সাহিত্য

আহত প্রেম

আবু মালিহা প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৩:৫০ | সংবাদটি ১৭৯ বার পঠিত

সবুজ শ্যামল গ্রাম। পাশেই বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী। নামটি তাড়িনী। ডিঙ্গি নায়ের দোলায় তরঙ্গের ঢেউয়ে আরও নাচন দিয়ে ছুটে চলে। ছোট ছোট এসব ডিঙ্গি নায়ে অনেকেই তাদের শখ আর আনন্দের খেলায় উদ্দীপনা জাগায়। গ্রামের পুরো এলাকার চঞ্চল বালক বালিকার। জলাঙ্গীর ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে উন্মত্ত কোলাহলে। নয়নাভিরাম উচ্ছলতায় মন প্রাণ জুড়িয়ে যায় প্রকৃতির নৈসর্গিক পরিবেশে। নদীর দু’পাশেই ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর ও ডোল পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুটিরগুলোর ছবির মত ফুটে উঠেছে আকাশ গাঙের নীচে। অপরূপ! নয়নজুড়ানো মুগ্ধতা আর প্রকৃতির আনন্দ বিলায় মনের ভিতর নব তরঙ্গে ঢেউ জাগিয়ে দেয় তাড়িনীর ছুটে চলার চলাৎ চলাৎ শব্দে। এ যেন চিরাচরিত গাঁ-গেরামের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক রূপ। এরই মাঝে ছোট্ট একটি গ্রাম। নাম দোলাপুর। বালক-বালিকাদের উচ্ছল আনন্দে সত্যিকারভাবেই গ্রামটিকে দোলা দিয়ে যায়। আনন্দের বন্যা ছুটে চলে এ এলাকার সহজ সরল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
দোলাপুরের একটি ছেলে। নাম শিশির। বাবা মিশির এবং মা তিশার আদরের নয়নমণি। ছোট বেলা থেকেই ¯েœহ আর আদর দিয়ে বড় করে তুলছে। চোখে চোখে রাখা বাবা মায়ের এ শিশু সন্তানটি বেশ চটপটে ও প্রাণ উচ্ছল। সর্বদা হাসি লেগেই থাকে তার চোখে মুখে। তার সহপাঠীরা তাকে কখনো ঝগড়াঝাটি বা দুষ্টুমি করতে দেখেনি। তবে দৌড় ঝাপ এবং খেলাধুলায় বেশ দক্ষ। মা তার বরাবরই তাকে সাবধান থাকতে বলেন, বেশী দৌড় ঝাপ না করতে। শরীর খারাপ হবে, ব্যথা পাবে অথবা নদীতে পড়ে ডুবে যাবে ইত্যাদি বলে। কিশোর বয়স বলে কথা। বয়স তরঙ্গে সে কথা কে মানতে চায়, এই বয়সে যা চায় সেটা সব ছেলেমেয়েরাই করে। স্বাভাবিকভাবেই দুরন্তপনা তাদের স্বভাব হয়ে পড়ে।
এমনি করে দিন চলছে। পাশের গ্রামেই আছে একটি স্কুল। তাতেই ভর্তি হতে হয় দু’তিন গ্রামের ছেলে মেয়েরা। কাছে আর কোথাও স্কুল বা মাদ্রাসা নেই, নন্দীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। বেলা দশটায় স্কুল শুরু হয়। বিকেল ৩ টায় শেষ হয়। ছুটির ঘন্টার পর স্কুলের আঙ্গিনা গলিয়ে সবাই যার যার বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। শিশিরের বয়স শবেমাত্র ৬তে পড়েছে। বাবা মা অনুভব করলেন ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। এখন তো শুধু খেলার বয়স। তবে স্কুলে ভর্তি করলে খেলাধুলাটা কমবে এবং পড়াশুনার দিকে মনোযোগী হবে। এই ভেবে ছেলেকে নিয়ে বাবা মিশির স্কুলে রওয়ানা দিলেন। একমাত্র ছেলে বড় হয়ে পরিবারের হাল ধরবে এই আশায় এখন থেকেই বাবা মা তার পড়াশুনার দিকে মনোযোগ দিলেন।
প্রায় ৩ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শিশিরকে নিয়ে বাবা মিশির নন্দীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে চারদিক তাকাতে লাগলেন। গ্রামীণ পরিবেশে স্কুলের আঙ্গিনা এবং লম্বা স্কুল ঘরটি আসলে খুবই সুন্দর। বিশ পঁচিশ জন ছেলে মেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করছে। দশটায় ক্লাস শুরু হবে তাই তাদের ক্লাস শুরুর আগে খেলাধুলা করছে। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। পিয়ন এসে ঘন্টা বাজিয়ে ক্লাস শুরুর ঘোষণা দিয়ে গেল। স্কুলের প্রাঙ্গণ খুব মসৃণ নয় বলে আপাতত এসেম্বলী শুরু করা যায়নি। তবে কিছুদিনের মধ্যে সমতল করে শরীরচর্চার ক্লাসটিও চালু হয়ে যাবে। প্রধান শিক্ষক বললেন। ইতিমধ্যে প্রধান শিক্ষক, জহুর আলীর সাথে কথা হয়ে গেছে শিশিরের বাবা মিশির এর সাথে। খুব করে বললেন ছেলের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা। দূর গ্রাম থেকে এসে পড়াশুনা করা কষ্টকর বটে তবুও তিনি তার ছেলেকে মানুষ করার জন্য প্রতিদিনই স্কুলে দিয়ে যাবেন বলে অঙ্গিকার করলেন। প্রধান শিক্ষক জহুর আলী কথা শুনে খুব খুশি হলেন। তিনি তো চানই গ্রামের ছেলে মেয়েগুলো মানুষ হোক। এবং উন্নত হোক গ্রামের চালচিত্র। অবহেলায় আর অনাদরে গ্রামগুলো পিছিয়ে না থাকে। যেখানে কবির ভাষায় গ্রামগুলো ‘শ্যামল ছায়ার শান্ত সুনিবিড়। ছোট ছোট গ্রামগুলো। হ্যাঁ তাই। তবে এখন আর গ্রামগুলো আগের মত নেই। গ্রামে যেন দিনে দিনে কুৎসিত মানুষগুলোর ভিড় বাড়ছে। সহজ সরল উদার মনের মানুষগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। হিংসাত্মক মনোভাবে একে অন্যের ক্ষতি সাধনে যেন এখন লিপ্ত। এবং হানাহানি মারামারি করে অশান্ত করে তুলছে কবিত্বের কল্পনার সেই ছায়া সুনিবিড় গ্রামগুলো। তবুও জদ্দুর আশার আলো একদিন আবারও গ্রামগুলো সুন্দর হবে। শিক্ষা দীক্ষায় মানুষ বড় হয়ে গ্রামের চেহারা পাল্টে দিবে। সেই ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে তার এই প্রচেষ্টা। স্কুলকে সুন্দর করা। ছাত্র-ছাত্রী কালেকশন করা এবং তাদের শিক্ষা দিয়ে দেশের সফল এবং সার্থক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। যাকে বলে মহৎ কাজ। নিজের স্বার্থ চিন্তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে তার এই ব্রত। এভাবেই স্কুল কার্যক্রম চলছে। ৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা। জহুর আলী প্রধান। অন্য দু’জন শিক্ষক এবং শিক্ষিকা। আরও একজন শিক্ষিকা যোগ দিবেন বলে আশা করছেন প্রধান শিক্ষক। আর তখনই ক্লাস মেনটেইন করতে আর কোন অসুবিধা হবে না।
শিশিরের পড়াশুনা ভালই চলছে। বাবার নিয়মিত যাওয়া আসা এবং তার প্রতি তদারকি কোন কিছুতেই কমতি নেই মিশির আলীর। ওভাবেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত গড়ালো। রেজাল্ট খারাপ নয়। এত ধকল সয়ে যে এগিয়ে যাচ্ছে বাবা মা এতেই খুশি। তার মনোযোগও কম নয়। যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ভাল রেজাল্ট করার জন্য। সাথে দু’চার জন ভাল বন্ধুও জুটেছে। তার মত শান্ত এবং ধীর স্থির। দুষ্টুমি বা খুব উশৃঙ্খলতা নেই ওদের মধ্যে।
শিশিরের বাবা গ্রামের ছেলে হলে কী হবে ওর মধ্যে মায়া-মমতা ও সৎ প্রতিবেশী সুলভ মনোভাব বেজায় রকম। ঝগড়াঝাটি তো দূরের কথা, কারো সাথে কটুকথা পর্যন্ত বলে না। এমনই সজ্জন ব্যক্তি মিশির আলী। গ্রামে এ জন্য সবাই তাকে ভালবাসে। তারই ছেলে শিশির। এমন সৎ স্বভাবের বাবার ছেলে তো শিশির এমনই হবে। শান্তশিষ্ট এবং ভদ্র আচরণে তার জুড়ি নেই। ক্লাসে সব ছেলেদের সাথে তার সৎভাব। কারো সাথে কোনো মনোমালিন্য বা কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয় না। সে জন্য সব শিক্ষকদের দৃষ্টিও তার দিকে। যে কোন কাজের জন্য সবাই তাকে ডাকে। কথায় কাজে এমনই তার ভাল আচরণ। মাও তার ছেলের জন্য প্রাণান্ত। একটুখানি চোখের আড়াল হতে দেন না। একমাত্র ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার যত চিন্তা। ছেলে কী খাবে, কী কাপড় পরবে এসব নিয়ে ছেলেকে অনেক কথা বলেন। ছেলের মন খুশি থাকলে মা যে খুশি হন। ছেলেও মায়ের মন বুঝে সে মাকে খুশি রাখার জন্য মায়ের অনেক কথায় সায় দেয়। মা তখন আদর করে তাকে চুমু দিয়ে বলেন, এইতো আমার লক্ষ্মী ছেলে- কতই না ভালো ছেলে....। তোমার পড়াশুনা আরো ভাল করলে দূরে আরো ভাল স্কুলে পড়তে দিব। তুমি তখন আরো বড় হবে। মায়ের এমন আশা জাগানিয়া কথা শুনে ছেলের প্রাণ মন উদ্বেল হয়ে উঠে। মায়ের আশা পূরণ করতে সেও উৎসাহী হয়ে ওঠে। বাবা তার হাল চাষ করে প্রতি বৎসর যে খোরাকী পান তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে যায়। আপাতত কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সেবার বন্যায় অনেক কৃষি ফসল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পরিবারে কিছু টানাপোড়েন ছিল। এবার তেমন অসুবিধা হচ্ছে না- তবে বাড়তি সঞ্চয় তেমন কিছু নেই। মাঝে মধ্যে অসুবিধায় পড়লে যে তাৎক্ষণিক যোগাড় করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়বে। বাজার দর আস্তে আস্তে উর্ধ্বমুখী। এবারের ফসল তোলাও খুব একটা ভাল হবে বলে মনে হচ্ছে না। তবুও আশায় বুক বেঁধে আছে। গাঙের ধারে নিচু এলাকায় বোরো ধান যদি ঠিক মতো উঠে তবে হয়তো কোনো রকমে চলে যাবে। ধানের কচি শীষ জেগেছে। মোটামুটি ফলন ভাল হবে বলে আশা করছে। কারণ এটিই একমাত্র ধানক্ষেত মিশির আলীর বিঘা দুই জমির ফসল দিয়ে ৯ মাসের খাওয়া পরা চলে যায়। বাকী ৩ মাস আয় রোজগারের মত একটা করতেই হয়, নইলে সংসার যে চলে না। পাশাপাশি ছেলে বড় হচ্ছে স্কুলে উপরের দিকে উঠছে। পড়াশুনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই চিন্তা করতেই হয়। তবুও ছেলের পড়াশুনা থামানো যাবে না। তিনি ছেলেকে যে করেই হোক কলেজ পাশ দেওয়াতেই চান। ছেলে ভাল চাকরী করবে এবং বাবার মতো এমন গাধার খাটুনি আর খাটতে হবে না- সেই আকাক্সক্ষা তার। ছেলে মানুষ হবে- এলাকার জন্য কাজ করবে, সমাজের মানুষকে ভাল কাজে উৎসাহিত করবে এবং শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসর করবে। এককথায় সমাজ দরদী যাকে বলে....।
এদিকে শিশিরের স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। স্কুল প্রায় ১৫ দিনের ছুটি। বাড়িতে সবাই কম বেশি আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে। কারণ ডিসেম্বরের শেষ দিকে ফলাফল ঘোষণা করবেন প্রধান শিক্ষক। যেন এক ঈদের দিন। সেই দিনের অপেক্ষায় সবাই থাকে। হাসি আনন্দ আর অশ্রু বিসর্জনের দিন। ফলাফলের ভিত্তিতে এই পরিবেশ। এমন অম্ল মধুর পরিবেশ প্রতিটি ছাত্র জীবনেই ঘটে থাকে। শিক্ষা জীবনের এটাই চিরন্তন রূপ। আমাদের বেলাতেও এরূপ ছিল। এটা বলাই বাহুল্য।
একদিন শিশির ছুটির সময় তার মাকে বলল, মা চল খালার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। মা খুব আদর করে বললেন, অবশ্যই..... তবে তোমার স্কুলের রেজাল্টের পর। সাথে তোমার ভাল রেজাল্ট নিয়ে খালার বাড়ি গেলে সবাই খুশি হবে। ছেলে অবশ্য গররাজি হয়নি। মায়ের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিল। কারণ সুশীল ছেলের বৈশিষ্ট্যই এমন। কোন কথায় অমত করে না, মা বাবার সাথে তো নয়ই। তবু মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু আনমনা হলেন- যদিও ছেলে মুখের উপর ‘না’ বলেনি, তবুও মায়ের মন বুঝে গেছে যে, ছেলে খুব খুশি হতে পারেনি। সে চেয়েছিল রেজাল্টের আগেই ঘুরে আসতে। এতে তার অন্য একটি টান ছিল খালার বাড়ির দিকে। সেই ছোট্টবেলা তার একজন খালাতো বোন ছিল মনিরা- সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে। তার চেয়ে তিন বছরের ছোট। দেখতে যেমন সুন্দর তেমন চপলা। মিষ্টি হাসির চেহারাটি সব সময়ই ওর চোখে লেগে থাকতো।
এবার সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বেশ বড় হয়েছে এবং পড়াশুনায় ভালো। ওকে দেখতে চায়, তাই তার মনটা হঠাৎ করেই খালার বাড়ির দিকে যেতে চাইলো। মনের ভাল লাগা বলে কথা। যাই হোক ছেলে মানুষের মন। মনের টান তো থাকতেই পারে। এমনিতে হঠাৎ করেই তার মনটা চঞ্চল হয়ে উঠছিল তাকে দেখার জন্য- আর তার জন্যই মায়ের কাছে আবদার ধরেছিল খালার বাড়ি যাওয়ার জন্য। যাক মাকে আর সে বিষয়ে সে কিছু বুঝতে দিলো না। আবার মাকে বিরক্তও করলো না সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। (অসমাপ্ত)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT