওজোয়ান। আমি সঙ্গীদের বললাম, ‘আপনারা আমাকে সারারাত বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণ করিয়ে আনলেন, এবার দয়া করে বলুন, ঐ সব ঘটনার কি রহস্য ছিল? সঙ্গীরা বললেনÑ
প্রথম : যে লোকটির মস্তক ছেদন করা হচ্ছে দেখেছেন তার মিথ্যা বলার অভ্যাস ছিলো। তার মিথ্যা কথা দুনিয়াতে প্রচার হয়ে গিয়েছিল। তাই কিয়ামত পর্যন্ত তার সাথে উক্ত আচরণ করা হবে।
দ্বিতীয়ত : যে লোকটির মস্তক পাথরের আঘাতে আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে দেখেছেন, আল্লাহ তা’আলা তাকে কুরআনের ইলম দান করেছিলেন। কিন্তু সে ইলম থেকে গাফেল হয়ে রাত্রে ঘুমিয়ে থাকত এবং দিনে সে অনুযায়ী আমল করত না। কিয়ামতের দিন হিসাব নিকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত তার এরূপ আযাব চলতে থাকবে।
তৃতীয়ত : আপনি যাদেরকে আগুনের তন্দুরের ভিতর দেখেছেন, তারা দুনিয়াতে ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলো। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর এই শাস্তি চলতে থাকবে।
চতুর্থত : যে ব্যক্তিকে রক্তের নদীতে হাবু ডুবু খেতে দেখেছেন, সে সুদ খেত। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উপর এই শাস্তি চলতে থাকবে।
বৃক্ষের নিচে যে বৃদ্ধকে দেখছেন, তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.)। বাচ্চাগুলো হলো মানুষের নাবালক ছেলে-মেয়ে। আর যিনি আগুন জালাচ্ছিলেন, তিনি হলেন জাহান্নামের দারোগা মালেক ফেরেশতা। আপনি প্রথম যে বালাখানায় প্রবেশ করেছেন, তা সাধারণ ঈমানদারদের আর দ্বিতীয়টি শহীদদের। আমি হলাম জিবরাইল এবং ইনি মীকাঈল (আ.)’। এরপর জিবরাইল (আ.) আমাকে বললেন ‘এখন আপনি উপরের দিকে তাকান’। আমি উপরের দিকে দৃষ্টিপাত করে একখন্ড সাদা মেঘ দেখলাম। জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘এটাই হলো আপনার বালাখানা।’ আমি বললাম, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আমার বালাখানায় চলে যেতে চাই। জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘আপনার সময় এখনও পূর্ণ হয়নি, আপনার দুনিয়ার হায়াত বাকি আছে। যদি বয়সপূর্ণ হতো তাহলে এখনই যেতে পারতেন। (মিশকাত, নোট : নবীদের স্বপ্নও ওহী)
তাই উপরে বর্ণিত সমস্ত ঘটনা সম্পূর্ণ সত্য এবং তা থেকে কয়েকটি বিষয় জানা গেল। প্রথমত, মিথ্যার ভয়াবহ শাস্তি। দ্বিতীয়ত, বেআমল আলেমের শাস্তি। তৃতীয়ত, যিনা বা ব্যভিচারের প্রতিফল। চতুর্থত, সুদখোরের ভীষণ আযাব।
তিবরানী এবং বাজ্জার এর বিবরণে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর বর্ণনা হচ্ছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজের সফরে এমন এক সম্প্রদায়ের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলো যাদের মাথা পাথর দ্বারা ভেঙে চুরমার করে ফেলা হয়। পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে আর এ অবস্থা অব্যাহত থাকে। রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে জিবরাইল এটি কি? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক যারা ফরজ নামাজ আদায়ে প্রস্তুত হতো না।
এরপর এমন এক সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ হলো যাদের লজ্জাস্থান অগ্রে এবং পশ্চাতে আবৃত ছিল আর লোকগুলো চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় বিচরণ করছিল, আর জাক্কুম এবং জাহান্নামের পাথর ভঙ্গন করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ লোকগুলো কে? জিবরাইল (আ.) বললেন, এরা সে সব লোক যারা স্বীয় অর্থ সম্পদের যাকাত আদায় করতো না। আল্লাহপাক তাদের প্রতি জুলুম করেননি। আর আল্লাহ পাক তার বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।
অতঃপর আর একটি সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ হলো যাদের সম্মুখে একটি পাতিলে পরিপক্ক গোশত রাখা আছে, আর অন্য একটি পাতিলে কাঁচা পঁচা গোশত রাখা আছে। এলোকগুলো পঁচা কাঁচা গোশত ভক্ষণ করছে আর পরিপক্ষ গোশত স্পর্শ করছে না। রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এই লোকগুলো কে? হযরত জিবরাইল (আ.) জবাব দিলেন, এরা আপনার উম্মতের সে সব লোক যাদের নিকট ছিল বৈধ স্ত্রীগণ, তবুও তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। এভাবে যে সব নারীগণ যাদের বৈধ স্বামী থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে।
এরপর এমন ব্যক্তির সাক্ষাৎ হলো, যে জ্বালানী সংগ্রহ করে তার এতো বড় একটি বোঝা তৈরি করেছিল যা সে বহন করতে সক্ষম নয়, আর এরপরও আরো জ্বালানী সে সংগ্রহ করে চলেছে। প্রিয়নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন এটি কি? হযরত জিবরাইল (আ.) জবাব দিলেন, এ হলো আপনার উম্মতের সেই ব্যক্তি যার উপর মানুষের বহু আমানত ও অধিকার রয়েছে যার আদায়ে সে সক্ষম নয় এরপরও সে আরো বোঝা নিতে উদ্যত।
অতঃপর তিনি অন্য একটি সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ পেলেন যাদের রসনা এবং ওষ্ঠদ্বয় কাঁচি দ্বারা কর্তন করা হচ্ছে আর কর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসছে। এ অবস্থা কোন সময় বন্ধ হয় না। প্রিয়নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন এটি কি? জিবরাইল (আ.) জবাব দিলেন, এ হলো পথভ্রষ্টকারী ওয়ায়েজ। (তাফসিরে নুরুল কুরআন, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা-১২২)
ইমাম আহমদ (রহ:) আনাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন, যখন আমাকে আমার মহামহিমান্বিত রবের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এমন কতকগুলি লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যাদের তামার নখ ছিলো, যা দ্বারা তারা নিজেদের মুখমন্ডল ও বুক খোঁচাচ্ছিল। আমি জিবরাইল (আ.) জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? উত্তরে তিনি বললেন, এরা হচ্ছে সে সব লোক যারা লোকদের গোশত ভক্ষণ করত (অর্থাৎ গীবত করত) এবং তাদের মর্যাদাহানী করত। (মসনদে আহমদ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা-২২৪, আবু দাউদ, পৃষ্ঠা- ৪৮৭৮, তাফসিরে ইবনে কাসীর বাংলা খন্ড-১৩, ৫৫২ পৃষ্ঠা)
আরো অনেক প্রকার গুনাহর অনেক প্রকার শাস্তির কথা বা বর্ণনা কবরের ও আলমে বরযখের হাদিস ও তাফসিরের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে। আমরা সর্ব প্রকার গোনাহ থেকে আল্লাহ তা’আলার নিকট হেফাজতের প্রার্থনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT