ধর্ম ও জীবন

  শবে বরাতের আমল

আহমদ যাকারিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৯ ইং ০১:০৮:২৯ | সংবাদটি ৩৩০ বার পঠিত

ফার্সি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত বা রজনী। আর বারাআত অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃৃতি, অব্যাহতি, পবিত্রতা ইত্যাদি। সুতরাং শবে বরাতের শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায়-মুক্তি, নিষ্কৃতি ও অব্যাহতির রজনী। এই রাতে যেহেতু আল্লাহ তা’আলা পাপী লোকদের ক্ষমা করেন, নিষ্কৃতি দেন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, সেহেতু এই রাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা ‘শবে বরাত’ বলা হয়ে থাকে; আর এটা বলা অযৌক্তিক নয়। যদিও হাদিসে এসেছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ এই শব্দে।
আল্লাহ বলেন, ‘হা-মীম! শপথ! স্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয় আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি ছিলাম সতর্ককারী।’ (সুরা : দু’খান)
মুফাসসিরিনরা বলেন : এখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাযহারি, রূহুল মাআনি ও রূহুল বায়ান)
হজরত ইকরিমা (রা.) সহ কয়েকজন তফসীরবিদ সাহাবি থেকে বর্ণিত আছে যে, সুরা দুখানের দ্বিতীয় আয়াতে বরকতের রাত্রি বলে শবে বরাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)
হাদিস শরিফে আছে, হজরত মুআ’য ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫)।
হজরত আবু সা’লাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে, তখন আল্লাহ তা’আলা মাখলুকাতের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান; মুমিনদের ক্ষমা করে দেন, কাফিরদের ফিরে আসার সুযোগ দেন এবং হিংসুকদের হিংসা পরিত্যাগ ছাড়া ক্ষমা করেন না। (কিতাবুস সুন্নাহ, তৃতীয় খ-, পৃষ্ঠা : ৩৮২)
হজরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন: হে আয়িশা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে? আমি উত্তরে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। রাসূল (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত; এই রাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান, তৃতীয় খ-, পৃষ্ঠা : ৩৮২)
‘শব-ই-বরাত’। ‘শব’ অর্থ হলো রাত আর ‘বরাত’ অর্থ হলো মুক্তি। সুতরাং ‘শব-ই-বরাত’ অর্থ হচ্ছে মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহ তা’আলা বান্দার অভাব-অনটন, রোগ, শোক, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি চাওয়ার জন্য মানুষকে আহবান জানান এবং বান্দাহ আল্লাহর নিকট আন্তরিকভাবে চাইলে তিনি সকল অনিষ্টতা থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। তাই এ রাতকে শব-ই-বরাত বা মুক্তির রাত বলে অভিহিত করা হয়। শাবান মাসের ১৫তম রাত অর্থাৎ ১৪ শাবান দিবাগত রাতই হলো ‘শব-ই-বরাত’।
এ প্রসঙ্গে রসূল (সা.) বলেনÑশাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত এলে তোমরা সেই রাতে ইবাদতে দাঁড়াও এবং ঐ তারিখের দিনের বেলায় রোজা রাখ। কেননা আল্লাহ তা’আলা এই তারিখে সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর আকাশে নেমে এসে বলেন, শোন! আছ কি কেউ আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছ কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী? আমি তাকে রিজিক দান করবো। আছ কি কেউ বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনাকারী? আমি তাকে বিপদ থেকে মুক্ত করবো। আছ কি কেউ আর কিছু প্রার্থনাকারী? ফজর পর্যন্ত এভাবে আহবান করা হয়। (ইবনে মাজা শরীফ : ১৩৮৮)
উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) বলেনÑআমি জিজ্ঞেস করলাম যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি শা’বান মাসে যেভাবে রোজা রাখেন, অন্য কোন মাসে আমি আপনাকে এত অধিক রোজা রাখতে দেখিনি। এর কারণ কী? উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন যে, এটি রজব ও রমজানের মধ্যখানে এমন একটি মাস; যে সম্পর্কে মানুষেরা উদাসীন থাকে। এ মাসে বান্দাহ’র যাবতীয় কৃতকর্ম প্রতিপালকের নিকট তুলে নেয়া হয়। আমি পছন্দ করি যে, আমার রোজা থাকাবস্থায় আমার কৃতকর্মসমূহ তুলে নেয়া হোক’। (নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)
হাদিসের আলোকে ফিকাহ কিতাবে বর্ণিত তথ্যানুযায়ী ‘শব-ই-বরাত’ উপলক্ষে কিছু আমলের কথা সঠিকভাবে প্রামাণিত রয়েছে বলে বুঝা যায়। শবে বরাত আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুসলিমার জন্য এক বিশেষ উপহার, তাই এই রাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
রাত জেগে ইবাদাত করা। যেমনÑনফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, তওবা-ইস্তিগফার ইত্যাদি। কেননা হাদিসে পাকে এসেছেÑএ রাতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং ফজর পর্যন্ত মানুষকে তাঁর কাছে ক্ষমা, রোগমুক্তি, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, রিজিক ইত্যাদি বৈধ প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রার্থনা করার জন্য আহ্বান করতে থাকেন।
হযরত আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেনÑআল্লাহ তা’আলা শবে বরাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং কাফের-মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন। হাদিসের ব্যাখ্যায় এসেছে এ ধরনের লোকেরাও যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে আর কুফর, শিরকে লিপ্ত হবে না এবং ভবিষ্যতে হিংসাও করবে না বলে ওয়াদা করে তবে আল্লাহ এদেরকেও ক্ষমা করে দেন।
তাই ১৪ই শাবান দিবাগত রাতে জাগ্রত থেকে বেশি বেশি নফল ইবাদাত করা, জিকির করা, কুরআন তেলাওয়াত করা। দ্বীনি মাসআলা-মাসাঈল শেখা। নিজের অতীত জীবনে যদি ফরজ নামাজ ছুটে গিয়ে থাকে তাহলে ‘উমরি ক্বাযা’ করে তা সম্পন্ন করা। এই রাতে যেকোন নফল নামাজ পড়া যায়। কুরআন শরীফের যেকোন সূরা দিয়ে নফল নামাজ পড়া যায়; এর জন্য নির্দিষ্ট কোন সূরা দিয়েই পড়তে হবে এমনটি কিন্তু জরুরি নয়। যতো রাকাআত ইচ্ছা পড়া যাবে। তবে নফল নামাজ নিজ ঘরে পড়াই উত্তম; অনেকেই দেখা যায় যে, এই রাতে মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ পড়েন সারা রাতব্যাপী এটা উচিত নয়, ঘরকে কবরের সদৃশ তথা ইবাদতহীন কক্ষে পরিণত করে মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ পড়া শরিয়তের মেজাযের পরিপন্থী; তাই এদিকে নযর রাখা আমাদের সবার জন্য কর্তব্য। তবে হ্যাঁ; একান্ত যদি বাসা-বাড়ীতে পড়ার পরিবেশ না থাকে তাহলে মসজিদে গিয়ে পড়তে পারেন। শুনতে কষ্ট হলেও বাস্তব চিত্র হচ্ছে যে, বর্তমানে ‘শব-ই-বরাত’ উপলক্ষে নফল ইবাদাত করার জন্য মসজিদে গিয়ে ভিড় করার একটা নব্য সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে; এটা দেখতে সুন্দর লাগলেও মূলত তা শরীয়তের মেজাজের পরিপন্থী। তাই যথাসম্ভব বাসা-বাড়িতেই নফল ইবাদাত করা উত্তম। মূলত ‘শবে বরাত’র সব ইবাদাতই নফল। আর নফল ইবাদাত নির্জনে একাকী করাই উত্তম। রাসূল (সা.) বহু হাদিসে নফল নামাজ বাড়ি-ঘরে, নির্জনে-নিভৃতে আদায় করার পরামর্শ দিয়েছেন। শবে বরাতের ইবাদাত যেহেতু নফল, সেহেতু এই রাতে মসজিদে ভিড় করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি বাসা-বাড়িতে ইবাদাতের পরিবেশ না থাকে তাহলে মসজিদে যাওয়াই উত্তম। তবে বাসায় নফল ইবাদাতের পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। শবে বরাতে নফল নামাযের ধরা-বাঁধা কোনো নিয়ম নেই বরং অন্যান্য নফল নামাজের মতো দুই/চার রাকাত নিয়ত করে সূরায়ে ফাতিহার পরে যেকোনো সূরা মিলিয়ে যত রাকাত ইচ্ছে পড়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যে, রাতভর নফল ইবাদাত করে ফজর নামাজ ক্বাযা না হয়ে যায়। কারণ হাজার রাকাত নফল নামাজের ছাওয়াব একটি ফরজ নামাজের সমতুল্য হবে না।
এ রাতে বেশি বেশি দোয়া করা। কেননা আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তিনি মানুষকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য, শোক, দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, রিযিক চাওয়ার জন্য মোদ্দাকথা মানুষের বিভিন্ন আশা-আকাঙ্খা পূর্ণ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে আহবান করেন। তদুপরী অপর এক হাদিসের বর্ণনানুযায়ী এই রাতে মানুষের সারা বছরের জীবন-মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি লেখা হয়ে থাকে। অতএব এই রাতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে দোয়া করা চাই।
হাদিস শরীফে আছে যে, এই রাতে নবী করীম (সা.) কবরস্থানে গিয়েছিলেন এবং মৃত মুসলমানদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাতের দোয়া করেছিলেন। তাই এই রাতে কবর জিয়ারতে যাওয়া যায়। কিন্তু যতদূর সম্ভব অনাড়ম্বরভাবে কবর জিয়ারত করা।
হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে রাসূল (সা.) কে হারিয়ে ফেললাম। অতঃপর আমি তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। অবশেষে তাকে জান্নাতুল বাকীতে পেলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আয়শা তুমি কি আশঙ্কা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি জুলুম করবেন? হযরত আয়শা (রা.) বলেন, আমি বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। অতঃপর রাসূল (সা.) ইরশাদ করলেন, ১৫ শাবান আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বনু-কাল্ব গোত্রের মেষের পশম অপেক্ষা অধিক লোককে ক্ষমা করেন। (তিরমিযী-১ম খঃ পৃ. ১৫৬)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT