ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৪-২০১৯ ইং ০১:২৫:১১ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

 সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
আনুষাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয় :
শাহ আবদুল কাদের (রহ.) এর বক্তব্যানুসারে এ ঘটনা তীহ উপত্যকায় বসবাসকালে সংঘটিত হয়েছিল। যখন বনী ইসরাইলের একটানা ‘মান্না ও সালওয়া’ খেতে খেতে বিস্বাদ এসে গেল এবং স্বাভাবিক খাবারের জন্য প্রার্থনা করল (যেমন, পরবর্তী চতুর্থ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে), তখন তাদেরকে এমন এক নগরীতে প্রবেশ করতে হুকুম দেয়া হল, যেখানে পানাহারের জন্য সাধারণভাবে ব্যবহার্য দ্রব্যাদি পাওয়া যাবে। সুতরাং এ হুকুমটি সে নগরীতে প্রবেশ করা সম্পর্কিত। এখানে নগরীতে প্রবেশকালে কর্মজনিতও বাক্যজনিত দু’টি আদবের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। (‘তওবা তওবা’ বলে প্রবেশ করার মধ্যে বাক্যজনিত এবং প্রণত মস্তকে প্রবেশ করার মধ্যে কার্যজনিত আদব)। এ প্রসঙ্গে বড় জোর একথা বলা যাবে যে, ঘটনার পরের অংশটি আগে এবং আগের অংশটি পরে বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে জটিলতা তখনই হতো, যখন কুরআন মজীদের ঘটনাই মূখ্য উদ্দেশ্য হতো। কিন্তু যখন ফলাফল বর্ণনাই মূল লক্ষ্য, তখন যদি একটি ঘটনার বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রত্যেক অংশের ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং ফলাফলগুলোর কোনো প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবের কথা বিবেচনা করে যদি আগের অংশকে পরে এবং পরের অংশকে আগে বর্ণনা করা হয়, তবে এতে কোনো দোষের কারণ নেই এবং কোনো আপত্তিরও কারণ থাকতে পারে না।
অন্যান্য তাফসিরকারদের মতে এ হুকুম ঐ নগরী সংক্রান্ত ছিলো, যেখানে তাদেরকে জেহাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। তীহ্ উপত্যকায় তাদের অবস্থানকাল শেষ হওয়ার পর আবার সেখানে জেহাদ সংঘটিত হয়েছিল এবং সে নগরীর উপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় হযরত ইউশা (আ.) নবী ছিলেন। সে নগরীতে জেহাদের হুকুমটি তাঁরই মাধ্যমে এসেছিলো।
প্রথম অভিমত অনুসারে ‘মান্না ও সালওয়া’ বর্জন করে সাধারণ খাবার সংক্রান্ত বনী ইসরাইলে আবেদনকেও পূর্ববর্তী অপরাধগুলোর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া উচিত। তখন মর্ম দাঁড়াবে এই যে, আবেদনটি তো ধৃষ্টতাপূর্ণই ছিলো, কিন্তু তবুও তারা যদি এ শিষ্টাচার (আদব) ও নির্দেশ পালন করে, তবে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। এই উভয় অভিমত অনুযায়ী এ ক্ষমা সকল বক্তার জন্য তো সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে। তদুপরি যারা নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতার সাথে সৎকার্যাবলী সম্পন্ন করবে, তাদের জন্য এছাড়াও অতিরিক্ত পুরস্কার থাকবে।
বাক্যের শব্দগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান :
এ আয়াত দ্বারা জানা গেল যে, বনী ইসরাইলকে উক্ত নগরীতে ‘হিত্তাতুন’ বলতে বলতে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা দুষ্টামী করে সে শব্দের পরিবর্তে ‘হিনতাতু’ বলতে থাকে। ফলে তাদের উপর আসমানী শাস্তি অবতীর্ণ হলো। এই শব্দগত পরিবর্তন এমন ছিলÑ যাতে শুধু শব্দই পরিবর্তিত হয়ে যায়নি, বরং অর্থও সম্পূর্ণভাবে পাল্টে গিয়েছিল। ‘হিত্তাতুন’ অর্থ তাওবা ও পাপ বর্জন করা। আর ‘হিনতাতু’ অর্থ গম। এ ধরণের শব্দগত পরিবর্তন, তা কুরআনেই হোক বা হাদিসে কিংবা অন্য কোন খোদায়ী বিধানে নিঃসন্দেহে এবং সর্ববাদিসম্মতভাবে হারাম। কেননা, এটা এক ধরণের ‘তাহরিফ’ তথা শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতিসাধন।
এখন রইল এই যে, অর্থ ও উদ্দেশ্য পুরোপুরি রক্ষা করে নিছক শব্দগত পরিবর্তন সম্পর্কে কি হুকুম? ইমাম কুরতুবী এ সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, কোনো কোনো বাক্যাংশে বা বক্তব্যে শব্দই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এবং মর্ম ও ভাব প্রকাশের জন্য শব্দই অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়। এ ধরণের উক্তি ও বাণীর ক্ষেত্রে শব্দগত পরিবর্তনও জায়েজ নয়। যেমন, আযানের জন্য নির্ধারিত শব্দের স্থলে সমার্থবোধক অন্য কোনো শব্দ পাঠ করা জায়েয নয়। অনুরূপভাবে নামাযের মাঝে নির্দিষ্ট দোয়াসমূহ। যেমনÑ সানা, আত্তাহিয়্যাতু, দোয়ায়ে-কুনুত ও রুকু সেজদার তসবীহসমূহ। এগুলোর অর্থ সম্পূর্ণভাবে ঠিক রেখেও কোন রকম শব্দগত পরিবর্তন জায়েয নয়। তেমনিভাবে সমগ্র কুরআন মজিদের শব্দাবলীরও একই হুকুম। অর্থাৎ, কুরআন তেলাওয়াতের সঙ্গে যেসব হুকুম সম্পর্কযুক্ত তা শুধু ঐ শব্দাবলীতেই তেলাওয়াত করতে হবে, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। যদি কোন ব্যক্তি এসব শব্দাবলীর অনুবাদ অন্য এমন সব শব্দের দ্বারা করে পাঠ করতে থাকে, যাতে অর্থ পুরোপুরিই ঠিক থাকে, তবে একে শরীয়তের পরিভাষায় কুরআন তেলাওয়াত বলা যাবে না কুরআন পাঠ করার জন্য যে সওয়াব নির্দিষ্ট রয়েছে, তাও লাভ করতে পারবে না। কারণ, কুরআন শুধু অর্থের নাম নয় বরং অর্থের সাথে সাথে যে শব্দাবলীতে তা নাযিল হয়েছে, তার সমষ্টির নামই কুরআন। আলোচ্য আয়াতের ভাষ্যে দৃশ্যতঃ বোঝা যায় যে, তাদেরকে তওবার উদ্দেশে যে শব্দটি বাতলে দেয়া হয়েছিল, তার উচ্চারণও করণীয় ছিল; সেগুলোতে পরিবর্তন সাধন ছিল পাপ। আর তারা যে পরিবর্তন করেছিল তা ছিল শব্দের সাথে সাথে অর্থেরও পরিপন্থী। কাজেই যারা আসমানী আযাবের সম্মুখীন হয়েছিল। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT