পাঁচ মিশালী

সম্ভাবনাময় নাম কাঁকড়া

এ এইচ এম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৯ ইং ০০:২১:২১ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্ভাবনাময় এক সম্পদের নাম কাঁকড়া। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এ কাঁকড়া দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দুয়ার উম্মোচন করেছে। এক সময় এ দেশের মানুষের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল সোনালী আঁশ বা পাট। তার পর পাটের স্থান দখল করেছিল ঘের বাণিজ্যের ‘সাদা সোনা’ চিংড়ি। বর্তমানে বিদেশে প্রধান রপ্তানী পণ্য তৈরী পোষাক হলেও অবহেলিত কাঁকড়া দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী একটি বড় সম্পদ। জাতীয় মাছ ইলিশ ও চিংড়ির পরেই কাঁকড়ার স্থান। এক সময় চিংড়ি মাছ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির প্রতিভূ। সময়ের ব্যবধানে সেই দিন এখন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখন চিংড়ির স্থান সর্বত্র দখল করছে জলজ প্রাণী কাঁকড়া। ভাইরাসজনিত কারণে চিংড়ির মড়ক, উৎপাদন খরচ বেশি এবং বিদেশে দরপতনের কারণে চিংড়ি চাষীরা তাদের পেশার পরিবর্তন করছেন। কম খরচে কম শ্রমে ব্যাপক হারে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। কাঁকড়ার দাম আর চাহিদা ইলিশ ও চিংড়িকে পেছনে ফেলে অগ্রসর হচ্ছে। বড় সাইজের প্রতি কেজি চিংড়ির মূল্য ৫শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা আর একই সাইজের প্রতি কেজি কাঁকড়া বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ টাকা থেকে ১৮শ’ টাকা পর্যন্ত। চিংড়ি চাষীরা এখন কাঁকড়া চাষে বেশি আগ্রহী। প্রতিটি পরিপূর্ণ কাঁকড়ার ওজন এক কেজি থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয়। উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত ফসলহীন জলাভূমিতে কাঁকড়া চাষে ভাগ্যের চাকা ঘুরছে লাখ লাখ চাষীদের এবং দেশ পাচ্ছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। চিংড়ির ঘেরগুলো কাঁকড়ার ঘেরে রূপান্তরিত হচ্ছে। চিংড়ির আড়তের চেয়ে বাড়ছে কাঁকড়ার আড়তের সংখ্যা। কাঁকড়া থেকে প্রতি বছর গড়ে আয় হচ্ছে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা। সুন্দরবন এলাকার ৫০ থেকে ৬০ হাজার জেলে পরিবার কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। চিংড়ির মত পোনা কিনতে হয়না কাঁকড়ার। প্রাকৃতিকভাবেই লোনা পানিতে কাঁকড়া জন্মায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারি এ মৎস্য সম্পদ রপ্তানী বাণিজ্যের সরকারি খাতা কলমের অপ্রচলিত পণ্য বলে পড়ে আছে।
পৃথিবীর অন্তত ২৪টিরও অধিক দেশে কাঁকড়া রপ্তানী হচ্ছে। চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, থাইওয়ান, হংকং, সিংগাপুর থাইলেন্ড, আরবআমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, মায়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এমনকি পাশ্ববর্তী ভারতেও বাংলাদেশি কাঁকড়ার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের নামি-দামি হোটেলগুলোতে খাদ্যের পছন্দের তালিকায় কাঁকড়ার নাম সর্বাগ্রে। সরকারি হিসাব মতে, ২০০৯-১০ অর্থ বছরে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা, ২০১০-১১ অর্থ বছরে ৫ কোটি টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সমপরিমাণ আয় হয়। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে কাঁকড়ার রপ্তানী আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৪ কোটি টাকা। শুধু ২০১৪ সালে জুলাই-অক্টোবর এ তিন মাসে আয় হয় ৮০ কোটি টাকা এবং বছর শেষে ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ১৯৭৭ সালে ২ হাজার ডলারের কাঁকড়া রপ্তানী হয়। বর্তমানে এক কোটি ৫৮ লাখ ডলারের কাঁকড়া রপ্তানী হচ্ছে।
কাঁকড়া একটি উভচর প্রাণী। এটা পানিতে থাকলেও ডাঙাতেও এরা স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে। পুকুর, খাল, বিল, হাওর, নদী, সাগর সহ সকল জলাশয়ে কাঁকড়ার বাস। প্রাণী বিজ্ঞানীরা ১৩৩ প্রজাতির কাঁকড়ার সন্ধান পেয়েছেন। আমাদের দেশে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া চাষ হয়। এর মধ্যে ১১ প্রজাতির কাঁকড়া সামুদ্রিক। শক্ত খোলে আবৃত জলজ এ প্রাণীর দৈহিক গঠন বিভিন্ন রকমের। সাগরের কাঁকড়া লাল এবং অন্যান্য জলাশয়ের কাঁকড়া কালো রঙের থাকে। বঙ্গোপসাগরে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। কাঁকড়ার ১০ পা যুক্ত ডেকাপোড়া প্রাণী। শরীরের সম্মুখভাগে রয়েছে কাটাওয়ালা ২টি দাঁড়াযুক্ত পা, যা ওরা হাত হিসেবে ব্যবহার করে। পা দুটি দিয়ে খাবার তোলে খায় এবং শত্রুর সাথে যুদ্ধ করে জীবন বাঁচায়। কাঁকড়া চলন ভঙ্গি অদ্ভুত। জলে, স্থলে সর্বত্র যতক্ষণ খুশি অবলীলায় বিচরণ করতে পারে। এরা চলে সামনে বা পেছনে নয়, পাশের দিকে। স্থলে বিচরণকালে কোন রকম বিপদের আশংকা দেখলেই চোখের নিমিষে ছুটে অদৃশ্য হয়ে যায়। এদের চোখদুটি অদ্ভুত। লম্বা বোঁটার মাথায় স্থাপিত দুটি পেরিস্কোপের মত। চোখ দুটিকে ইচ্ছেমত প্রসারিত ও বন্ধ রাখতে পারে। কাঁকড়ার বড় শত্রু কারেন্ট জাল। জালে যখন মাছ আটকা পড়ে তখন কাঁকড়া সেই মাছ খেতে গিয়ে নিজেও আটকা পড়ে যায়। কাক, চিল, শেয়াল, বেজি এবং বাঘ কাঁকড়া খেয়ে থাকে। ছোট বেলায় অনেক মাছ ধরেছি। অনেকেই মাছের সাথে অনেক কাঁকড়া বুঝে না বুঝে সাপের মত ভয় পেয়ে মেরে ফেলেছে। সময়ের প্রয়োজনে সেই কাঁকড়া এখন অর্থনৈতিক সম্পদ। কাঁকড়াকে অযথা মারবেন না। এদের বেঁচে থাকার সুযোগ দেবেন। কারণ কাঁকড়া এখন আমাদের অর্থকরী সম্পদ। চিংড়ি ও বড় ইলিশের চেয়ে আরো মূল্যবান। স্ত্রী কাঁকড়া তেলাপিয়া মাছের মত নিজের পেট সংলগ্ন থলেতে ডিম বয়ে নিয়ে বেড়ায়। মায়ের দেহের উষ্ণতায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক কাঁকড়া খেতে পছন্দ করেন না। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং উপজাতিরা কাঁকড়া খায়। পুরুষ কাঁকড়ার চেয়ে স্ত্রী কাঁকড়ার দাম বেশি এবং খেতেও খুব সুস্বাদু। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে কাঁকড়ার মাংসে বেশ পুষ্টিকর গুণ আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম মাংসে পুষ্টিমান আছে পানি ৭ গ্রাম, প্রোটিন ১৯ থেকে ২৪ গ্রাম, চর্বি ৬ গ্রাম এবং খনিজ পদার্থ ১-২ গ্রাম।
বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, সিতাকুন্ড, মহেশখালি, বাঁশখালি, সন্দ্বীপ, চকরিয়া, যশোর সহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কাঁকড়া চাষ হয় বেশি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে কয়েক হাজার কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। শুধু পাইকগাছাতেই ৩শ’র বেশি খামার রয়েছে। কক্সবাজারে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে। কাঁকড়া চাষের জন্য জমির আয়তন তেমন কোন বিষয় নয়। শুধু প্রয়োজন নেট, পাটা, পুঁজি এবং খাদ্যের। এক বিঘা জমিতে কাঁকড়া চাষ করতে হলে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকার প্রয়োজন হয়। তাতে মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করা যায়। বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৩ সালে কাঁকড়া পোনা চাষ বিষয়ে গবেষণা শুরু করে। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে ইউএসআইডির অর্থায়নে ও আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ড ফিশর অ্যাকয়া কালচার ফর ইনকাম এন্ড নিউট্রিশন প্রকল্পের যৌথ তত্ত্বাবধানে কক্সবাজারে একটি হ্যাচারিতে কাঁকড়ার উৎপাদনে নিবিড় গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর মতে ১৯৭৭ সালে প্রথম বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া রপ্তানী হয়। ২০০৮-৯ অর্থ বছরে ২ হাজার ৯৭৩ টন, ২০১১-১২ অর্থ বছরে ৪ হাজার ৪১৬ টন, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ৮ হাজার ৫২০ টন, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে দ্বিগুণ কাঁকড়া রপ্তানী করা হয়। একমাত্র সাতক্ষীরায় প্রতি বছর ৩ হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়। গত বছর উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ২শ’ মেট্রিক টন। চলতি বছর ৩ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন কাঁকড়ার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম কক্সবাজার পরেই কাঁকড়া উৎপাদনে সাতক্ষীরা জেলার স্থান। দুইভাবে কাঁকড়া বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকে, একটি সফট সেল ক্যাব, অপরটি হচ্ছে হার্ড সেল ক্যাব। সফট সেল ক্যাব হিমায়িত করে এবং হার্ড সেল ক্যাব হচ্ছে জীবিতাবস্থায় কাঁকড়া বিদেশে পাঠানোর পদ্ধতি। আগে মানসম্মত কাঁকড়া চাষের জন্য বিদেশ থেকে ১৩০ টাকা করে প্লাষ্টিকের ঝুড়ি আনা হতো, এখন সেই ঝুড়ি মাত্র ৩০ টাকায় দেশে পাওয়া যায়। এতে চাষীদের ব্যয় অনেকাংশে কমেছে। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৯৩ সাল থেকে সনাতন পদ্ধতিতে পুকুরে কাঁকড়ার চাষ শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম হংকংয়ে বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া রপ্তানী হয়। বর্তমানে শুধু মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর ৮শ হাজার টন কাঁকড়া রপ্তনী করা হয়। কাঁকড়া উৎপাদনের ব্যাপারে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে জোরালো কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌযানের সুবিধা থাকলে সাগর থেকে কাঁকড়া ধরে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এতে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হবে।
কাঁকড়া আহরণ পরিবেশের ক্ষতি করে এমন যুক্তিতে সরকার ১৯৯৭ সালে নভেম্বর মাসে দেশজুড়ে কাঁকড়া আহরণ ও রপ্তানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে কাঁকড়ার বিদেশের বাজার দখল করে নেয় মিয়ানমার, ভারত, থাইলেন্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশ। পরে সরকার রপ্তানী করার অনুমতি দিলেও সাগর বা উম্মুক্ত জলাশয় থেকে কাঁকড়া আহরণ বা ধরার সময়সীমা বেঁধে দেয়। যাতে ডিমওয়ালা কাঁকড়া ধরা না হয়। রপ্তানীযোগ্য কাঁকড়ার প্রজনন বৃদ্ধির জন্য সরকারিভাবে জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবন সহ সকল নদ নদী ও জলাশয়ে কাঁকড়া ধরতে সরকারি বিধিনিষেধ জারী করা হয়। তারপরও সুন্দরবনের গহীনে ১৯টি অভয়ারণ্যে জেলেরা কাঁকড়া ধরছেন। প্রকৃতি থেকে কাঁকড়া আহরণ ও রপ্তানীর কারণে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এমন ধারনার ভিত্তিতে জীববৈচিত্রের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখার ধারনা থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ এ কাঁকড়া রপ্তানীর উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ আইন কার্যকরি হলে প্রাকৃতিক উপায়ে কাঁকড়া আহরন, চাষ, রপ্তানী ব্যাহত হবে এবং দেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। দেশে তরুণ, শিক্ষিত, বেকার যুবকদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এদিকে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের সময় সীমার দিনক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি বেকারত্ব ও বৈষম্য দুর না হয়, তবে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। তাই কাঁকড়া উৎপাদনে দেশের সর্বত্র চাষীদের ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে মৎস অফিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাঁকড়া উৎপাদনে উৎসাহিত করলে অর্থনীতির উন্নয়ন ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT