সাহিত্য

সিলেটের শিল্পসাহিত্যের নানা রঙের দিনগুলো

মিলু কাশেম প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৪:২০ | সংবাদটি ২৮৪ বার পঠিত



শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতায় সিলেট অঞ্চলের রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য। এই ধারাবাহিকতা আজও বহমান থাকলেও কেন জানি মনে হয় অনেক কিছুতেই আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। আমরা যারা বিশেষ করে সত্তর দশকে সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাদের অনেকেই আপসোস করে বলেন, সেই দিন আর নেই। নেই সেই ভ্রাতৃত্ববোধ, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, সাহিত্যসংস্কৃতি কর্মীদের সেই ভালবাসার সেতুবন্ধন। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে সবকিছু। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কাদা ছোড়াছুড়ি শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত করছে।
সত্তর দশককে অনেকেই বলেন সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতির গৌরবের দশক। গত শতাব্দির এই দশকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি দেশের স্বাধীনতা। সারা দেশের ন্যায় স্বাধীনতা উত্তর সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দেখা দেয় প্রাণচাঞ্চল্য। নানামুখী কর্মকান্ডে মুখর ছিল সিলেটের শিল্পসাহিত্যাঙ্গন। সত্তর দশক বিশেষ করে স্বাধীনতা উত্তর সিলেট জন্ম দিয়েছে অনেক প্রতিভাবান লেখক, সাংবাদিক সংস্কৃতি কর্মকে। সিলেটের শিশু-কিশোর তরুণদের কাছেও এই সময়টা অত্যন্ত স্মরণীয় সাফল্যের প্রতীক। সারা দেশের ন্যায় বিভিন্ন শিশু-কিশোর যুবকল্যাণ সংগঠনের নানামুখী শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতায় মুখল ছিল সিলেট। তখন ছিল না কোন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদকের আগ্রাসন। সুন্দর একটা শিল্প-সাংস্কৃতিক আবহ ছিল সর্বত্র। ছিল সকলের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে-অন্যের প্রতি ভালবাসা।
স্বাধীনতা উত্তর সিলেটে শিশু-কিশোরদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন ছিল ‘সুরমা খেলাঘর আসর’। নিয়মিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে এই সংগঠনটি সিলেটের শিশু-কিশোরদের মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিল। খেলাঘরের নিয়মিত সাহিত্য আসর বসতো তাঁতিপাড়াস্থ এইডেড হাই স্কুলে। সিলেটের নবীন-প্রবীণ লেখক, কবি, ছড়াকার সাহিত্য প্রেমিকদের মিলন মেলা বসতো প্রায়ই সুরমা খেলাঘর আসরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে ঘিরে। কবি দিলওয়ার, ছড়াকার তুষার কর, নাট্যকার বিদ্যুৎ কর, বুদ্ধদেব চৌধুরী, ভীষ্ম দেব চৌধুরী, সেলু বাসিত, ডাঃ ফজল মাহমুদু, গোবিন্দ পাল, সন্তু চৌধুরী, রবিন্দ্র পাল, শাখী দাশ পুরকায়স্থ, শেখর ভট্টাচার্য, আনোয়ার ইকবাল কচি প্রমুখ ছিলেন সুরমা খেলাঘর আসরের সকল কর্মকান্ডের কান্ডারী। ‘আবার আসিব ফিরে’ নামক একটি সংকলন প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সুরমা খেলাঘর আসর থেকে বেরুতো। