ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪০:৪৩ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

মার্চ মাস এলে খুঁজে খুঁজে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে খুব ইচ্ছে করে। যাঁরা এদেশের মাটি আর মানুষকে স্বাধীন করতে চেষ্টা, সাধনা, লড়াই করেছেন কিংবা যাঁরা এদেশের জন্য রক্ত এবং প্রাণ দিয়েছেন, তাদেরকে খুব স্মরণ হয় মার্চ মাস আমাদের স্বাধীনতার মাস। এই মাসের ২৫ তারিখ গভীর রাতে কুখ্যাত সেনাশাসক ইয়াহিয়া এবং কমিউনিস্ট পিপলস পাটির নেতা ভুট্টোর নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিত আক্রমন করেছিলো আমাদের নিরিহ মানুষদের উপর। তারা হত্যা করে ঘুমন্ত অবস্থায় অসংখ্য নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ এবং শিশুকে। নিরস্ত্র হলেও আমাদের মানুষগুলো সেই রাতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে, যার কাছে যা ছিলো, তা নিয়ে। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীকে সবচে বেশি প্রতিরোধ করেছেন পুলিশ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর বিদ্রোহী সদস্য এবং সাথে কিছু সাধারণ মানুষ। সেদিন যারা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ সরকারি চাকুরি করেও সরকারি বাহিনীকে প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন সুবেদার মেজর (অব.) আব্দুল মতিন চৌধুরী।
মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মেজর (অব.) আব্দুল মতিন চৌধুরীকে দেখতে গত ১১ মার্চ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে গিয়েছিলাম তাঁর গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষায়। তিনি অসুস্থ বেশ কিছুদিন থেকে। ধীরে ধীরে তিনি অনেকটা স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কবে চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলেন? তিনি হাত নেড়ে বললেন, স্মরণ নেই। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে হাফেজ মাওলানা আতিকুর রহমান জানান, তার বাবা ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ইপিআর-এ যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরীর বাবা মাওলানা আব্দুল খালিক চৌধুরী কর্মজীবনে মসজিদের ইমাম ছিলেন। তাঁর মা ছফেদা ভানু চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী। ৬ ভাই এবং ১ বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। বড়ভাই মরহুম সামসুল আলম চৌধুরী ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক । দ্বিতীয় ভাই মরহুম ইলিয়াছুর রহমান চৌধুরী ছিলেন পতনউষার ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং দ্বিতীয়বারও তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মরহুম ইলিয়াছুর রহমান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক ছিলেন। তাঁর সব ছোটভাই সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মেজর (অব.) আব্দুল মতিন চৌধুরীর ৩ ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে সেলিম আহমদ চৌধুরী ২০১১ খ্রিস্টাব্দে ২ নং পতনউষার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ছেলে হাফেজ মাওলানা আতিকুর রহমান চৌধুরী সিপার ইংল্যান্ড প্রবাসী এবং নর্থ ওয়েস্ট কেন্ট-এর সিটি সেন্টারে অবস্থিত হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী কর্মজীবনে নয়াবাজার উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনা করা অবস্থায় ২৯ ডিসেম্বর ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ যোগ দেন। সিপাহী হিসাবে তাঁর প্রথম কর্মস্থল নিজ বাড়ির পাশে সমসেরনগর বিমানবন্দরের ৩ নং উইং-এ। এখানে মূলত তিনি ট্রেনিং গ্রহণ করেন। অতঃপর চলে যান ঢাকা পিলখানায়। সেখান থেকে অন্যান্য বিভাগেও বদলি হয়ে কাজ করেন।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে মার্চে তিনি পিলখানায় কর্মরত ছিলেন। তখন তাঁর পদবি ছিলো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সিনিয়র হাবিলদার। পাকিস্তান বাহিনী আক্রমন করলে তারা প্রতিরোধের জন্য সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পরে সেখান থেকে তাঁকে সাতক্ষিরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি প্রথম ৬ মাস যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
আব্দুল মতিন চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধ করেন বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্বে। যেমন প্রথমে আবু উসমান (৮ নং সেক্টর), মেজর (অব.) আব্দুল জলিল এবং সর্বশেষ পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা মেজর মনজুর-এর অধীনে যুদ্ধ করেন। মেজর মনজুর পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নতি লাভ করেছিলেন।
আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন অপারেশনে আহতও হন। যুদ্ধে বারুতের প্রচন্ড শব্দে এক পর্যায়ে তাঁর কানের পর্দা ফেটে যায় এবং পরবর্তীতে কান একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় তিনি সামরিক বাহিনীর চিকিৎসা নিয়ে শেষ তিন মাস বিহারের চাকুলিয়ায় বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে ট্রেইনারের দায়িত্ব আদায় করেন। সেই সময় যারা তাঁর কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের একজন মৌলভীবাজার জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসক আজিজুর রহমান। সিদ্ধেশ্বরপুরের সিদ্দেক মিয়াসহ সিলেটের অনেক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অনেক ছাত্রও তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ভারতে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর সাথে তিনি মার্চ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রবেশকালেও তারা বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে লড়াই করেছেন বলে তিনি জানান। স্বাধীনতার পরও আব্দুল মতিন চৌধুরী বিডিআর-এ কর্মরত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি যশোর সহ বিভিন্ন বর্ডারে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ছেলে হাফেজ মাওলানা আতিকুর রহমান চৌধুরী সিপার জানান, তাঁর বাবা অবসর সময়ে বইপড়া, নিয়মিত পত্রিকা পড়া, ক্রিকেট, ফুটবল এবং হকি দেখতে পছন্দ করতেন।
মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য প্রথম দিকে তিনি ভাতা কিংবা অন্য কোন সম্মাননা লাভের দিকে তেমন নজরই দেননি। বিডিয়ারের তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা তাদের অফিসে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সুবেদার মেজর (অব.) আব্দুল মতিন চৌধুরীর নাম দেখে নিজ উদ্যোগে বাড়িতে খুঁজে আসেন। অতঃপর তিনি কিছু ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনাসহ সরকারি বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন। জানতে চেয়েছিলাম, বর্তমান সরকার তো মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি তৈরির জন্য প্রচুর টাকা কিংবা ঢাকায় প্লাট বরাদ্দ দিচ্ছে, আপনারা কি সেরকম কিছু লাভ করেছেন? আতিক মুচকি হেসে বল্লেন, আমরা এমন কোন চেষ্টা করিনি বলে পাচ্ছিও না। চেষ্টা করলেন না কেন, আপনার বড়ভাই তো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন? উত্তরে সিপার বলেন, দুই নম্বারের ঝাকজমকপূর্ণ প্রতিযোগিতায় সাদাসিধে এক নম্বার দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, এই ভয়ে বড়ভাই কিংবা আমি সেদিকে যাইনি। বাবা তো সেদিকে নজরই রাখেননি। তিনি মনে করতেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণটা ছিলো দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ব। তিনি কোনদিন বিনিময়ের চিন্তা করেননি।
১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী অবসরে আসেন বিডিআর-এর সুবেদার মেজর হিসাবে। সরকারি চাকুরি জীবনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন সময় বিজয় পুরস্কার, হকি জাতীয় পুরস্কার, সংবিধান পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি ইউরোপসহ মধ্যপ্রা”্যরে বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। সস্ত্রীক ২০০০ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র হজ্জও করেন। তাঁর ছেলেদের তত্ত্বাবদানে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতায় গঠন করা হয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী কল্যাণ ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এলাকার গরীব দুখী মানুষের জন্য অনেক উন্নয়ন ও শিক্ষামূলক কাজ, বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি, বাসস্থান নির্মাণ, সেলাই প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া, শেলাই মেশিন বিতরণ, রিক্সা বিতরণ করা হচ্ছে বিগত ক’বছর থেকে। আশি উর্ধ্বো বয়সে ব্রেনস্টক জনিত রোগে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন চৌধুরী নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে আছেন। নিজ ভাই দুইবারের ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, নিজ ছেলে একবারের ইউনিয়ন চেয়াম্যান ও এক ছেলে প্রবাসী হলেও তাঁর বাড়ি তেমন ঝাঁকঝমকপূর্ণ নয়। খুবই সাদামাটা অবস্থায় অসুস্থ অবস্থায় জীবন-যাপন করছেন তিনি। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জুরাসিক যুগের পৃথিবী
  • প্রাচীন জনপদ রাজারগাঁওর ইতিবৃত্ত
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস
  •  পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • হারিয়ে যাচ্ছে গুম্বুজওয়ালা মসজিদ
  • একাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা
  • হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গাছ
  • হবিগঞ্জের লোকখাদ্য
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • গ্রাম বাংলার ঢেঁকি
  • হযরত শাহজালাল (রহ.) ও ইবনে বতুতার মিথস্ক্রিয়া
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • Developed by: Sparkle IT