ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হবিগঞ্জের লোকখাদ্য

আবু সালেহ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৯ ইং ০০:৩৯:৪১ | সংবাদটি ৩০১ বার পঠিত

লোকখাদ্যে হবিগঞ্জ জেলার মানুষের আলাদা একটি ঐতিহ্য রয়েছে। অতীতে এ খাদ্যের প্রতি মানুষের নিজস্ব একটি স্বকীয়তা ছিল। খাদ্যগুলো হবিগঞ্জ ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় ত্রিশ শতক থেকে নব্বই শতক পর্যন্ত অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
শালুক : বর্ষাকালে পানিতে লতা জাতীয় এক প্রকার গাছে শালুক জন্মে। এটা কালো রঙের গুটা জাতিয় জলজ উদ্ভিদ, যা সেদ্ধ করে খেতে হয়। কয়েক ধরনের শালুক বাজারে এখনও কিছু কিছু দেখা যায়। হুন্দাই জাতিয় শালুক এর চাহিদা প্রচুর। বর্তমান বাজারে শালুক ৭০-৮০ টাকা কেজি হিসাবে বিক্রি করা হয়। হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বিশেষ করে মকা, কাগাপাশা, ঝিলুয়া ও আজমেরীগঞ্জে হাওরে প্রচুর শালুক পাওয়া যায়। ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক এই তিন মাস কয়েক হাজার শ্রমিক এটা উত্তোলন করে বিক্রি করত বলে প্রাচীন মুরুব্বিদের কাছ থেকে জানা যায়। ষাটের দশকের পর থেকে এর চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। বর্তমানে দেশে বিদেশে শালুকের প্রচুর চাহিদা থাকলেও আশানুরূপ ফলন হচ্ছে না।
কুই : ভাতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কুই, শালুক, সিংরা প্রভৃতি জলজ ফল মূল হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রচুর পরিমাণে জন্ম নিত। যা খেয়ে অতীতে অনেকেই ভাতের অভাব মিটাতে পারত। কুই থেকে প্রাপ্ত আটা সদৃশ রুটি বানিয়ে খেয়েছেন বলে অনেক প্রাচীন মুরুব্বিরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কুই শালুকের মতই পানির নিচে লতা জাতিয় গাছে জন্মে।
ছিকড় : আশি দশকের পূর্বে হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু পরিবার দিনারপুরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এটেঁল জাতিয় মাটি এনে এক প্রকার আহার্য্য সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি লব্দ অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত বলে লোক সংস্কৃতির বিষয়াবলী থেকে জানা যায়। বিভিন্ন জিনিস পত্রের সাথে ইহা ফেরি করে নগদ টাকা পয়সা ও চাউল দিয়ে বিক্রি করা হত বলে জানা যায়। অনেক মৌলভী ও হুজুর মাটি খাওয়াকে হারাম বলে প্রচার করতেন। হয়তো একারণেই ইহার চাহিদা দিন দিন কমে গেছে। বানিয়াচং চতুরঙ্গ রায়েরপাড়া গ্রামের স্বর্গীয় গোপাল পালের স্ত্রী শান্তি রানী পাল (৬৫) এখনও এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, তার ছেলে মেয়েদের ছোট রেখে তাদের বাবার মৃত্যুর পর, মেয়ে শিল্পী রানী পাল ও ছেলে গুপন পাল, স্বপন পাল ছোটবেলা থেকেই বড় বাজারে নিয়ে বিক্রি করার পাশাপাশি তারা লেখাপড়াও চালিয়েছিল। এখন ইহার চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ছিকরের পাশাপাশি খই, মুড়ি, নারু, তৈরি করে কয়েক বৎসর আগেও ইহা বিক্রি হতে দেখা যায়।
কঁচু ও মুকি : বানিয়াচঙ্গ সহ হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কচুঁ চাষের প্রচলন ছিল দীর্ঘ দিনের। বাড়ির সামনে খালে, বিলে, ঝিলে ও নিচু জমিতে প্রচুর পরিমাণে কঁচু রোপন করা হত। সাধারণত কঁচু কার্তিক মাসে রোপন করা ও বৈশাখ মাসে তোলা হয়। কঁচু প্রায় ৮-৯ প্রকারের। মুড়া জাতীয় কঁচু যাকে বানিয়াচঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় জাইত কঁচু বলা হয় ইহার মুড়া প্রায় এক থেকে দেড় হাত পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। মুড়া জাতীয় কঁচু থেকে লতা পাওয়া যায়। লতা সাধারণত মাটির উপর দিকে ২-৩ হাত পর্যন্ত লম্বা হয়। ইহা খুবই সুস্বাদু খাদ্য ২০ বছর পূর্বে ও কঁচুর চাষ করে নৌকা ভর্তি করে পার্শ্ববর্তী থানা দিরাই, শাল্লা, হবিগঞ্জ, নবীগঞ্জ এলাকায় নিয়ে বিক্রি করা হত। ভাটি অঞ্চলে কঁচুর চাহিদা থাকায় নৌকা বোঝাই করে বর্ষা কালে ধান চাউলের মাধ্যমে বিক্রি করা হত বলে জানা যায়। বর্তমানে খাল বিল ভর্তি হওয়ার কারণে ও মানুষ বিভিন্ন পেশায় আকৃষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বিশেষ করে রবি শস্যের প্রতি মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন অনেকেই কঁচু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
শুটকি মাছ : হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে কয়েক শত বছর ধরে শুটকি মাছ তৈরি করা হয়। শুটকি তৈরি করার জন্য অত্র অঞ্চলের শুকনা পুটি মাছ ও বাশঁপাতি মাছ আমদানি করে মঠকাতে ভাজ করে ভরে মাছের তেল দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ইহা তৈরী করা হয়। যুগ যুগ ধরে ইহার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূর্বে ইহা বাজারে বিক্রি করলে ও ইদানিং কালে বেশ কিছু মহিলারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান, চাউল ও নগদ টাকা দিয়ে বিক্রি করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সাথে প্রায় কয়েকশত পরিবার জড়িত থেকে প্রচুর শুটকি উৎপাদন করে আসছেন।
ছিকর : ছিকর হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন গ্রামে নি¤œবিত্ত সমাজে প্রচলিত এক বিশেষ আহার্য। ক্ষিধা নিবারণের জন্য নয়, বরং এক ধরণের অভ্যাসের বশে লোকজন তা খেয়েছে বলে জানা যায়। ছিকর হচ্ছে একধরণের পোড়া মাটি। পাহাড়ি টিলায় গর্ত খুড়ে লম্বা বাঁশের সাহায্যে গভীর থেকে তুলা হয় একধরণের মিহি মাটি। তারপর তা মাখিয়ে খাই বানিয়ে ছাঁচে ফেলে প্রথমে তৈরি করা হয় মন্ড। তারপর তা পছন্দ মত কেটে টুকরো করা হয়। পরে বিশেষ এক পদ্ধতিতে সেই টুকরো পুড়ানো হয় আগুনে। এইভাবে তৈরি হয় ছিকর। ছিকর বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। কোনটি দেখতে বিস্কুটের মত কোন কোন ছিকর আছে ললিপপের মত লম্বা আবার কোন ছিকর ছোট লজেন্সের মতো।
বিভিন্ন এলাকার ছিকর বিভিন্ন স্বাদের হয়ে থাকে। কোন এলাকার ছিকরে খাই মাখানোর সময় গোলাপজল, আদার রস ইত্যাদি মেশানো হয়। যা মাটির সাথে পুড়ানোর পর ভিন্ন এক স্বাদের জন্ম দেয়। স্থানীয় কুমার সম্প্রদায় বা মৃৎ শিল্পীদের কেউ কেউ ছিকর তৈরি করে বাজার জাত করে থাকে। দিনে দিনে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ছিকর এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরে পাহাড়ি টিলা থেকে একসময় বিভন্ন এলাকার কুমাররা এসে মিহি মাটি সংগ্রহ করত। কিন্তু আজ কাল কেউ আর মাটি সংগ্রহ করতে যায় না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। উক্ত টিলা ছাড়াও বানিয়াচং, বাহুবল ও মাধবপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছিকরের উপযোগি মাটি আহরণের ক্ষেত্র আছে। হবিগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন গ্রাম্য বাজারে ঘুরে ছিকরের সন্ধান মিলেনি। বিশিষ্ট লেখক দেওয়ান মাসুদুর রহমান চৌধুরী জানান, ‘মাটিকে ভিজিয়ে নরম করে রুটির মত করে ছোট ছোট টুকরোর মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শুধু মাত্র আগুনের ধোয়া দিয়ে পুড়িয়ে তৈরী করা হত। যা এ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে ছিকর নামে পরিচিত। ৭০/৮০ দশকে হবিগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে এই ছিকর পাওয়া যেত। গর্ভবতী মহিলাদের কাছে ইহা একটি পছন্দনীয় সুস্বাদু খাদ্য ছিল। তাদের ধারণা ছিল এটা খেলে বিভিন্ন রোগ বালাই থেকে বেঁচে থাকা যাবে’। এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলার সৈয়দপুর বাজার ও মাধবপুর উপজেলার নারায়ণপুর ও ঘোমটিয়া গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সাথে কথা বলে সবার কাছ থেকে প্রায় একই রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। দু®প্রাপ হওয়ায় ছিকর খাওয়া এখন ভুলে গেছেন তারা। তবে সদর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের লস্করপুর ইউনিয়নের কটিয়াদি বাজারে মোঃ হুসাইন উল্লা নামক এক ছিকর বিক্রেতার খোঁজ মিললে তার সাথে কথা বলে জানা যায় ছোট বেলা থেকে তিনি ছিকর বিক্রি করে আসছেন। আগে মানুষ ছিকর কিনত এখন খুব কম লোকই কিনে। মূলত আধুনিক শিক্ষিত মানুষরা ছিকর খাওয়াকে অস্বাস্থ্যকর ও রুচি বিরুদ্ধ বিবেচনা করার কারণে ছিকর এখন বিলুপ্তির পথে।
বুকনাই : বুকনাই হবিগঞ্জ অঞ্চলের এক ব্যতিক্রমী আহার্য। কারণ তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদি সহ অন্যান্য অঞ্চলে পরিচিত নয়। বুকনাই একধরণের জাউ বিশেষ। যা তৈরি হয় ধানের বিজাঙ্কুর থেকে। তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল ও প্ররিশ্রম সাধ্য। প্রথমে ধানের বীজ ভিজিয়ে রেখে তা অঙ্কুরদগম করা হয়। অঙ্কুর উন্মেষ ঘটলে সেই ধান কড়া রৌদে উত্তম রূপে শুকিয়ে তা ঢেকিতে পাড় দিয়ে গুড়ো করা হয়। পরে তা থেকে খোশার গুড়ো বা তুষ কুলা দিয়ে জেড়ে পৃথক করা হয়। অবশিষ্ট থাকে তখন শুধু চাল ও অঙ্কুরের গুড়ো। এবার সেই গুড়ো নিয়ে বসানো হয় চুলায় হালকা আগুন দেওয়া শুরু হয় জাল। একটানা চলতে থাকে সাত থেকে আট ঘন্টা এক পর্যায়ে তা হয়ে উঠে খাবারের উপযোগী ও মানসম্মত। বুকনাই তৈরিতে চিনি, গুড় বা মিষ্টি জাতীয় কোন কিছুই মেশানো হয় না। শুধুই চাল ও অঙ্কুরের গুড়ো। কিন্তু খেতে তা কড়া মিষ্টি লাগে।
গ্রামের সব মহিলারা বুকনাই তৈরি করতে পারেন না। যারা পারেন বুকনাই পিয়াসুদের কাছে তাদের বেজায় কদর। বুকনাই তৈরিতে পারদর্শি সদর উপজেলার চরহামুয়া গ্রামের এমন এক গৃহিনীর সাথে কথা বলে জানা যায় বুকনাই তৈরির পর তা সময়ে সময়ে যত বেশি জাল দেওয়া হবে মিষ্টি ততই বাড়বে। বুকনাই হবিগঞ্জ অঞ্চলের ব্যতিক্রমী ও অসাধারণ এক লোকখাদ্য। এতে কোন সন্দেহ নেই।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • Developed by: Sparkle IT