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, রুচিশীল এই সংকলনটির খ্যাতি ছিল দেশব্যাপী। খেলাঘরের পাশাপাশি যে সংগঠনটি আমরা সুন্দর হবো শ্লোগান নিয়ে সারা দেশের মত সিলেটের শিশু-কিশোর-যুবকদের বিনিসুঁতোর মালায় গেঁথে ছিল সেটি হলো ‘চাঁদের হাট’। প্রখ্যাত ছড়াকার রফিকুল হক (দাদু ভাই) এর পরিচালনায় এই সংগঠনটি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন হিসেবে জন্মনেয়ার অল্পদিনের মধ্যেই দেশব্যাপী সাড়া ফেলে। ১৯৭৪ সালে সিলেটে ‘চাদের হাট’-এর শাখা গঠনের পর থেকে নানামুখী কর্মকান্ডে অল্পদিনেই এটি সিলেটের শিশু-কিশোরদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে। সিলেটে চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন তৎকালীন সিলেট পৌরসভার সর্বকনিষ্ট কমিশনার পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান ও মেয়র, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। আমি ও সাহাদত করিম সহ আমরা কজন কামরান ভাইকে নিয়ে এসেছিলাম এই জগতে। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর কর্মদক্ষতায় অল্পদিনে চাঁদের হাট সিলেটের সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তারা হলেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), শাহাদাত করিম, সোলাইমান আহসান, এনামুল হক জুবের, রোকেয়া খাতুন রুবী, শাহেদা জেবু, হোসনে আরা হেনা, হীরা শামীম প্রমুখ। চাঁদের হাটের নিয়মিত সাহিত্য আসর বসতো বারুতখানায় শাহাদাত করিমের বাসভবন এবং বারুতখানা পয়েন্টের পাশে যে বাড়িতে মনোরম নামের কারুপণ্য বিপণী ছিল। সিলেটে অনেক সুন্দর স্মরণীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে চাঁদের হাট। সিলেট পৌর পাঠাগার ছিল চাঁদের হাটের সকল কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র। পরলোকগত নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, অধ্যাপক মোহাম্মদ সফিক, অধ্যাপক আবুল বশর প্রমুখের মতো গুনীজনরা নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন চাঁদের হাটের সকল কর্মকান্ডে। “আমরা কজন নবীন মাঝি” নামে রোকেয়া খাতুন শাহাদাত করিম ও আবুল কাশেম মিলু'র (মিলু কাশেম) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল একটি অনিন্দ সুন্দর সাহিত্য সংকলন। প্রখ্যাত শিল্পি আফজাল হোসেনের মনোরম চার রঙ্গের প্রচ্ছদ সুখপাঠ্য অনেক কবিতা, ছড়া, গল্পে সমৃদ্ধ সংকলনটি সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। পরবর্তীতে চাঁদের হাটের সাথে সম্পৃক্ত হন সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ নাসের ইকবাল সহ আরোও অনেকে। চাঁদের হাটের পরে যে সংগঠনের ছায়াতলে সিলেটের শিশু-কিশোররা সমবেত হয়ে শিল্প-সাহিত্যের শাখা প্রশাখাকে পল্লবীত করেছেন সেটা হলো রেডিও ক্লাব, শাপলা শালুকের আসর। এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান ছিলেন রেডিও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ খ্যাত প্রখ্যাত গীতিকার ফজল.এ.খোদা (মিতা ভাই)। সারা দেশের ন্যায় সিলেটের গ্রামে-গঞ্জের শিশুদের মাঝেও শাপলা শালুকের আসর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর নানামুখী কার্যক্রম। সিলেটে শাপলা শালুকের আসরের বিভিন্ন সফল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিশু-কিশোরদের কল্যাণমুখী কর্মকান্ড যাদের ফলপ্রসু সহযোগিতায় ছিল কর্মমুখর তারা হলেন লোকমান আহমদ, আজিজ আহমদ সেলিম, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) , শাহাদাত করিম, সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, সৈয়দ আবুল মনসুর (লিলু), আব্দুল বাসিত মোহাম্মদ, হীরা শামীম, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, সোলেমান আহমদ, সৈয়দ আবু জাফর (হীরু), সৈয়দ আবু নাসের দিলু (দিলু নাসের) ও সৈয়দা ফাহিমা খাতুন রিপা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ঝিঙ্গেফুল নামে শাপলা শালুকের আসর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল একটি আকর্ষণীয় রঙ্গিন শিশু-কিশোর সংকলন। সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলাম আমি নিজে (আবুল কাশেম মিলু) ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন লোকমান আহমদ। এই সংকলনে সিলেটের অনেক কবি, লেখক, সাংবাদিকের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল। সিলেট শহর ছাড়াও মফস্বলের অনেক এলাকায় এই সংগঠনের নানামুখি কর্মতৎপরতা বিস্তৃত ছিল। শাপলা শালুকের সাথে সিলেটের বাইরে যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:- গোলাপগঞ্জের হেতিমগঞ্জ শাখার ইকবাল সিদ্দিকী, বিশ্বনাথের কশিমপুর শাখার আবু সাঈদ ফয়জী (আ.ফ.ম.সাঈদ) ও মৌলভীবাজারের গোড়ারাই শাখার গোলাম রব্বানী (রব্বানী চৌধুরী) প্রমুখ।
১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে সিলেটে গঠিত হয় জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘প্রান্তিক কঁচি কাচার মেলা’। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেলার পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই, বেগম সুফিয়া কামাল, মেলার তৎকালীন ছোট্টবন্ধু আজকের প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনসহ আরো অনেকে যোগ দিয়েছিলেন। সিলেটে কচি কাচার মেলা গঠনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের সিলেট প্রতিনিধি আব্দুল মালিক চৌধুরীর। আর মেলার সকল কর্মকান্ডের নেপথ্যে ছিলেন গল্পকার মাহবুব আহসান চৌধুরী। শাপলা কুঁড়ির আসর সহ আরো বেশকিছু শিশু-কিশোর যুবকল্যাণ সংগঠনের কর্মতৎপরতা ছিল উল্লেখ করার মত। যারা নানাভাবে নিজেদের কর্মদক্ষতায় সমৃদ্ধ করেছেন সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে।
স্বাধীনতা উত্তর সিলেটের অনেক স্থানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের জমজমাট আড্ডা বসতো। এর মধ্যে প্রধান আড্ডা বসতো প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য (বাবুল দা)’র মালিকানাধীন বন্দর বাজারের নীরা রেষ্টুরেন্টে। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় পালাক্রমে নীরায় চলতো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের আডডার আসর। কবি দিলওয়ার, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক কবি বেলাল মোহাম্মদ, রফিকুর রহমান লজু, হামিদ মোহাম্মদ, তুষার কর, মোয়াজ্জেম হোসেন, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), জিষ্ণু রায় চৌধুরী (বর্তমানে ভুঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত), নুরুজ্জামান মনি, আজিজ আহমদ সেলিম, আবু বকর, মোহাম্মদ হানিফ, সৈয়দ নাহাশ পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, টিপু মজুমদার, বিদ্যুৎ কর প্রমুখের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। কবি দিলওয়ারের ভার্থখলাস্থ খান মঞ্জিলেও মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর বসত নিয়মিত আড্ডা। লোকমান আহমদ, মিজান আজিজ সুইট, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), নুরুজ্জামান মনি, আজিজ আহমদ সেলিম, তুষার কর সহ অনেকেই ছিলেন সেই আড্ডার নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। দেশ-বিদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করতেন অনেকেই। দিলওয়ার ভাইয়ের সৌজন্যে রাতের খাবারও জুটে যেত আড্ডাবাজদের ভাগ্যে। বেলাল মোহাম্মদের বাসায়ও মাঝে মাঝে বসতো শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। আমরা অনেকেই নিয়মিত ছিলাম সেই আড্ডায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক অজানা কাহিনী আমরা শুনেছি বেলাল ভাইয়ের মুখে। আড্ডার সাথে রাতের খাবার মুখরোচক খাবারের ব্যবস্থাও ছিল বেলাল ভাইয়ের বাসায়। বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ছড়ারপাড়ের বাসায়ও মাঝে মাঝে শিল্প সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা বসত। লোকমান আহমদ, মিজান আজিজ সুইট ও আমি থাকতাম সেই আসরে নিয়মিত। তাছাড়া রায়নগর ব্রজনাথ টিলার ‘সপ্তর্ষী' (শাহেদা জেবুদের বাসভবন) ও দরগা মহল্লা ঝরনার পাড়ের রোকেয়া খাতুন রুবীদের বাসভবনের ভূমিকা ছিল সিলেটের শিশু-সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য। শাহেদা জেবুরা তিন বোনই (জেবু, হেনা, হীরা) পরিচিত ছিলেন শিশু সাহিত্যের জগতে। আর রোকেয়া খাতুন রুবীদের সমস্ত পরিবারই তো সাহিত্য জগতের নিবেদিত প্রাণ। সবাই লেখালেখির সাথে জড়িত। এই দুই বাড়ির পরিবেশও ছিল শিল্প সাহিত্যের অবরণে ঢাকা। নবীন-প্রবীণ অনেক সাহিত্যপ্রেমীদের যাতায়াত ছিল তাদের বাসভবনে। আমাদের অনেকের সাথেই লেখালেখির সূত্রে এই দুই পরিবারের সাথে গড়ে উঠেছিল আন্তরিকতাপূর্ণ পারিবারিক সৌহার্দ্য। এছাড়া সিলেটের ছড়াকারদের আড্ডা ছিল জিন্দাবাজারের ম্যাগাজিন সেন্টার, আম্বরখানায় ফাতেমা রেষ্টুরেন্ট ও বন্দর বাজারের ছড়াকার শামসুল করিম কয়েস এর কয়েস ফার্মেসী ও বাংলাদেশ বেতারের কয়েস ভাইয়ের অফিসে, ছড়াকার মাহমুদ হকের কাজীটুলার বাসা ও কয়েস ভাইয়ের দরগা গেইটের বাসায় আমাদের কয়েকজনের ছিল নিয়মিত যাতায়াত। তুষার কর, শাহাদাত করিম, ভীষ্মদেব চৌধুরী, গোবিন্দ পাল, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), আজিজ আহমদ সেলিম, নুরুজ্জামান মনি, সৈয়দ নাহাস পাশা সহ অনেকেই নিয়মিত আসতেন এসব আড্ডায়। প্রায়ই অনুষ্ঠিত হত জমজমাট ছড়াপাঠের আসর। কবি দিলওয়ার, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, তুষার কর, মুকুল আশরাফ সহ আমরা নবীন অনেক ছড়াকার অংশ নিতাম এসব আসরে। হাট্টিমাটিম, চুমকি সহ অনেক ছড়াকার্ড বেরুতো সিলেট থেকে। সূর্যদয়েও তুমি, খুলিহাল তুলি পাল, ঈশান, ঘুম নেই, ইত্যাদি অনেক আলোচিত সংকলনও প্রকাশিত হয়েছিল সিলেট থেকে। তুষার কর ও আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) এর সম্পাদনায় বের হয় দেশের প্রথম ছড়া ও ছড়াকার বিষয়ক মিনি সংবাদপত্র ‘ছড়া সন্দেশ’। বিষয় বৈচিত্র্যে অনন্য এই পত্রিকাটি তখন বাংলাদেশ ও ভারতের ছড়া লেখক ও পাঠকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রখ্যাত সংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোর্শেদ দৈনিক বাংলা পত্রিকার শেষের পাতায় তার নিয়মিত কলাম ‘লোকলোকালয়'-এ ছড়া সন্দেশ এর প্রশংসা করে আলোচনা করেন। আকাশবাণী কলকাতায় প্রখ্যাত সংবাদ ভাষ্যকার দেবদুলার বন্দোপধ্যায়ও ছড়া সন্দেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন তার প্রতিবেদনে। ছড়া সন্দেশের আরেকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় ৮০ সালের জুন মাসে। তখন এই উদ্যোগের সাথে যোগ হয় নুরুজ্জামান মনি, আজিজ আহমদ সেলিম ও সৈয়দ বেলাল আহমদের নামও।
সত্তর দশকে সিলেটের তরুণ কবিদের আরেকটি প্রধান আড্ডাস্থল ছিল জিন্দাবাজার পয়েন্টের বকস ছাপা ঘরে। লেখক আকসার বকসের মালিকানাধীন এই প্রেসে প্রায় সারা দিনই কবি, সাহিত্যিকদের আড্ডা লেগে থাকতো। ছাপাঘরে যারা নিয়মিত আসতেন তাদের মধ্যে ছিলেন-মহীউদ্দিন শীরু, খলিলুর রহমান কাসেমী, অজয় পাল, রাগিব হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হামিদ মানিক, মাহমুদ হক, জামান মাহবুব, মঈনুল ইসলাম চৌধুরী, কুমার দিলীপ কর, হামিদ মোহাম্মদ, নিজাম উদ্দিন সালেহ, শাব্বির জালালাবাদী, মাহমুদুল হক ওসমানী প্রমুখ। ছাপাঘর থেকে আকছার বকসের সম্পাদনায় আবির্ভাব নামে অনিয়মিত একটি পত্রিকাও বেরোত। নতুন লেখক সৃষ্টিতে আবির্ভাব অনেক ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া রাগীব হোসেন চৌধুরীর সম্পাদনায় বেরোত সাহিত্য পত্রিকা জাগরণ। একঝাক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কিশোর সাহিত্যিকদের কলতানে তখন মুখরিত ছিল সিলেটের সাহিত্যপাড়া। নিয়মিত যারা স্থানীয় জাতীয় পত্র-পত্রিকায় লিখতেন তাদের মধ্যে এই মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আব্দুল হামিদ মানিক, মহীউদ্দিন শীরু, ছালে আহমদ, আহমদ আনিসুর রহমান, শামসাদ হুসাম, রাগীব হোসেন চৌধুরী, তুষার কর, আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, খলিলুর রহমান কাসেমী, ফরিদ আহমদ রেজা, রেনু লুৎফা, লুৎফুন নেছা লিলি, লাভলী চৌধুরী, আমেনা আফতাব, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, হামিদ মোহাম্মদ, কাদের নওয়াজ খান, জামান মাহবুব, আকসার বকস, বুদ্ধদেব চৌধুরী, মুকুর আশরাফ, মোস্তফা বাহার, মোজাহিদ শরীফ, রোকেয়া খাতুন রুবী, মাহবুব আহসান চৌধুরী, আনোয়ার ইকবাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), গোবিন্দ পাল, সেলু বাসিত, সন্তু চৌধুরী, নুরুজ্জামান মনি, আজিজ আহমদ সেলিম, জিষ্ণু রায় চৌধুরী, এনামুল হক জুবের, আজিজুল হক মানিক, শাহেদা জেবু, হোসনে আরা হেনা, হীরা শামীম, জেরিনা শিরীন, ইয়াসমিন পলিন, রাজিয়া নীলুফার নীলু, সুরাইয়া নাসরিন শেফু, আব্দুল হাই মিনার, তমিজ উদ্দিন লোদী, নজরুল ইসলাম বাসন, শেখর ভট্টাচার্য, আব্দুল বাছিত মোহাম্মদ, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, শাহীন ইবনে দিলওয়ার, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, হামিদা খাতুন, শেফালী, জুবেদা খাতুন শিউলী, সাজেদা খাতুন শুভী, টিপু মজুমদার, শাহাদাত করিম, মাহমুদুল হক ওসমানী, শাব্বির জালালাবাদী, নিজাম উদ্দিন সালেহ, সোলাইমান আহসান, সেলিম আউয়াল, আয়েশা আহমদ, আবু বকর মোহাম্মদ হানিফ, শাহ মোহাম্মদ আনসার আলী, বদরুদ্দোজা বদর, আল আজাদ, ফতেহ উসমানী প্রমুখ। এদের অনেকেরই ছিল দেশব্যাপী খ্যাতি ও পরিচিতি। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমাদের লেখা প্রকাশিত হত। সিলেটের জিন্দাবাজারের নিউজ কর্ণার, ম্যাগাজিন সেন্টার, তালতলার বলাকা নিউজ হাউসে দেশী এবং ভারতীয় সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত পাওয়া যেত। সেই সুবাদে এই সব দোকানেও লেখকদের আডডা থাকতো।
৭৫-পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনকালে প্রগতিশীল সাহিত্য সাংস্কৃতিক শিবির নামে একটি সংগঠনের কর্মতৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সিলেটের অনেক প্রগতিশীল লেখকদের সমন্বয়ে পরিচালিত হত এর কর্মকান্ড। শাহ মোহাম্মদ আনসার আলী, লোকমান আহমদ, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) সহ অনেকেই ছিলেন এর নেপথ্য কারিগর। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ডাক দিয়ে যাই, দূর্ণীবার, নামে বেশ আলোচিত দুটি সংকলন পত্রিকা বের হয়েছিল। সে সময়ে ডাক দিয়ে যাই সংকলনে বেশ আলোচিত কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। যা পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়।
সিলেটের শিশু সাহিত্যকেন্দ্রিক স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য সাপ্তাহিক যুগভেরীক

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT