ধর্ম ও জীবন

সাক্ষাৎ ও ফোনালাপ : করণীয়-বর্জনীয়

এইচ এম মাসউদ প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৯ ইং ০১:০৭:৪৬ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সাক্ষাৎ করা ও ফোনে কথা বলা খুবই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘যারা ঘরের পিছন থেকে তোমাকে উচ্চস্বরে ডাকে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। তারা যদি ধৈর্য ধারণ করতঃ যতোক্ষণ না তুমি বের হয়ে তাদের কাছে আসো, তবে তা-ই তাদের জন্য উত্তম হতো। আল্লাহ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল’।
এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা নবী (সা.) কে সম্বোধন করে বলেছেন, যে সকল লোক আপনাকে আপনার বাসগৃহের পিছন থেকে ডাকছে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। এ আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, বনু তামিমের একটি প্রতিনিধি দল নবী (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে তারা নবীজির বাসগৃহের পিছন দিক থেকে ডাকতে শুরু করল। ‘হে মুহাম্মদ! বের হয়ে আসুন।’ (ইবনে কাছীর, তাফসির ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৬৩)
তাদের এই অশিষ্ট আচরণের প্রেক্ষাপটেই এই আয়াত নাযিল হয়। এতে আল্লাহ বলেনÑ‘যারা ঘরের পিছন দিক থেকে ডাক দেয় তাদের অধিকাংশই অবুঝ। তারা আপনাকে এভাবে না ডেকে যদি ধৈর্যের সাথে আপনার বের হওয়ার অপেক্ষা করত, তবে সেটাই তাদের পক্ষে শ্রেয় হতো।’
এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে দু’টি শিক্ষা দিয়েছেন। একটি হলো, বড় কাউকে দূর থেকে ডাকা বেয়াদবী। তা ঘরের বাইরে থেকে ডাকা হোক কিংবা অন্য কোথাও থেকে ডাকা হোক। বড় কারো সাথে যদি আপনার কোনো কাজ থাকে তাহলে কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলুন। এটা কেবল মহান কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, বরং সাধারণ লোকদের ডাকাও বেয়াদবী। কাজেই কোন পুত্র যদি পিতাকে দূর থেকে ডাকে কিংবা কেউ তার বড় কোন আত্মীয়কে এভাবে ডাকে তবে বেয়াদবী হবে। এ আয়াতের দ্বিতীয় শিক্ষা নবী (সা.) এর দরজায় করাঘাত সম্পর্কে। প্রিয় নবী (সা.) এর কাছে যদি কারো কোনো প্রয়োজন থাকে, তবে ঘরের বাইরে বসে অপেক্ষা করতে হবে।
দরজায় করাঘাত করে তাঁকে ডেকে আনা যাবে না। তাৎক্ষণিক কোনো প্রয়োজন থাকলে ভিন্ন কথা। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় কিছুতেই তাঁর দরজায় করাঘাত করা উচিত নয়। এর দ্বারা তাঁকে বাইরে আনা হয় যা সুস্পষ্ট বেআদবী। বরং অপেক্ষা করতে হবে কখন তিনি বাইরে বের হয়ে আসেন। যখন তিনি বের হয়ে আসবেন তখন সাক্ষাৎ করবে।
যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছেÑ‘তারা যদি অপেক্ষা করত কখন আপনি নিজের থেকেই বের হয়ে তাদের কাছে আসেন, আর তখন তাদের প্রয়োজনের কথা আপনাকে জানাবে, তবে দরজায় করাঘাত করা অপেক্ষা সেটাই তাদের পক্ষে শ্রেয় হতো।’
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, ছাত্র-শিক্ষকের বিষয়টাও এরকম। অর্থাৎ কোনো ছাত্র যদি শিক্ষকের সাথে সাক্ষাত করতে চায়, তবে বাইরে অপেক্ষা করবে এবং শিক্ষক নিজের থেকেই যখন বের হন তখন তার সাথে সাক্ষাৎ করবে। এতো গেল ছাত্র ও শিক্ষকের কথা। একই নিয়ম প্রযোজ্য পিতা-পুত্র ও পীর মুরীদের ক্ষেত্রে। এমনকি সাধারণ লোকজনের বেলায়ও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, তুমি যার সাথেই সাক্ষাৎ করতে যাবে, যথাসম্ভব কষ্ট না দেওয়ার চেষ্টা করবে। এমন যেন না হয় যে, যখন তখন কারো বাড়িতে গিয়ে উঠলে আর তার জন্য মূর্তিমান উপদ্রবে পরিণত হলে। বরং যখনই কারো কাছে যাবে তখন আগে চিন্তা করবে, এটা তার সাথে সাক্ষাতের উপযুক্ত সময় কি না। আগে তার সময়সূচী জেনে নেবে। অনেকেরই সময় বণ্টন করা থাকে। তার মধ্যে একটা সময় নির্দিষ্ট রাখে ঘরের লোকজনের সাথে কাটানোর জন্য, একটা সময় থাকে ব্যক্তিগত কাজ সমাধা করার জন্য। এমনিভাবে একেক কাজের জন্য একেক সময়। তাই আগেই জেনে নেওয়া চাই তার সাথে সাক্ষাতের উপযুক্ত সময় কোনটা। সেই সময় সাক্ষাতের জন্য গেলে সে বিব্রত হবে না এবং তার বাড়তি কষ্ট হবে না।
আজকাল যোগাযোগের এক নতুন মাধ্যম হলো টেলিফোন। একে অর্ধেক সাক্ষাৎ বলা চলে। সরাসরি সাক্ষাতের বিধান সমূহ এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারো কাছে টেলিফোন করার সময় প্রথমে চিন্তা করবে, আমি এমন সময় টেলিফোন করছি না তো, যখন বিশ্রাম করছেন বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। ফলে আমার টেলিফোন তার বিরক্তির কারণ হবে? অনেক সময়েই লোকে এসব চিন্তা করে না। ব্যস ইচ্ছা হলো কারো কাছে ফোন করবে, অমনি ফোন করে বসে। সে নামায পড়ছে, না বিশ্রাম করছে, না অন্য কোন কাজে ব্যস্ত আছে, তা একবারও ভেবে দেখে না। যে সময় ফোন করলে কষ্ট দেওয়া হবে না, এমন একটা সময়ই ফোনের জন্য বেছে নেব, এই খেয়ালই মন থেকে উধাও হয়ে গেছে। অনেক সময় এমনও হয় যে, করো ফোন আসল আপনি রিসিভার তুললেন, কিন্তু আপনার ব্যস্ততা আছে, হয়তো কোথাও যেতে হবে কিংবা বিমানের সময় হয়ে গেছে বা অফিসের গাড়ি এসে গেছে অথবা বাথরুমে যেতে হবে। ওদিকে যে ব্যক্তি ফোন করেছে, সে লম্বা কথা শুরু করে দিয়েছে। ভাবুন কী কঠিন মসিবত! মোটকথা ফোনালাপের ক্ষেত্রে যেন কারো কোন কষ্ট না হয় সেদিকে খুব লক্ষ্য রাখতে হবে।
সাক্ষাৎ ও ফোনালাপের অসঙ্গতি সহ আরো যতো সামাজিক ক্রটি রয়েছে আমরা সবাই যেন তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT