শিশু মেলা

ফুফুর বাড়ি

আরবী রহমান কুসুম প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৭:৫৭ | সংবাদটি ৪৪ বার পঠিত

বাবা ও আমি রাঙামাটি ফুফুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। আমার ছোট ভাই আকাশেরও ঘুম ভেঙে গেল। সেও বায়না ধরলো, সেও আমাদের সাথে যাবে। মা তাকে বললো, আকাশ, তোমার বাবা ও আপু ফুফুর অসুস্থতার জন্য দেখতে যাচ্ছে। তুমি ওখানে গিয়ে কী করবে। তুমি আর আমি বাড়িতে থাকবো।
আকাশ বললো, ঠিক আছে মা। আমার খিদে লেগেছে। আমি, বাবা ও আপুকে তুমি খেতে দাও।
আমরা খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হলাম বিসমিল্লাহ বলে। চাচা-চাচি, ভাই-বোন ও মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলাম ভ্যানে করে। আমরা ভ্যানে করে বড়দল ঘাটের ধারে পৌঁছলাম, বাবা ভ্যানওয়ালাকে টাকা দিলেন। বাবা আমাকে বললেন, তুমি আমার সামনে হাঁটো।
ডান দিক থেকে ঘাটে পৌঁছানোর পর ঘাটওয়ালাকে টাকা দেওয়া লাগলো। আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি জানতাম কপোতাক্ষ নদী বড়দল ঘাটেই ছিলো। কিন্তু বাবা এখানে তো কয়েকটি নৌকা বাঁধা। আর চারপাশে শুধু বালি আর বালি। বাবা বললেন, আমি তোমাকে এই সম্পর্কে বাসে ওঠে বলবো। তারপর আমরা পার হয়ে মটরসাইকেলে করে সাতক্ষীরায় পৌঁছালাম। সাতক্ষীরায় পৌঁছানোর পর বাসে করে রওনা হলাম চট্টগ্রামের জন্য। বাবা আর আমি একসাথে বসি। আমি জানালার কাছে বসে বাইরের প্রকৃতি দেখছিলাম।
বাবা বললেন, জানিস মা,আমি যখন কলেজে পড়তাম, তখন এই নৌকা বাঁধা ছোট সরু খাল, বিশাল এক নদী ছিলো। এখানে স্টিমার, লঞ্চ, নৌকা সবই যাতায়াত করতো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে এখন সেই নদী কোথায় গেল?
বাবা বললো, মানুষ পরিবর্তনশীল, মানুষের সাথে সাথে পরিবেশও পরিবর্তনশীল। তাই এখন মানুষের কারণে চারপাশে বালি। যাতে মানুষের বসবাসের স্থান আরো বৃদ্ধি পায়।
আমি বললাম, কিন্তু আমাদের সবার উচিত খাল-বিল, নদী-নালা, গাছপালা, ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট সকল স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। বাবা বললো, এখন আর কোনো কথা নয়। তুমি এই কেকটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি বুঝতে পারলাম না বাবা আমাকে চুপ করিয়ে দিলো কেন? আমি কেক খেয়ে বাবার গায়ের ওপর ভর করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো, ভোরে উঠে দেখি বাবার কোলে আমি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি? বাবা বললেন, আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছে গেছি। এখন আমরা রাঙামাটি যাওয়ার জন্য অন্য এক বাসে উঠবো। এই তো বাস চলে এসেছে বলে আমরা বাসে উঠবো।
বাবা আমাকে জানালার কাছে বসিয়ে টিকিট কেটে নিয়ে এলেন। এসে আমার পাশে বসে বললেন, তুমি এই পানি দিয়ে কুলি করে বসো। আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
আমি কুলি করে বসে আছি। বাবা খাবার নিয়ে এলেন। পরোটা ও ডিম। খাবার খেতে খেতে বাস ছেড়ে দিলো। বাবা আমার পাশে বসে পরোটা খাচ্ছিলেন। আমার খাওয়াও শেষ। কিছুক্ষণ পরে বাবারও খাওয়া শেষ হয়
বাসের এক ম্যানেজার এসে বলে আপনার টিকিট দিন। বাবা টিকিট দিলো। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা বাবা আমরা তো ফুফুর বাড়ি যাচ্ছি। ফুফুর নাম কী?
বাবা বললেন, তোমার ফুফুর নাম ফরিদা খাতুন। আমি আবারো বললাম, আমরা তো রাঙামাটি যাচ্ছি, ওখানের মাটি কি লাল? ওখানে কী পাহাড় আছে? বাবা বললেন, সেখানকার মাটি সত্যিই লালচে রঙের। একদম লাল নয়। ছোট ছোট পাহাড় আছে যাকে টিলা বলে। সেখানে বিচিত্র ধরনের পশু-পাখি, গাছ-পালা, ফল-ফুল পাওয়া যায়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি পাঠ্যবইয়ে পড়েছি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ইত্যাদি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বসবাস। এই কথা কী সত্য? বাবা বললো, হ্যাঁ সত্য। এই সকল জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের বসবাস। যেমন-চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মণিপুরী খাসিয়া, শং ইত্যাদি। তোমার ফুফাও এক ছোট টিলার উপর বাঁশের তৈরি লম্বা ঘরে বাস করে।
আমাদের ভেতর কথা হতে হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তার কিছুক্ষণ পরে আমরা রাঙামাটি পৌঁছে গেলাম। বাবা ফুফুদের বাড়ি চিনেন। তাই আমাদের আর কেউ নিতে আসেনি। আমরা তখন কিছু পথ ভ্যানে করে, আর কিছু পথ পায়ে হেঁটে, এভাবে গল্প করে পৌঁছলাম ফুফুর বাড়ি। আমার বুঝতে শেখার পর প্রথম এখন ফুফুরে দেখলাম। সবাইকে সালাম দিলাম। ফুফুকে বললাম, ফুফু পানি খাবো।
ফুফু আমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে গেল রান্না ঘরে। পানি খেয়ে কাপড় পাল্টে সবার সাথে গল্প করলাম। পরে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
এক সপ্তাহ কাটালাম খুব মজা করে। এভাবে চলে এলো বাড়ি ফিরে যাওয়ার তারিখটি। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ফুফুকে নিজের প্রতি যতœ রাখতে বললাম। এরপর একইভাবে একই পথে বাড়িতে ফিরে গেলাম বাবার সাথে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT