ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গাছ

মো. তাজ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪০:০৫ | সংবাদটি ৩২৯ বার পঠিত

সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে মানুষ পাঠানোর পূর্বে বৃক্ষাদি স্থাপনের ফলে আজ আমরা বিভিন্ন গাছ-গাছালি বনাঞ্চল থেকে উপকার পেয়ে যাচ্ছি। এই গাছ-গাছালি ও বৃক্ষাদি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরীফে আর-রাহমান সূরার ৬নং আয়াতে বলেছেন তৃনলতা ও বৃক্ষগুলো আল্লাহ পাকের অনুগত রয়েছে, আর ১১নং আয়াতে বলেন, তাতে রয়েছে ফলমূল খেজুর বৃক্ষ, যার ফল আবৃত থাকে, ও ১২নং আয়াতে আরও বলেন তাতে রয়েছে বুশিযুক্ত তরিতরকারী এবং সুগন্ধি পুষ্ট। এসব অগণিত নিয়ামত সৃষ্টিকর্তা মানবজাতির মঙ্গলের জন্য উপহার হিসাবে অমূল্য বন্যপরিবেশ গাছ-গাছালি বিদ্যমান রেখে আমাদেরকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। এই গাছ গাছালি শুধু শরীরের দুষিত বাতাস ভোগ করছে, আর ভাল বাতাস দিয়ে যাচ্ছে তা নয়, গাঁছ মানবজাতির আপন বন্ধু হিসাবে প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে যাচ্ছে। গাছের মধ্যে ঔষধী গাঁছ মানবজাতি সহ সকল প্রাণীর জীবন রক্ষা করছে। ঔষধী গাছ আর সুগন্ধি ফুল-ফলে ভরা দেশ ও পৃথিবী। সৃষ্টিকর্তার নিয়ামতকে অস্বীকার করার কিছুই নাই। গাছ-গাছালি বনাঞ্চল মানুষের সর্ব ক্ষেত্রে উপকারী। এই গাছ-গাছালী সম্পর্কে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বেশি কিছু লিখা সম্ভব হবেনা, গুণীজন লিখে যাচ্ছেন, আরও দেশীয় গাছ রক্ষার্থে লিখে যাবেন বলে মনে করছি।
দেশে ১৯৯১-৯২ সালে বৃক্ষরূপন কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সময়ে দেশে শ্লোগান উঠে বেশি বেশি গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান, ১টি গাছ কাটলে ৩টি গাছ লাগান। এই শ্লোগানের মধ্যদিয়ে দেশের মহাসড়ক সহ জেলা-উপজেলায় ও বিভিন্ন ছোট-বড় রাস্তার কিনারে বা বাড়ীর আশপাশে বিদেশী প্রজাতীর গাছ লাগানোর চাহিদা বেঁড়ে থাকে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যে, বিদেশী প্রজাতীর গাছ লাভজনক মনে করে দেশীয় প্রজাতীর গাছ রোপণ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। দেশে রয়েছে অনেক অনেক ঔষধী গাছও যা কেটে ফেলা হলে আর লাগানো হচ্ছেনা। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করার পূর্বে দেশীয় গাছে ভরপুর ছিল বেশি। সেই সময় দেশে ঔষধী গাছ সহ সর্ব প্রকার গাছ পাওয়া যেত। এখন তিন বাড়ী খুজে নিম গাছের পাতা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পূর্বেকার দিনে ঔষধী গাছ থেকে আমরা ঔষধ সেবন-খাওন সহ সর্ব প্রকারের রোগ মুক্ত হয়েছি। এখন দিন বদলের পালায় ও মেডিসিনের আগমন ঘটায় ঔষধী গাছ কে জেনে-না-জেনে দেশ থেকে বিদায় করে দিচ্ছি। প্রাকৃতিক ভাবে বৃক্ষাদি রোপণ, মাটির সাথে মিশ্রিত বীজ’র উঠন্ত চারাগুলো অনবরত কেটে থাকলে এক সময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি সোনার বাংলাদেশ হতে বনাঞ্চল হারিয়ে যাবে বলে মনে হয়। দেশীয় প্রজাতির গাছ আমাদের উপকারী বেশি এবং দেশে বনাঞ্চলকৃত গাছ-গাছালি থাকায় পৃথিবীর মধ্যে সবুজেঘেরা বাংলাদেশ পর্যটন নগরীর কমতী নেই।
দেশে ঔষধী গাছের মধ্যে নিম গাছ, হরতকী গাছ, বহেরা জয়তুন গাছ, হেওরা গাছ সহ আরও অনেক অনেক গাছ রয়েছে এবং কাঠ জাতীয় গাছের মধ্যে রয়েছে চন্দন গাছ, চাকারশী গাছ, ঝারইল গাছ, গর্জন গাছ, ফরিশ গাছ, করই গাছ, কালাজাম গাছ, বইজ্জাত গাছ, ও কৃষ্ণচূড়ার গাছ, কদম গাছ, অর্জুন গাছ, জলপাই গাছ, বাসক গাছ, কুমারী গাছ, শিমুল গাছ, চাঠনী গাছ, বরই গাছ, বুটিজাম গাছ ও বিভিন্ন প্রকারের বাঁশ যেমন বাখাল বাঁশ, মুলিবাঁশ, বেতুবাঁশ, মিরিতিংগা বাঁশ, এর মধ্যে অন্যতম “তাল গাছ, “খেজুর গাছ”, আমাদের উপকারী হিসাবে ভিন্ন। এসব দেশীয় প্রজাতীর গাছ রোপণ করা জরুরি। আমরা ১টি গাছ কাটলে ৩টি গাছ লাগানো জরুরি। না হয় দেশীয় প্রজাতীর গাছ সহ সকল প্রকার গাছ হারিয়ে যেতে পারে।
গাছের ফল : দেশে আমদানীকৃত ফল আপেল, আংগুর, কমলা, মালটা, ডালিম মানুষের চাহিদার তুলনায় ফলন নাই বলে চলে। যার ফলে উচ্চ বিলাশি মেডিসিনে আক্রান্ত বিদেশী ফল খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ান্তর থাকেনা।
দেশীয় ফল যেমন কাঠাল, আম, আনারস, তরমুজ, লিচু, কলা, কুল, জাম, ও জলপাই, আমলকী, ভুবি, লুকলুকি, গোলাপজাম, ডেফল, চইলতা, ডেউয়া, কামরাঙা, তাল, জাম্বুরা, আমড়া, নারিকেল, লটকন, কদবেল, অরবরই, চুকুর, করমচা, কাউ, সফেদা, কাঠলিছু, সাতকরা, গন্ধরাজ লেবু, কাগজি লেবু, জারা লেবু, টিপাফল, ডুমুর, আঁশফল, বৈচি, লংগান, আতা, শরিফা বেতফল, পানিফল, কুলবরই সহ আরও আঁশসমৃদ্ধ দেশীয় ফল বেশি বেশি ফলন করে দেশের মানুষের চাহিদা মিটাতে এগিয়ে আসা জরুরি।
এসব ফল পূর্বেকার দিনে ছিল বিধায় শিশু হতে বৃদ্ধা পর্যন্ত মানুষের শরীরের ভিটামিন এর অভাব ছিলনা বলে চলে। এখন দেশের মানুষের তুলনায় ফলের প্রয়োজন বেশি থাকায় বা অবাধে গাছ কাটায় বা অযতœ অবহেলায় দেশ থেকে দেশীয় ফল বা ফলের গাছ হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আমাদের দেশীয় ফল নিয়ে গবেষণারও সুযোগ রয়েছে, এসব ফল বা ফলের গাছ রোপন করে দেশীয় প্রজাতীর গাছ রক্ষা করতে এগিয়ে আসা জরুরি।
আমরা হাতের নাগালের ফল নাপাইয়া বা নাখাইয়া প্রতিনিয়ত শরীরের ভিটামিন এর অভাব দেখা দেয়। যার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এসব দেশীয় প্রজাতীর ফল খাওয়া ও রোপন করা জরুরি।
ইদানিং আমাদের দেশে মধ্যে নতুন করে দেখা যাচ্ছে ভিটামিন জাতীয় ফল না খাওয়ায় গর্ভবতী “মা” হতে পুষ্টিহীন শিশু জন্ম নেওয়া শুরু করেছে। তাই দেশীয় প্রজাতীর ফলের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ ইং সালে হিসাব মতে দানাজাতীয় শস্য গ্রহণের পরিমাণ ৪১৬ গ্রাম থেকে ৩৬৭ গ্রামে নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশে মানুষ বাড়ার সাথে সাথে ফল খাদ্যে সমানে-সমান রাখতে সম্মিলিত ভাবে গাছ-গাছালির প্রতি আন্তরিক হয়ে সর্ব প্রকার ফলজ গাছ ফলানো এগিয়ে আসতে হবে। অবাধ জমিতে দেশীয় প্রজাতীর গাছ রোপণে বেকারত্ব দূরিকরণ করাও সম্ভব। ইদানিং দেখা যায় দেশে বেকারত্বের হার দিন দিন বাড়ছে। কোন কোন গ্রামে বেকার থাকা যুবসমাজ চাষের জমি বিক্রয় করে বিদেশে যেতে দেখা যায়। কেউবা ইউরোপের দেশে পাড়ি দিতে যেয়ে সাগরে ডুবে প্রাণ হারিয়ে যায়। ইদানিং দেশে আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশ আসা শুরু করেছে, আরও আমদানিকৃত আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশ মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। আমাদের দেশের যুবসমাজ মান উন্নয়নে ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে বাড়ীর আশপাশে ও পড়ে থাকা জমির উপর গাঁছ চাষ বা ঔষধী গাছ ও কাঠ জাতীয় গাছ রোপন করে মাসিক হারে টাকা উপার্জন করতে পারেন।
দেশে বনাঞ্চলকৃত গাছ হতে তুলশী পাতার রস, তেজ পাতার ঘ্রাণ, তালের রস, খেজুরের রস আর নারিকেল পানি পাওয়া যায় তা নয়, দেশীয় গাছের মধ্যে নিমের গাছ ও ঔষধী গাছ হিসেবে আমাদের উপকারী বেশি। তাই সম্মিলিত ভাবে বেশি বেশি গাছ রোপনে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ খাদ্য গ্রহণের উদ্দেশ্য হলো সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম হয়ে বেঁচে থাকা। আমাদের জীবনের অস্তিত্ব কর্মক্ষমতা, মেধাবৃদ্ধি বিকাশে ভিটামিন জাতীয় ফলের বিকল্প নেই। তাই দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা ও দেশীয় বনাঞ্চলকৃত সর্ব প্রকার গাছ রক্ষা করতে ও বেশি বেশি করে গাছ লাগাতে এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • Developed by: Sparkle IT