ধর্ম ও জীবন

কবরের আযাব থেকে বাঁচার উপায় কি?

আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৯ ইং ০১:০৭:০০ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

যারা ঈমান, আমল ও তাকওয়ার সম্বল নিয়ে কবরে যাবে তারাই মুক্তি পাবে। এর প্রমাণ স্বরূপ দু’একটি হাদিস পেশ করছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনÑঐ সত্ত্বার কসম যার পবিত্র হাতে আমার প্রাণ। মাইয়্যেতকে কবরে রাখার পর যখন লোকেরা ফিরে আসতে থাকে তখন সে তাদের জুতোর আওয়াজ শুনতে পায়। মাইয়্যেত যদি ঈমানদার হয় তাহলে নামায তার মাথার কাছে এসে দাঁড়ায়, রোযা তার ডান দিকে এবং যাকাত বাম দিকে এসে হাজির হয়, তার নফল ইবাদতসমূহ যথাÑদান খয়রাত, মানুষের সাথে সদাচরণ ইত্যাদি এসে পায়ের দিকে দাঁড়ায়।
যদি মাথার দিক থেকে আযাব আসতে থাকে, ‘তাহলে নামায বাধা দিয়ে বলে এদিক থেকে যাওয়া যাবে না, যদি ডান দিক থেকে আযাব আসতে থাকে তাহলে রোযা বাধা দিয়ে বলবে এদিক থেকে যেতে পারবে না, যদি বাম দিক থেকে আযাব আসতে থাকে তাহলে যাকাত নিষেধ করে বলে এদিক দিয়েও জায়গা পাবে না, তারপর যদি পায়ের দিক থেকে আযাব আসতে থাকে তাহলে তার নফল আমলসমূহ (গতিরোধ করে) বলবে এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না।
আত তারগীব, ওয়াত তারহীব হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেনÑজনৈক সাহাবি একটি কবরের উপর তাবু তৈরি করলেন। সেটা কবর বলে তাঁর জানা ছিলো না। তাবুতে বসা অবস্থায় হঠাৎ কবরের ভিতর থেকে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলেন। সেখানে এক লোক সূরা মূলক তেলাওয়াত করছে এবং তেলাওয়াত করতে করতে সম্পূর্ণ সূরা শেষ করে ফেলল। সাহাবি উক্ত ঘটনা নবীজিকে অবহিত করলে তার কথা শুনে নবীজি বললেন, এই সূরা কবরের আযাব ফিরিয়ে রাখে এবং তেলাওয়াতকারীকে আযাব থেকে রক্ষা করছে। (মিশকাত শরীফ, তাফসিরে নুরুল কুরআন ২৯/৩ পৃষ্ঠা)। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি রাত্রিকালে এ সূরা পাঠ করবে, সে এর বরকতে কবরের আযাব থেকে নাজাত পাবে। (তাফসিরে নুরুল কুরআন, ২৯/৩ পৃষ্ঠা)
হযরত খালেদ ইবনে সা’দান সূরা মুলক ও সূরা আলিফ লাম সেজদা সম্পর্কে বলতেনÑএই সূরা দু’টি তার তেলাওয়াতকারীর জন্য কবরের মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে ঝগড়া করবে এবং বলবে ‘হে আল্লাহ! আমি যদি আপনার কিতাবের অংশ হয়ে থাকি তাহলে পাঠকারীর জন্য আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর যদি আমি আপনার কিতাবের অংশ না হই তাহলে আমাকে আপনার কিতাব থেকে মিটিয়ে দিন। তিনি আরও বলতেন, এই সূরা দু’টি তেলাওয়াতকারীর উপর পাখির ন্যায় ডানা বিছিয়ে তাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করে। (মিশকাত শরীফ)
হযরত মিকদাদ বিন মা’দিকারাব (রা.) হতে বর্ণিতÑনবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, শহীদের জন্য আল্লাহ তা’আলার নিকট ছয়টি পুরস্কার রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো তাকে কবর আযাব থেকে রক্ষা করা হয়। (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ)
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেনÑরমযান মাসে মুরদাদের উপর থেকে কবর আযাব উঠিয়ে নেওয়া হয়। (তাই রমযান মাসে মারা গেলে কবরের আযাব থেকে রমযান মাসে রক্ষা পাওয়া যায়। বায়হাকী)
হযরত সুলায়মান বিন সুরাদ (রা.) বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি পেটের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে তাকে কবরে আযাব দেয়া হবেনা। (আহমদ, তিরমিযি)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেনÑযে মুসলমান শুক্রবার রাতে বা দিনে মারা যায় আল্লাহ তা’আলা তাকে কবর আযাব থেকে হেফাজত করেন। তাই আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট দু’আ করি আয় আল্লাহ! আমাদেরকে যতোদিন জীবিত রাখ ঈমান ও আমলের উপর অটল রাখ। আর যে সময় আমাদের হায়াত শেষ হয়ে যায় ঈমানের সাথে কালিমা পড়িয়ে পড়িয়ে শুক্রবার দিনে বা রাতে মৃত্যু দান কর।
ইমাম গাযালী (রহ.) বলেনÑকবরের আযাব থেকে যে ব্যক্তি মুক্ত থাকতে চায় তাকে দুনিয়ার সাথে ততোটুকু সম্পর্কই রাখা উচিত যতোটুকু সম্পর্ক সে পায়খানা প্র¯্রাবের স্থানের সাথে রক্ষা করে থাকে। (হারানো মানিক, ৮৯)
হযরত আবু আইউব (রা.) বর্ণনা করেনÑরাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেনÑযে ব্যক্তি ইসলামের শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে এবং নিহত বা বিজয়ী না হাওয়া পর্যন্ত অবিচল থাকবে তাকে কবরে শাস্তি প্রদান করা হবে না। (নাসায়ী, তিবরানী)
অনেকে প্রশ্ন করেন, যে সব লোক পানিতে পড়ে বা আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। তাদেরকে কিরূপে কবরে আযাব দেয়া হবে এবং তাদেরকে কিরূপে সওয়াল জাওয়াব করা হবে? উক্ত প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মানুষের মৃত্যুর পর থেকে হাশর তথা শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত এসুদীর্ঘ সময়টুকুর যিন্দেগীর স্থানের নাম ‘আলমে বরযখ’। আগুনে পড়ে বা পানিতে ডুবে প্রভৃতি যে উপায়েই মানুষ মৃত্যুবরণ করুক না কেন তারা অবশ্যই আলমে বরযখে কিয়ামত পর্যন্ত কালাতিপাত করবে।
মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার পর দেহ অক্ষতা হলে সে অক্ষত দেহে, ডুবে মারা গেলে সে ডুবন্ত দেহে, অথবা অন্য কোনো উপায়ে বিধ্বংস হলে, সে ধ্বংসাবশেষের দেহে এক কথায় মৃত দেহ যে অবস্থায়ই হোক না কেন, ঐ অবস্থায়ই তার পরকালীন চৈতন্যতা ফিরে আসে। আর ঐ অবস্থায়ই তাকে আলমে বরযখে সওয়াল জাওয়াব করা হয়। যা কবরের সওয়াল জাওয়াব নামে পরিচিত। বস্তুতঃ কবরের যিন্দেগী দ্বারা শুধু মাটির গর্তের অবস্থা উদ্দেশ্য নয় বরং এ আলমে বরযখ উদ্দেশ্য।
এরপর নবী এবং উচ্চস্তরের ওলী আউলিয়াগণ ব্যতিত অন্য সকলের দেহ মাটিতে বা পানিতে মিশে নিঃশেষ হয়ে যায়। সেই বিনষ্ট ও বিলীন হয়ে যাওয়া এ দেহের স্থলে তাদেরকে আলমে বরযখে তাদের প্রতীকী দেহ দেয়া হয়। সেই প্রতীকী দেহ হয় প্রত্যেকের আমল অনুযায়ী। কবরের তথা বরযখী জগতের সুখ শান্তি বা শাস্তি ঐ প্রতীকী দেহের উপর প্রয়োগ করা হয়। বদ আমলকারী হলে সে সেই দেহে শাস্তি ভোগ করে। আর নেক আমলকারী হলে সেই দেহে সুখ শান্তি ভোগ করে। এরপর হাশরের মাঠে সকলকে তাদের দুনিয়ার অবস্থাতেই উত্থিত করা হবে।
অন্যদিকে কবরে নবী ও ওলীগণের দুনিয়াবী দেহও অক্ষত থাকে। মাটির জন্য তাদের দেহকে বিনষ্ট করার পরিবর্তে হিফাজত করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়। সেই জন্যই বহুকাল পরও তাঁদের কবর খুড়লে তাদেরকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। (মুসলিম শরীফ-২/৩৮৫, শরহে নববী লিল মুসলিম- ২/৩৮৬)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT